
ঢাকা, ১২ জানুয়ারি – নির্বাচন ডাকাতি আর যেন না ঘটে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, আমরা ভোট ডাকাতির কথা শুনেছিলাম, কিছু কিছু জানতামও। কিন্তু এত নির্লজ্জভাবে পুরো প্রক্রিয়াকে বিকৃত করে, সিস্টেমকে দুমড়ে-মুচড়ে ফেলে নিজেদের মনের মতো একটা কাগজে রায় লিখে দেওয়া হয়েছে— এগুলো জাতির সামনে তুলে ধরা দরকার। এসবের পুরো রেকর্ড থাকা প্রয়োজন। নির্বাচন ডাকাতি যেন আর কখনো না ঘটতে পারে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে জাতীয় নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) তদন্ত কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদন গ্রহণের সময় এসব কথা বলেন তিনি।
প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর তদন্তের বিভিন্ন দিক নিয়ে কমিশনের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন কমিশন প্রধান সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইন, কমিশন সদস্য শামীম আল মামুন, কাজী মাহফুজুল হক সুপণ, ব্যারিস্টার তাজরিয়ান আকরাম হোসেন ও ড. মো. আব্দুল আলীম। উপদেষ্টাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, তথ্য উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান এবং সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী।
তদন্ত প্রতিবেদনে কমিশন জানায়, ২০১৪ সালে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং বাকি ১৪৭টি আসনে যে তথাকথিত ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ নির্বাচন হয়েছিল, তা ছিল পুরোপুরি সাজানো ও সুপরিকল্পিত। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতেই এই বন্দোবস্ত করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালের নির্বাচন সারা বিশ্বে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন হিসেবে সমালোচিত হওয়ায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ২০১৮ সালের নির্বাচনকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ দেখানোর মিশন নেয়। বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দল সেই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বুঝতে না পেরে নির্বাচনে অংশ নেয়।
প্রতিবেদন গ্রহণের পর প্রধান উপদেষ্টা আবারও বলেন, আমরা ভোট ডাকাতির কথা শুনেছিলাম, কিছুটা জানতাম। কিন্তু এত নির্লজ্জভাবে পুরো প্রক্রিয়াকে বিকৃত করে, সিস্টেমকে দুমড়ে-মুচড়ে ফেলে নিজেদের মতো করে কাগজে রায় লিখে দেওয়া হয়েছে— এসব জাতির সামনে আনা দরকার। এর পুরো রেকর্ড থাকা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, দেশের মানুষের টাকা খরচ করে নির্বাচন আয়োজন করে পুরো জাতিকেই শাস্তি দেওয়া হয়েছে। সে সময় দেশের মানুষ অসহায়ের মতো তাকিয়ে ছিল, কিছুই করতে পারেনি। জনগণ যেন অন্তত কিছুটা স্বস্তি পায়, সে জন্য এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িতদের চেহারা জাতির সামনে তুলে ধরতে হবে। কারা করেছে, কীভাবে করেছে— তা জনসমক্ষে আসা দরকার। নির্বাচন ডাকাতি যেন আর কখনো না ঘটে, সে জন্য স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রায় ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে রাতে ব্যালট পেপারে সিল মেরে আগেই আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করা হয়েছিল। আওয়ামী লীগকে জেতাতে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের অসৎ প্রতিযোগিতা চলেছিল। এর ফলে কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোট প্রদানের হার ১০০ শতাংশেরও বেশি দেখানো হয়। অন্যদিকে, ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিএনপিসহ প্রধান বিরোধী দলগুলো অংশ না নেওয়ায় ‘ডামি’ প্রার্থী দাঁড় করিয়ে নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক দেখানোর কৌশল নেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত তিনটি নির্বাচনের এই জালিয়াতির পরিকল্পনা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তে করা হয়েছিল। তা বাস্তবায়নে প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করা হয়। এমনকি কিছু কর্মকর্তাকে নিয়ে একটি বিশেষ সেলও গঠন করা হয়েছিল, যা ‘নির্বাচন সেল’ নামে পরিচিত ছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে নির্বাচন ব্যবস্থা ধীরে ধীরে নির্বাচন কমিশনের হাত থেকে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এ সময়ে নির্বাচন পরিচালনার মূল শক্তি হিসেবে কমিশনের জায়গা দখল করে নেয় প্রশাসন।
এনএন/ ১২ জানুয়ারি ২০২৬



