প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বইমেলা অনুষ্ঠিত হতো নগরে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং রমজান মাস থাকায় এ বছর ফেব্রুয়ারিতে ‘অমর একুশে বইমেলা’ নামে পরিচিত এ বইমেলা আয়োজন করেনি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। তবে প্রকাশকদের আগ্রহ ও পাঠক–লেখকের চাহিদা সামনে রেখে চসিকের ব্যবস্থাপনায় আজ মঙ্গলবার থেকে কাজীর দেউড়ির চট্টগ্রাম জেলা স্টেডিয়াম সংলগ্ন জিমনেশিয়াম মাঠে শুরু হচ্ছে ‘স্বাধীনতা বইমেলা’। ১৯ দিনব্যাপী এ বইমেলায় চট্টগ্রাম ও ঢাকার ৯৬টি প্রকাশনা সংস্থার ১৩১টি স্টল থাকবে। এর মধ্যে চট্টগ্রামের ৫০ প্রকাশনা সংস্থার ৭২টি এবং ঢাকার ৪৬ প্রকাশনা সংস্থার স্টল থাকবে ৫৯টি। মেলার আয়তন ৪০ হাজার বর্গফুট।
বইমেলার আয়োজক চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। তবে চট্টগ্রামের সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদ, নাগরিক সমাজ, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাহিত্যিক, লেখক, বুদ্ধিজীবী এবং অন্যান্য শিল্প–সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতরাই সম্মিলিতভাবে এ মেলা বাস্তবায়ন করবেন। মেলা প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা ও ছুটির দিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। মেলা চলবে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত।
২০১৯ সাল থেকে সম্মিলিত উদ্যোগে নগরে এ বইমেলা হয়ে আসছে। সর্বশেষ ২০২৫ সালে বইমেলায় চট্টগ্রাম ও ঢাকার ১০৭ প্রকাশনা সংস্থার ১৪০টি স্টল ছিল। ওই হিসেবে এবার মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা সংস্থা এবং স্টল সংখ্যা কমেছে।
এদিকে মেলার সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে গতকাল সোমবার মেলা প্রাঙ্গণে সংবাদ সম্মেলন করেন সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। এ সময় তিনি বলেন, বীর চট্টগ্রামের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে ধারণ করে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের লক্ষ্যে এ বইমেলার আয়োজন করা হয়েছে। চট্টগ্রামের পাশাপাশি ঢাকার স্বনামধন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো মেলায় অংশ নিচ্ছে। আশা করছি, এবারের বইমেলা অন্যান্য বারের চেয়ে অনেক বেশি লেখক–পাঠক সমাগমে ভরপুর হয়ে উঠবে। সর্বস্তরের লেখক–পাঠক ও সৃজনশীল নাগরিকদের অংশগ্রহণে সংস্কৃতি ও মননের উৎকর্ষের পাশাপাশি ইতিহাস–ঐতিহ্য–সংস্কৃতির সম্মিলন ঘটবে মেলায়।
মেয়র বলেন, এই বইমেলা শুধু একটি আয়োজন নয়, এটি চট্টগ্রামের সকল মানুষের। লেখক, পাঠক ও সংস্কৃতিমনা মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হবে এ আয়োজন। তিনি জানান, মেলায় যাতে লেখক–পাঠক দর্শনার্থীরা প্রাণ খুলে ঘুরে বেড়াতে পারে এবং বই ক্রয় করতে পারে সেজন্য মেলায় প্রচুর খোলা জায়গা রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যে মেলার সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।
ডা. শাহাদাত বলেন, মেলার সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে পুরো মেলা প্রাঙ্গণ সিসিটিভি নেটওয়ার্কের আওতাভুক্ত থাকবে। পুলিশের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে। নিরাপত্তার জন্য গেইটে ও মেলায় পুলিশ মোতায়েন থাকবে। এছাড়াও বেসরকারি পেশাদার একটি নিরাপত্তা সংস্থা সার্বক্ষণিক নিয়োজিত থাকবে।
মেয়র বলেন, বই মানুষের প্রকৃত বন্ধু। বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই মোবাইল ও মাদকের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে, যা তাদের ভবিষ্যতের জন্য হুমকি। বইমেলা তরুণ প্রজন্মকে সৃজনশীল পথে ফেরাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি অভিভাবক, শিক্ষক ও সমাজের সকল স্তরের মানুষকে এ বিষয়ে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।
আয়োজক সূত্রে জানা গেছে, বইমেলায় জাতীয় জীবনে যেসব ব্যক্তি কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন তাদের স্বাধীনতা সম্মাননা স্মারক পদক প্রদান করা হবে। এছাড়া মেলামঞ্চে আয়োজন করা হবে রবীন্দ্র উৎসব, নজরুল উৎসব, লেখক সমাবেশ, যুব উৎসব, শিশু উৎসব, মুক্তিযুদ্ধ উৎসব, ছড়া উৎসব, কবিতা উৎসব, আলোচনা, লোক উৎসব, তারুণ্য উৎসব, নারী উৎসব, বৈশাখী উৎসব, মরমী উৎসব, আবৃত্তি উৎসব, নৃগোষ্ঠী উৎসব, পেশাজীবী সমাবেশ, চাটগাঁ উৎসব, বইমেলার সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। মেলায় প্রতিদিনের বিষয়ভিত্তিক আলোচনায় দেশের প্রখ্যাত লেখক–কবি–সাহিত্যিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষাবিদ ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ অংশ নেবেন।
এছাড়া মেলা মঞ্চে প্রতিদিন শিশু–কিশোরদের চিত্রাঙ্কন, রবীন্দ্র–নজরুল সঙ্গীত, চিত্রাঙ্কন, সাধারণ নৃত্য, আবৃত্তি, উপস্থিত বক্তৃতা, দেশের গানের আয়োজন করা হবে। মেলাকে আকর্ষণীয় করার লক্ষ্যে চট্টগ্রামের লেখক, সাহিত্যিক, সংস্কৃতি কর্মী ও বইপ্রেমীদের নিয়ে বিভিন্ন উপ–পরিষদ গঠন করা হয়েছে। তাদের সহযোগিতায় প্রতিদিনের অনুষ্ঠানমালা সাজানো হয়েছে। মেলা মঞ্চে প্রতিদিন মুক্তিযুদ্ধের জাগরণী ও দেশাত্মবোধক গান পরিবেশিত হবে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন চসিকের সচিব মো. আশরাফুল আমিন, প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা ড. কিসিঞ্জার চাকমা, মেয়রের একান্ত সচিব অভিষেক দাস, আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা প্রণয় চাকমা, রাজস্ব কর্মকর্তা সাব্বির রহমান সানি, আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা জোবাইদা আকতার, শিক্ষা কর্মকর্তা নাজমা বিনতে আমিন, জনসংযোগ ও প্রটোকল কর্মকর্তা আজিজ আহমদ, চট্টগ্রাম সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদের সভাপতি শাহাবুদ্দীন হাসান বাবু ও চসিকের সমাজ কল্যাণ কর্মকর্তা মামুনুর রশীদ মামুন।
চট্টগ্রাম সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদের সভাপতি শাহাবুদ্দীন হাসান বাবু আজাদীকে বলেন, স্বাধীনতা বইমেলা নিয়ে আমরা আশাবাদী। ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় বইমেলা জমেনি। তাই চট্টগ্রামের পাশাপাশি ঢাকার প্রকাশকরা এ বইমেলা নিয়ি আগ্রহী। ঢাকার নামকরা প্রকাশনা সংস্থাগুলোও চট্টগ্রামমুখী। সবার আগ্রহ এ বইমেলা নিয়ে। সবমিলিয়ে আমরা আশাবাদী।


