
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-১ আসনে যে দলের প্রার্থী জয়লাভ করে সে দলই সরকার গঠন করে–এমন একটি কথা প্রচলিত। স্বাধীনতার পর থেকে অনুষ্ঠিত প্রতিটি নির্বাচনে সত্যও হয়েছে এটি। সেই সূত্র ধরে ঐতিহ্যবাহী আসনে পরিণত হওয়া এই আসনে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জয়ী হতে মরিয়া বিএনপি ও জামায়াত।
এই লক্ষ্য ধরে এই অঞ্চলে সবার দৃষ্টি এখন সিলেট-১ আসনের দিকে। আসনটিতে এবার ভিন্ন মেজাজে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়েছেন বিএনপি, জামায়াতসহ অন্য দলের প্রার্থীরা। প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আসনটিতে জয়লাভ করতে নানা কৌশল অবলম্বন করছে প্রধান দুই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি ও জামায়াত। তাদের জয়-পরাজয় দলের আত্মমর্যাদার বিষয় বলে বিবেচনা করছেন তারা। এদিকে দল দুটির নেতাকর্মীরা বলছেন, অতীত ইতিহাস ধরেই এই আসনে জয় চান তারা।
নির্বাচনকে সামনে রেখে সিলেট-১ আসনে নিজেদের নিয়মিত নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারের কাজ করছেন জামায়াতের নারী সদস্যরা। তাদের এই কৌশলকে আমলে নিয়ে একইভাবে মাঠে নেমেছেন স্থানীয় বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নারী নেত্রীরাও।
এদিকে সিলেটের সাবেক সিটি মেয়র ও সিলেট-৪ (জৈন্তাপুর-গোয়াইনঘাট-কোম্পানীগঞ্জ) আসনে বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী সোমবার সিলেট-১ (সিটি করপোরেশন ও সদর) আসনে দলীয় প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের পক্ষে প্রচারে নামেন। তিনি তাঁর আসন ছেড়ে নিজ শহরের আম্বরখানা ও দরগাগেট এলাকায় প্রচারণার কাজ করেন। ওই সময় মুক্তাদির ছাড়াও আরিফবলয়ের উল্লেখযোগ্য নেতাকর্মী ও সাবেক কাউন্সিলররা উপস্থিত ছিলেন। এতদিন মুক্তাদিরের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে দূরত্বে থাকলেও দলীয়ভাবে বিজয় নিশ্চিতে সেই দূরত্ব কাটিয়ে কাছে এসেছেন আরিফ ও তাঁর অনুসারীরা। বিএনপির বিদ্রোহীবলয়ের ভোটের একাংশ আশা করছিল জামায়াত। এক্ষেত্রে সেটি আর হচ্ছে না।
সোমবার আরিফুল হক বিষয়টি স্পষ্ট জানান দিয়েছেন দলীয় প্রার্থীর পক্ষে। আরিফ বলেন, তিনি সিটি করপোরেশনের দুইবারের মেয়র ছিলেন। কী উন্নয়ন করেছেন তা মানুষ নিজের চোখে দেখেছেন। খন্দকার মুক্তাদিরকে ভোট দেওয়ার অনুরোধ করে আরিফ বলেন, কোনো ভুল সিদ্ধান্তের জন্য এলাকার মানুষ যেন পিছিয়ে না পড়ে। সিলেট ইসলামী মূল্যবোধের এলাকা। অথচ এখানে এআই দিয়ে প্রার্থীদের চরিত্র হনন করছে একটি মহল। তারা মুখে ইসলাম নিয়ে এসব করছে।
এ সময় মুক্তাদির বলেন, আরিফুল হক নিজের আসন ছেড়ে ব্যস্ততার মধ্যে তার জন্য এসেছেন; যা প্রমাণ করে নিজের মানুষের জন্য এবং দলের জন্য কতটা নিবেদিত তিনি। আগামীতে এই ঐক্য সিলেটের মানুষের মুখে হাসি ফোটাবে।
সিলেট-১ আসনে ৮ প্রার্থীর মধ্যে বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সরব প্রচারণায় রয়েছেন ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা। দলটির প্রার্থী মাহমুদুল হাসান (হাতপাখা) প্রতিদিন সভা ও গণসংযোগ করছেন। এ ছাড়া বাসদের প্রণব জ্যোতি পাল (মই), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন (কাস্তে), গণঅধিকার পরিষদের আকমল হোসেন (ট্রাক), ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মো. শামীম মিয়া (আপেল) ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) সঞ্জয় কান্ত দাস (কাঁচি) প্রচারণায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।
সিটি করপোরেশনের ৪২টি ওয়ার্ড ও সদর উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত সিলেট-১ আসনে এবার ভোটার সংখ্যা ৬ লাখ ৮০ হাজার ৯৪৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৩ লাখ ৫৩ হাজার ১৮৬, নারী ৩ লাখ ২৭ হাজার ৭৪৭ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১৩ জন। উপজেলার চেয়ে সিটি করপোরেশন এলাকায় ভোটার বেশি। ভোটের মাঠে প্রচার এখন তুঙ্গে। ভোটারের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন প্রার্থী ও তাদের সমর্থকেরা। জামায়াত পরিবর্তন, সৎ, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব কায়েমের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এবং বিএনপি উন্নয়ন, ইনসাফ, সমৃদ্ধিসহ নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছে।
সিটি এলাকার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপিকর্মী বেলাল খান জানান, তারা দলীয় নির্দেশনা মতে এলাকাভিত্তিক ভোটারদের গুরুত্ব দিয়ে প্রচারণা করছেন। একই ওয়ার্ডের জামায়াত কর্মী দিলওয়ার হোসেন বলেন, ভোটাররা দাঁড়িপাল্লার প্রতি সহানুভূতিশীল। তারা এবার ভোটও দেবেন। প্রতিটি ঘরে ঘরে তারা যাচ্ছেন। আসনটিতে খন্দকার মুক্তাদিরের বাবা খন্দকার আব্দুল মালিক ১৯৯১ সালে বিএনপির এমপি ছিলেন। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনেও তিনি বিজয়ী হন।
ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ আসনে বিএনপির প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির (ধানের শীষ) ও জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা হাবিবুর রহমানের (দাঁড়িপাল্লা) মধ্যে মূল লড়াই হবে। প্রচারণা ও জনসমর্থনে বিএনপির খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এগিয়ে রয়েছেন।
জামায়াতের প্রচারণা কমিটির প্রধান নগর জামায়াতের নায়েবে আমির নুরুল ইসলাম বাবুল বলেন, ‘আমরা জয়ের ব্যপারে আশাবাদী। জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করে সন্ত্রাস ও দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার লক্ষ্যে প্রত্যেক নেতাকর্মী মাঠে কাজ করছেন। তরুণদের কাছ থেকে বেশি সাড়া পাচ্ছি। আশা করি একটা পরিবর্তন আসবে।’
খন্দকার মুক্তাদিরের নির্বাচনী প্রচারণা কমিটির প্রধান ও নগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান লোদী কয়েস বলেন, বিএনপির কর্মীরা প্রত্যেকের বাড়ি যাচ্ছেন। তারা পাড়া-মহল্লায় গিয়ে ভোট প্রার্থনা করছেন। অনেক এলাকায় ভোটাররা ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন।

