মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া বিল এবং জ্বালানির ঘাটতি–এই তিন চাপ একসঙ্গে এসে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। হুমকির মুখে পড়তে পারে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি আমদানি এবং সরবরাহ চেইন নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধ জ্বালানি সরবরাহ এবং পরিবহনে নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। জ্বালানি আমদানি–নির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও এলএনজির দামের ঊর্ধ্বগতির ঝুঁকিতে রয়েছে। আমদানির সীমাবদ্ধতা, জ্বালানি মজুদের সক্ষমতার অভাবসহ বিভিন্নমুখী সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতি নাজুক করে তুলছে। ইরানে হামলা, ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ বেশ কয়েকজনের মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। বিষয়টি নিয়ে শীঘ্রই আলোচনার টেবিল বসা কিংবা যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। ইরান ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে। এতে ওই প্রণালি দিয়ে কোটি কোটি ব্যারেল জ্বালানি তেল সরবরাহ ও পরিবাহিত হয়, তাতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এতে শুধু জ্বালানি তেল আমদানিতে শুধু সংকট নয়, বরং বাংলদেশ থেকে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রগামী পণ্য পরিবহনে সংকট দেখা দেওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। ব্যবসায়ী নেতারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি মূল্য, এলপিজি সরবরাহ ও শিল্প কাঁচামালের আমদানি ব্যয় বেড়ে যাবে, যা দেশে উৎপাদন খরচ ও মূল্যস্ফীতি আরো চাপের মুখে পড়বে। ইরানের সাথে ইসরায়েল–আমেরিকার যুদ্ধের ধকল বাংলাদেশের জ্বালানি খাতকে ভালোভাবে নিতে হবে বলে সূত্রগুলো মন্তব্য করেছে।
অপরদিকে সরকারি–বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাওনা জমেছে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি তেলচালিত কেন্দ্রগুলোর পাওনা প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। একই সঙ্গে বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্যাস বিল বকেয়া দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ৫১৬ কোটি টাকা। এই পরিস্থিতিতে গ্রীষ্ম মৌসুমে লোডশেডিংয়ের আশঙ্কা বাড়ছে বলে খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।
চুক্তি অনুযায়ী সব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনে নেয় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। কিন্তু প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ লোকসানে বিক্রি এবং ভর্তুকি–নির্ভর কাঠামোর কারণে সংস্থাটির আর্থিক ঘাটতি বাড়ছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ একজন কর্মকর্তা বলেন, গ্যাসের অভাব, জ্বালানির ঘাটতি ও বকেয়া মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল। তবে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজা হচ্ছে। বকেয়া পরিশোধ না হলে কেন্দ্রগুলো জ্বালানি কিনে উৎপাদন চালু রাখতে পারবে না।
এখন দেশে প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। শীত চলে যাওয়ার পর ফেব্রুয়ারিতে বিদ্যুতের চাহিদা ১২ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। গ্রীষ্মে তা ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটে উঠতে পারে। দেশে মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৮ হাজার মেগাওয়াট হলেও গ্যাস, কয়লা ও এলএনজি সংকটে সক্ষমতার বহু কম বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। গ্যাসভিত্তিক প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার অর্ধেকের বেশি অচল থাকায় সক্ষমতার পারদ নিচে নামতে শুরু করে।
পিডিবির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলেন, গ্যাস–নির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে দৈনিক ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের সর্বনিম্ন চাহিদা রয়েছে। গ্যাসের যোগান এর থেকে কিছু কমলে উৎপাদনে ধস নামবে। তারা বলেন, গ্যাসের সরবরাহ যদি ১২০ কোটি ঘনফুট থেকে ১০ কোটি ঘনফুট কমে তাহলে প্রায় সাড়ে ৫শ মেগাওয়াট, যদি ২০ কোটি ঘনফুট কমে তাহলে ১১শ মেগাওয়াট লোডশেডিং হবে। গ্যাসের যোগান আরো কমলে লোডশেডিং পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে বলে মন্তব্য করে সূত্রগুলো বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ কিংবা জ্বালানি সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়াসহ সার্বিক পরিস্থিতিতে দেশের জ্বালানি খাত যে কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা অনিশ্চিত। আগামী গীষ্মে দেশের লোডশেডিং দৈনিক ৩ হাজার বা দেশের চাহিদার এক ৬ষ্ঠাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যেতে পারে।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়েও চাপ বাড়ছে উল্লেখ করে সূত্র জানিয়েছে, ভারতের আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ন্যাশনাল গ্রিডে সরবরাহের কথা থাকলেও প্রায় ৬০ কোটি ডলার বকেয়া নিয়ে টানাপোড়ন চলছে। শেষ পর্যন্ত আদানির বিদ্যুৎ কতটুকু সরবরাহে আসে তা এখনো বলা যাচ্ছে না। কয়লাভিত্তিক দেশীয় বড় কেন্দ্রগুলোরও বকেয়া বেড়েছে। পায়রা, রামপাল, বাঁশখালীসহ কয়েকটি কেন্দ্র কয়লা আমদানি ও সরবরাহ নিশ্চিতে আর্থিক চাপে রয়েছে। অন্যদিকে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে আউটেজ ও জরিমানা নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছে। সবকিছু নিয়ে দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের অন্ধকার ধেয়ে আসছে কি না তা সময় বলবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মন্তব্য করেন।
পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা আজাদীকে বলেন, দেশে গ্যাসের সরবরাহ পরিস্থিতি নাজুক। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে উৎপাদন কমছে। ফলে কমছে গ্যাসের যোগান। অপরদিকে আমদানির সক্ষমতাও সীমিত। সংস্থাটির নিজের বড় অংকের দেনা রয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নিয়মিত গ্যাস বিল পরিশোধ না করায় পেট্রোবাংলা বড় ধরনের চাপে রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর প্রেক্ষিতে চট্টগ্রামে গতকাল কোনো কোনো পেট্রোল পাম্প তেল নেই–এমন কথা প্রচার করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে পুঁজি করে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা হতে পারে বলে মন্তব্য করে বিপিসির শীর্ষ একজন কর্মকর্তা বলেন, দেশে জ্বালানি তেলের মজুত ও সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।



