জাতীয়তাবাদ তথা যেকোনো পরিচিতিনির্ভর রাজনীতির একটা সংকট হলো পরিচয় গড়ে ওঠার প্রক্রিয়াটাই একাধারে গ্রহণ ও বর্জনমূলক। যেমন বাঙালি জাতীয়তাবাদ বাঙালি নয়, কিংবা তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক—এমন সব পরিচয় ও বর্গকে পর করে, তা সে মুসলমান, বিহারি, চাকমা, যা-ই হোক না কেন। একইভাবে ইসলামি পরিচয়বাহী রাজনীতি, যা কিছুকে ইসলামবিরোধী জ্ঞান করে, তাকেই বর্জন করবে। এখন সেই সূত্রমতে বাঙালি-মুসলমানের জাতীয়তাবাদ কায়েম হওয়ার অর্থ হলো, এ দেশে যেসব মানুষ একই সঙ্গে এ দুই বর্গের নন, তাঁরা সবাই এখানে জাতীয়তাবাদের পরিসরে ‘অপর’ হয়ে উঠবেন। জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে এই অপরকরণ থেকে মুক্তির কোনো পথ নেই। ইউরোপের জাতিরাষ্ট্রগুলো এই অপরকরণের সংকটে পড়েছিল, যখন কিনা সাবেক উপনিবেশগুলো থেকে সেখানে অভিবাসীরা পাড়ি জমিয়েছিলেন। আজ অবধি বহু–সাংস্কৃতিক রাষ্ট্র তৈরি করেও সাংঘর্ষিক পরিচয়ের রাজনীতির বিবাদ থেকে তারা মুক্তি পায়নি।
তাহলে উপায় কী? জাতীয়তাবাদী পরিচয়ের রাজনীতিকে আমরা ফেলে দিতে পারব না, কিন্তু আমাদের কর্তব্য হচ্ছে, তাকে যথাসম্ভব অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলা। সাম্প্রতিক সময়ে এই কথা জোরেশোরে উঠেছে যে বিগত সেক্যুলার ও বাঙালি জাতীয়তাবাদী শাসনে হিজাব পরা নিয়ে, মাদ্রাসায় লেখাপড়া করা নিয়ে মানুষকে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। সেটা নিশ্চয় অন্যায় ছিল। আবার ঠিক এ মুহূর্তে সেক্যুলার মহলে এই শঙ্কা বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে যে ইসলামপন্থী রাজনীতি শক্তিশালী হলে অপরাপর ধর্মের কিংবা ধর্ম মানেনই না, এমন মানুষের জীবন ও বিশ্বাস আক্রান্ত হবে কি না; অথবা নারীরা ইসলাম অনুমোদন করেন না—এমন পোশাক পরতে পারবেন কি না। আবার ধরুন, আদিবাসী মানুষ, যাঁরা না বাঙালি না মুসলমান, তাঁরা তো দুই খাঁড়ারই নিচে কাটা পড়বেন। কিন্তু দেশটা তো সবার। এ কথা বলা প্রয়োজন, দেশটা যতটুকু বাঙালির, ঠিক ততটুকুই ভিন্ন জাতির মানুষেরও; যতটা মুসলমানের, ঠিক ততটাই অপরাপর বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মানুষেরও; যতটা পুরুষের, ঠিক ততটাই নারীর কিংবা নারী কিংবা পুরুষ নন, এমন ভিন্ন লিঙ্গের মানুষেরও। রক্তস্নাত গণ–অভ্যুত্থানপরবর্তী বাংলাদেশকে আমরা সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের ঊর্ধ্বে উঠে যদি কল্পনা করতে না পারি, তাহলে তো আবার আমাদের সংঘর্ষের চোরাপথেই ঘুরে মরতে হবে।
* সাঈদ ফেরদৌস : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক; দেশভাগ–বিষয়ক গবেষক

