লালমোহন পানি উন্নয়ন বোর্ডের দপ্তর যেন ভূতের বাড়ি

লালমোহন পানি উন্নয়ন বোর্ডের দপ্তর যেন ভূতের বাড়ি

বাইরে থেকে দেখা যায় বিশাল গেট, তাতে বড় করে লেখা ‘বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, লালমোহন উপবিভাগীয় প্রকৌশলীর দপ্তর’-এর সাইনবোর্ড; কিন্তু ভিতরের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো।

পানি উন্নয়ন বোর্ড

দেখে মনে হয় কোন পরিত্যাক্ত ভবন, বহু বছর আগের অফিস এখানে। অথচ এই দপ্তরটি লালমোহন ও তজুমদ্দিন দুই উপজেলার সাব-ডিভিশন অফিস। অফিসের নামে প্রতিবছর ঠিকই উন্নয়ন বরাদ্দ আসে। আছে নিয়োগকৃত কর্মকর্তা, স্টাফ সবই। তবে তারা লালমোহনে না থেকে পাশ্ববর্তী উপজেলা চরফ্যাশনে অফিস করেন। সেখানে বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করেন।

লালমোহনের পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই অফিসটি ছিলো এক সময় ভোলার দক্ষিণাঞ্চলের ব্যস্ততম অফিস। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরব উপস্থিতিতে প্রাণচাঞ্চল্য ছিলো এখানে। কোয়ার্টারগুলো ছিলো পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কোলাহলপূর্ণ। ছিলো সাজানো ফুলের বাগান, গাছ-গাছালি, চারপাশ ছিলো সুসজ্জিত। অফিসটি ওয়াপদা অফিস হিসেবে সকলের কাছে সুপরিচিত। সেই ওয়াপদা অফিসটি এখন ভুতুড়ে পরিত্যাক্ত অফিস ও বাসভবনে পরিণত হয়েছে। নির্জনতার কারণে এখানে কখনো কখনো প্রেমিক-প্রেমিকার জুটিও ঢুকে পড়ে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লালমোহনের এই সাব-ডিভিশন অফিসের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হলেন আহসান আহমেদ খান। এখানে নিয়োগ আছে চারজন উপসহকারী প্রকৌশলী (এসও), একজন করে শাখা কর্মকর্তা, সার্ভেয়ার, একাউন্ট ক্লার্ক, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর, স্পীড বোট চালক ও উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীর গাড়ি চালক। এরা সবাই লালমোহনে না থেকে চরফ্যাশনে থাকেন। চরফ্যাশনে নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে (ভোলা-২) তে বসেন। সেখানেই বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করেন তারা।

উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আহসান আহমেদ খানের বক্তব্য লালমোহনের অফিসের ভবনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাওয়ায় তারা চরফ্যাশনে বসেন। তবে অভিযোগ রয়েছে, লালমোহনের কার্যালয়টিকে অকার্যকর করতে এখানে থাকা চারটি মেরামতযোগ্য বাসভবন পরিত্যাক্ত দেখিয়ে নিলামে ভেঙ্গে নেওয়া হয়েছে।

কিন্তু নতুন কোন ভবন নির্মাণ করার উদ্যোগ নেই। ভেতরে রাত্রীযাপনের জন্য একটি বাংলো রয়েছে। তাতে মাঝেমধ্যে গেস্ট থাকেন। কিন্তু বাংলোর পাশেই মূল কার্যালয়টি জনশূন্য পরে আছে। প্রবেশ পথে আছে একটি মসজিদ। যাতে আশ পাশের শতাধিক মুসল্লী নিয়মিত নামাজ পড়েন। মসজিদটিও অযত্নে অবহেলায় চলছে।

মুসল্লিরা অভিযোগ ও দাবি জানানোর কোন কর্মকর্তা পাচ্ছে না। এখানে আউটসোর্সিংয়ে কর্মরত রুবেল নামের একজন প্রহরী রয়েছে। সে একাই এখন বাংলো থেকে শুরু করে পূরো কমাউন্ডের প্রহরী। এভাবেই চলছে লালমোহনের পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই দুই উপজেলার সাব-ডিভিশন কার্যালয় বা উপবিভাগীয় প্রকৌশলীর দপ্তরটি।

লালমোহন পৌরসভার ঠিকাদার মো. আনোয়ার (ছদ্মনাম) জানান, লালমোহনের জনসাধারণের কোনো প্রয়োজন হলে ২০-২৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে চরফ্যাশনের অফিসে যেতে হয়; কিন্তু সেখানে গিয়েও তাদের ঠিকমতো পাওয়া যায় না। অনেক অপেক্ষার পর রাত ৮টা ৯টার পর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আহসান আহমেদ খান ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের দেখা মিলে।

প্রয়োজনীয় কাজ সেরে লালমোহনে আসতে আসতে রাত দশটা এগারোটা বেজে যায়। ঠিকাদারদের জোরালো দাবি লালমোহনের অফিস লালমোহনেই থাকতে হবে। কর্মকর্তাদের এখানে বসেই অফিস করতে হবে। চরফ্যাশনে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে পারলে লালমোহনেও বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে পাওে তারা। এবিষয়ে ঠিকাদার ও লালমোহন-তজুমদ্দিন উপজেলার বাসিন্ধারা স্থানীয় সংসদ সদস্য ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রমের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

অভিযোগ রয়েছে, লালমোহনে অফিস না করলেও চরফ্যাশনে বসেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতি থেমে নেই। প্রতিবছর লালমোহন ও তজুমদ্দিনের জন্য বরাদ্দ আসে। তা চরফ্যাশন বসে ভাগভাটোয়ারা হয়ে যায়। নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আসফাউদদৌলা ও উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আহসান আহমদ খান লালমোহন অফিসের ভেতরে কর্মকর্তা কর্মচারীদের মেরামতযোগ্য চারটি বাসভবন বিনা কারণে গত বছরের ৯ নভেম্বর নিলাম দিয়ে দেন। দরপত্র দিয়ে মোট ৪৫টি ফরম বিক্রি দেখালেও এতে দেখা যায় নিলাম ড্রপের দিন মাত্র ৩টি ফরম ড্রপ করা হয়। দাখিলকৃত ৩টির মধ্যে ২টি বাতিল করে কুমিল্লার কামাল উদ্দিন এন্টারপ্রাইজেরটি বৈধ দেখানো হয়। সরকারি কোষাগারে ৫ লক্ষ ৬৫ হাজার টাকা জমা দিলেও এতে লেনদেন হয়েছে প্রায় ১২ লক্ষ টাকা।

এবিষয়ে লাইসেন্সের মালিক কামাল উদ্দিনের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, স্থানীয় ঠিকাদারদের নিকোজিশনের মাধ্যমে এ টেন্ডার সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া লালমোহনের উপজেলা কমপ্লেক্সের পাশের খালসহ বিভিন্ন স্থানে চলমান কাজ তদারকির জন্য বরিশাল থেকে আল-আমিন নামের একজন ওয়ার্কএসিস্টেন্টকে হায়ার করা হয়েছে। অথচ সে এখানকার নিয়োগকৃত কোন স্টাফই না বলে স্বীকার করেছেন এসও পদের একজন কর্মকর্তা। অভিযোগ উঠেছে, তাকে দিয়ে অফিসের কর্মকর্তারা নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী যা খুশি করতে পারেন।

দাঁতের ব্যথা দ্রুত বন্ধ করার উপায়

এসব অভিযোগের বিষয়ে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আহসান আহমেদ খান জানান, লালমোহনে ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সেখানে অফিস না করে চরফ্যাশন করা হয়। নিলামে ভেঙ্গে নেওয়া ভবনগুলো অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ছিলো। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নিলামের টাকা কোষাগারে জমা হয়েছে। অতিরিক্ত টাকা লেনদেনের বিষয়ে অফিসের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।

Explore More Districts