শেষ হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারের সময়সীমা। এখন শুধু ভোটের অপেক্ষা। একটানা ২০ দিনের উৎসব মুখর প্রচার–প্রচারণা শেষ। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রচার–প্রচারণা শেষ হওয়ায় এখন সর্বত্র চলছে ভোটের হিসেব–নিকেশ। আজ–কাল এ দুইদিন ভোটারদের মনজয়ে ব্যস্ত সময় কাটাবেন প্রার্থীসহ তাদের কর্মী–সমর্থকরা।
আগামী পরশু ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত একটানা অনুষ্ঠিত হবে বহুল প্রতীক্ষার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের পূর্ববর্তী ৪৮ ঘণ্টা ও পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টায় কোনো মিছিল, শোভাযাত্রা ও জনসভা না করার নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আজ মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শনিবার বিকাল ৪টা পর্যন্ত এই বিধিনিষেধ থাকবে বলে গতকাল সোমবার এক বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে ইসি। এদিকে অবাধ–সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোট গ্রহণে নির্বাচন কমিশন এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে ভোট কেন্দ্রে আসতে পারেন–এই ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৪০ হাজারের বেশি সদস্য এবার ভোট কেন্দ্র ও ভোটের নিরাপত্তার দায়িত্বে মাঠে কাজ করছেন।
চট্টগ্রামের ১৬ সংসদীয় আসনে ১৯৬৫টি ভোটকেন্দ্র এবং ১২০০১টি ভোট কক্ষে ভোটগ্রহণের জন্য ৪০ হাজার ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাকে (প্রিসাইডিং, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসার) প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রস্তুত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় ব্যালট পেপারসহ সকল নির্বাচনী সামগ্রী সহকারী রিটার্নিং অফিসারের পৌঁছে গেছে। ভোটগ্রহণ কর্মকর্তারা–বিশেষ করে প্রিসাইডিং অফিসারগণ আগামীকাল বুধবার সকাল থেকে আইন–শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় নির্বাচনের ব্যালট পেপারসহ সকল নির্বাচনী সামগ্রী নিয়ে ভোট কেন্দ্রে অবস্থান নিবেন।
চট্টগ্রামে ১৬ সংসদীয় আসনে এবার বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, এনসিপি, এলডিপি, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি, গণ ফোরাম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, এবি পার্টি, গণ অধিকার পরিষদ, সুপ্রিম পার্টি, বাসদ, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, গণসংহতি আন্দোলন, নাগরিক ঐক্য, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল–জেএসডি, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ, নেজামে ইসলাম পার্টিসহ বিভিন্ন দলের এবং স্বতন্ত্র মিলে এখন ১১৫ জন প্রার্থী ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন।
ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে ভোট কেন্দ্রে আসতে পারেন–এই ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। এই ব্যাপারে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসার মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ভোট ঘিরে চট্টগ্রামে নিরপেক্ষতা–আস্থার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। দায়িত্ব শতভাগ নিরপেক্ষতা ও দক্ষতার সঙ্গে পালন করে রাষ্ট্রকে একটি ফ্রি, ফেয়ার ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়া হবে। চট্টগ্রামে নির্বাচনকে সামনে রেখে আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় ৪০ হাজারের মতো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মাঠে নেমেছে। তারা গত শনিবার থেকে আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ শুরু করেছে।
এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজের সম্মেলন কক্ষে চট্টগ্রাম জেলা আইন–শৃঙ্খলা কমিটির সভায় জেলা প্রশাসক বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে প্রশাসনের সর্বস্তরের কর্মকর্তা–কর্মচারীরা দিন–রাত পরিশ্রম করছেন। মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। প্রত্যেকটি এলাকা ঘুরে মানুষের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরির চেষ্টা চলছে। মাঠে থাকা কর্মকর্তাদের জনগণের সঙ্গে আরও বেশি যোগাযোগ রেখে ভয় ও আতঙ্ক দূর করার আহ্বান জানান তিনি।
ভোট গ্রহণের প্রস্তুতি এবং নির্বাচনী এলাকায় ব্যালট পেপারসহ সকল নির্বাচনী সামগ্রী পৌঁছে গেছে বলে উল্লেখ করে চট্টগ্রামের সিনিয়র জেলা নির্বাচন অফিসার মোহাম্মদ বশির আহমেদ আজাদীকে বলেন, ব্যালট পেপারসহ সকল নির্বাচনী সামগ্রী সংসদীয় আসনগুলোর সহকারী রিটার্নিং অফিসারের কাছে প্রেরণ করা হয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তারা নিজ নিজ নির্বাচনী আসনের কেন্দ্রে ভোট গ্রহণের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। বুধবার সকাল থেকে ব্যালট পেপারসহ সকল নির্বাচনী সমাগ্রী নিয়ে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তারা কেন্দ্রে কেন্দ্রে অবস্থান নেবেন।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে এবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে ৭ দিনের জন্য। ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটকে ঘিরে গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠে রয়েছে, থাকবে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত । এ সংক্রান্ত পরিপত্র জারি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রচারণা শেষে এখন চলছে ভোটের হিসেব–নিকেশে।
এদিকে চট্টগ্রামের নির্বাচনী এলাকাসমূহে আইন–শৃঙ্খলা রক্ষা ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য ৬৯ জন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট এবং নির্বাচনী অপরাধসমূহ আমলে নিয়ে সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করার লক্ষে ৩১ জন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকাগুলো মনিটরিংয়ে রেখেছেন।
এর আগে প্রার্থীদের আচরণবিধি মনিটারিংয়ে প্রতিটি সংসদীয় আসনের জন্য ৪২ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সব মিলে চট্টগ্রামে ১৪২ জন জুডিসিয়াল ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্বে রয়েছেন।
চট্টগ্রামের ১৬ আসনে ১১৫ প্রার্থী :
চট্টগ্রামে ১৬ সংসদীয় আসনে এবার বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, এনসিপি, এলডিপি, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি, গণ ফোরাম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, এবি পার্টি, গণ অধিকার পরিষদ, সুপ্রিম পার্টি, বাসদ, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ইসলামি ফ্রন্ট, গণসংহতি আন্দোলন, নাগরিক ঐক্য, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল–জেএসডি, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ, নেজামে ইসলাম পার্টিসহ বিভিন্ন দলের এবং স্বতন্ত্র মিলে এখন ১১৫ জন প্রার্থী ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন।
মোট ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা :
চট্টগ্রামের ১৬ সংসদীয় আসনে ১৯৬৫টি ভোটকেন্দ্র এবং ১২০০১টি ভোট কক্ষে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ভোটগ্রহণের জন্য ৪০ হাজার ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাকে (প্রিসাইডিং, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসার) প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রস্তুত করা হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের ১৬ সংসদীয় আসনে ১৯৬৫টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ৬০৭টি সিএমপির ১৬ থানার অধীনে। অবশিষ্ট ১৩৫৮টি কেন্দ্র জেলা পুলিশের ১৭টি থানার অধীনে।
পুলিশের পক্ষ থেকে এসব কেন্দ্রকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ, গুরুত্বপূর্ণ ও সাধারণ হিসেবে চিহ্নিত করে তালিকা করা হয়েছে। এরমধ্যে চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনে ৬৫৩টি কেন্দ্রকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। পুলিশী ভাষায় এসব কেন্দ্রকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তালিকা অনুযায়ী চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অধীনে থাকা ৬০৭টি কেন্দ্রের মধ্যে ৩১০ টি ‘অধিক গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আর জেলা পুলিশের অধীনে ৩৪৩টি কেন্দ্রকে ‘অধিক গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ভোট কেন্দ্রের নিরাপত্তায় কত সদস্য :
প্রত্যেক ভোটকেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১৩ থেকে ১৮ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করবে। ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বে অস্ত্রসহ পুলিশ, অস্ত্রসহ আনসার–ভিডিপি সদস্য, লাঠিসহ পুরুষ ও মহিলা আনসার–ভিডিপির সংখ্যা ১০জন, গ্রাম পুলিশ থাকবে ১ থেকে ২ জন। এছাড়া পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, কোস্টগার্ড থাকবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা পরিপত্র জারি অনুযায়ী মেট্রোপলিটন এলাকার বাইরে (জেলায়) প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে ২ জন পুলিশ (অস্ত্রসহ), ১ জন আনসার (অস্ত্রসহ), প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে প্রিজাইডিং অফিসারের নিরাপত্তার জন্য ১ অস্ত্রসহ আনসার সদস্য, ১ অঙ্গীভূত আনসার/সাধারণ আনসার, সহকারী সেকশন কমান্ডার (অস্ত্রসহ), অঙ্গীভূত আনসার/সাধারণ আনসার ও ভিডিপি (মহিলা ৪ জন, পুরুষ ৬ জন) মোট ১০ জন লাঠিসহ। গ্রাম পুলিশ ১ থেকে ২ জন লাঠিসহ। গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে পুলিশ ৩ জন অস্ত্রসহ, আনসার ১ জন, সেকশন কমান্ডার (অস্ত্রসহ), প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে প্রিজাইডিং অফিসারের নিরাপত্তার জন্য ১ অস্ত্রসহ আনসার সদস্য, ১ জন অঙ্গীভূত আনসার সদস্য অস্ত্রসহ, অঙ্গীভূত আনসার/ সাধারণ আনসার ও ভিডিপি (মহিলা ৪ জন, পুরুষ ৬ জন) মোট ১০ জন লাঠিসহ এবং গ্রাম পুলিশ ১ থেকে ২ জন লাঠিসহ। মেট্রোপালিটন এলাকার ভোট কেন্দ্রে পুলিশ ৩ জন অস্ত্রসহ, অঙ্গীভূত আনসার/সাধারণ আনসার ১জন অস্ত্রসহ, প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসারের নিরাপত্তার জন্য ১ অস্ত্রসহ আনসার সদস্য, অঙ্গীভূত আনসার/সাধারণ আনসার ১জন অস্ত্রসহ, অঙ্গীভূত আনসার/সাধারণ আনসার ও ভিডিপি (মহিলা ৪ জন, পুরুষ ৬ জন) মোট ১০ জন লাঠিসহ। মেট্রোপালিটন এলাকার গুরুত্বপূর্ণ ভোট কেন্দ্র গুলোতে থাকবে পুলিশ ৪ জন অস্ত্রসহ, অঙ্গীভূত আনসার ১ জন (অস্ত্রসহ), প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে প্রিজাইডিং অফিসারের নিরাপত্তার জন্য ১ অস্ত্রসহ আনসার সদস্য, ১ জন অঙ্গীভূত আনসার সদস্য অস্ত্রসহ, অঙ্গীভূত আনসার/সাধারণ আনসার ও ভিডিপি (মহিলা ৪ জন, পুরুষ ৬ জন) মোট ১০ জন লাঠিসহ দায়িত্ব পালন করবেন।
চট্টগ্রামের মোট ভোটার সংখ্যা :
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের ১৬ সংসদীয় আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৬৬ লাখ ৮২ হাজার ৫১৭জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার সংখ্যা ৩৪ লাখ ৮৩ হাজার ৮৭৭জন এবং মহিলা ভোটার সংখ্যা ৩১ লাখ ৯৮ হাজার ৫৭০জন। এবার তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৭০জন।


