জুলাই-আগস্ট ছাত্র জনতার আন্দোলনে সবচেয়ে নেতিবাচক অবস্থান ছিলো ঢাকা মহানগর পুলিশে (ডিএমপি) কর্মরত শত শত পুলিশ কর্মকর্তাদের। তাদের এমন কর্মকাণ্ডের কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়ে। তবে দক্ষ কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে সেই আস্থার সংকট কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছে দেশের সবচেয়ে বড় এই ইউনিটটি।
দুই কোটি রাজধানীবাসীকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও নিরাপত্তার পাশাপাশি ডিএমপি পুলিশের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা। ফুটপাত ও সড়ক দখল করে গাড়ি রাখা ও দোকান বসানোর কারণে ঢাকায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ কঠিন।
২০২০ সালে রাজধানীর দুটি সড়কে সাইকেললেন চালু করা হলেও বাস্তবে তার ব্যবহারের সুযোগ নেই। অবৈধ পাকিং ও দোকান বসিয়ে সাইকেল লেনটি দখল করা হয়েছে। সাইকেল লেনটি উদ্ধার করলেও সেটি মুক্ত রাখা নিয়ে শঙ্কিত ডিএমপির ট্রাফিকের অতিরিক্ত কমিশনার খোন্দকার নজমুল হাসান।
সম্প্রতি ডিএমপি কমিশনারের সংবাদ সম্মেলনে সাইকেল লেনের তথ্য জানা আছে কি না জানতে চাইলে নজমুল হাসান বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই। তবে দ্রুতই সাইকেল লেন মুক্ত করার কথা জানান তিনি।
পাশাপাশি তিনি বলেন, রাস্তা দখল উচ্ছেদ নিয়ে রাস্তায় ইদুর বিড়াল খেলা চলছে। আমরা কাজ করছি। আগামী কিছু দিনের মধ্যেই এটা পরিষ্কার কার হবে। মানিক মিয়া এভিনিউতে বিআরটিসি ট্রাক সরানো হয়েছে।
বিআরটিসির ট্রাকসহ অবৈধ পার্কিং বন্ধের ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র দেখতে গত দুই দিন মানিক মিয়া এভিনিউতে নজর রাখে বার্তা২৪.কম। সকাল কিংবা সন্ধ্যা সব সময়েই সাইকেল লেন বন্ধ করে শত শত গাড়ির দেখা পাওয়া যায়। মানিক মিয়া সড়কের দক্ষিণ পাশ অন্তত অর্ধশত ট্রাকের দখলে।
গত বুধবার (১১ ডিসেম্বর) দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, অন্তত ২০টি বিআরটিসি ট্রাক, বাস, পিক আপ, প্রাইভেটকার ও রিকশা দাঁড়িয়ে রয়েছে। পাশাপাশি রাস্তার দুই পাশেই অবৈধ দোকান বসানো হয়েছে। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে ময়লার স্তুপ দেখা গেলো।
মানিক মিয়া এভিনিউতে ন্যাম ভবনের পাশে কৃষকের বাজারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকের চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষকের বাজারের জন্য কাঁচামালসহ বিভিন্ন পণ্য আনা হয়। পণ্যগুলো খালাস করার পরেও এখানেই দাঁড় করিয়ে রাখা হয় ট্রাকগুলোকে। অথচ মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরেই তাদের নির্ধারিত পার্কিংয়ের স্থান রয়েছে। তবে তেল বাঁচাতে তারা তেজগাঁওয়ের সেই পার্কিংয়ে যাচ্ছেন না। দিন-রাত রাস্তা দখল করে ট্রাক রেখে সংসদ ভবনের সামনের রাস্তাকেই ট্রাক স্ট্যান্ড বানিয়ে ফেলেছেন চালকরা।
রাস্তায় ট্রাক রেখে বিশ্রাম করছিলেন মো. আসাদ। ট্রাকটি সাইকেল লেনে রাখা হয়েছে এ বিষয়ে জানেন কি না, এমন প্রশ্নে অবাক হয়ে আসাদ উত্তর দিলেন- এমন তথ্য আমার জানা নেই। বাজারের জন্য সবজি আনার পর এখানেই গাড়ি রাখি। কেউ কিছু বলে নাই। প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০টি ট্রাক রাখা হয়। আমাদের গাড়ি সরাতে বললে এখানে গাড়ি রাখবো না।
বৃহস্পতিবার (১২ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় সাইকেল লেন উদ্ধার ও দখল মুক্ত করার বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত কমিশনার নজমুল হাসান বলেন, সত্য কথা হলো আমরা দখলদারদের সরিয়েছি। কিন্তু বাস্তবতা হলো সাইকেল লেন কতক্ষণ মুক্ত রাখতে পারবো সেটা বলতে পারছি না। সাইকেল লেন মুক্ত রাখা নিয়ে আমি শঙ্কিত। দিনে চার বার করে গাড়ি সরাই। আবারও এসে রাস্তা দখল করে রাখে। বিআরটিসির ট্রাকগুলোকেও কিছু বলা যাচ্ছে না। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি।
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঢাকার যানজটের আরেক কারণ স্কুল। স্কুলগুলো করার আগে কোনো অনুমোদন নেওয়া হয় না। যাত্রাবাড়িতে একটি স্কুলের বিষয়ে আমরা আপত্তি জানিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে স্কুল হয়েছে। এখন যাত্রাবাড়ি-মাওয়া সড়কের কি অবস্থা হয় আমি জানি না। আমরা রাস্তায় পার্কিংয়ের জন্য মামলা করার পরেও একই কাজ বারবার করছে।
সম্প্রতি ডিএমপির ৩২তম কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে মত বিনিময় সভা করেন শেখ মোঃ সাজ্জাত আলী। এই সভায় নিজের লিখিত বক্তব্যে ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নতির বিষয়ে কমিশনার বলেন, একটি আদর্শ শহরে ২৫ শতাংশ রাস্তা থাকা উচিত কিন্তু ঢাকা শহরে সেখানে রয়েছে মাত্র ৭ শতাংশ। ঢাকার সীমিত রাস্তায় যন্ত্রচালিত গাড়ির সঙ্গে সাধারণ রিকশা চলে। সেই সঙ্গে এখন অতিরিক্ত সংখ্যায় অটোরিকশা যোগ হয়েছে। সাধারণ রিকশার তুলনায় অটোরিকশার আকার দ্বিগুণ হওয়ায় ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এগুলো চলাচলে একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনার উপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, যারা রাস্তা ব্যবহার করেন, তারা সড়ক পরিবহন আইন মানতে চান না। অন্যদিকে হকাররা ফুটপাত দখল করে রেখেছে। এ অবস্থায় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করা অত্যন্ত জটিল। এমনকি যেখান দিয়ে নগরবাসী হাঁটেন, সে রাস্তায়ও মোটরসাইকেল চালকরা মোটরসাইকেল চালান। এ অবস্থার উত্তরণের জন্য নগরবাসীর সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি
রাস্তায় গাড়ির ব্যবহার একটু হলেও কমাতে সন্তানদের স্কুল এবং কর্মক্ষেত্রের আশেপাশে বসবাস করার আহ্বান জানান তিনি। সকলের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা মহানগরের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে বড় অবদান রাখবে বলে মনে করেন ডিএমপি কমিশনার। এছাড়া একটি মোটরসাইকেলে দুজনের বেশি উঠলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা করেন তিনি।


