সন্তান হারানোর আগে             একটু ভাবুন

৩০ August ২০২৬ Sunday ১০:১৮:২৩ PM

Print this E-mail this


মোঃ কাওসার হোসেন, শিক্ষক ও সাংবাদিক।।

আজকের অবহেলা যেন আগামী দিনের কান্না না হয়

কয়েকদিন আগে বানারীপাড়া বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী রুবাইয়ার মা মুঠোফোনে আমাকে বললেন,

“স্যার, আমার মেয়ে পড়াশোনা করে না। মাংস আপনার, হাড্ডি আমার।”

কথাটি শুনে কিছুক্ষণ নীরব হয়ে গেলাম। একজন মায়ের এই একটি বাক্যের মধ্যে যেমন অসহায়ত্ব আছে, তেমনি আছে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ।

কথাটি আমাকে আমাদের পুরোনো দিনের কথা মনে করিয়ে দিল। তখন অভিভাবকেরা সন্তানকে বিদ্যালয়ে দিয়ে এসে শিক্ষকের হাতে তুলে দিয়ে বলতেন—

“স্যার, সন্তানকে মানুষ করার দায়িত্ব আপনার। ভুল করলে শাসন করবেন।”

শিক্ষকের ওপর ছিল অগাধ আস্থা, আর অভিভাবকের ছিল সন্তানের প্রতি গভীর নজর।

কিন্তু সময় বদলেছে। ব্যস্ততার ভিড়ে অনেক বাবা-মা সন্তানের সঙ্গে কথা বলার সময় পান না। সন্তান কখন বিদ্যালয়ে যাচ্ছে, কখন ফিরছে, কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে—এসবের খোঁজও অনেক সময় নিয়মিত রাখা হয় না।

অথচ সন্তান বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার চারপাশের পৃথিবীও বড় হয়। কৈশোরে এসে বন্ধু, মোবাইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নানা ধরনের প্রভাব তার চিন্তা ও আচরণকে দ্রুত বদলে দিতে পারে।

একটি ভুল বন্ধুত্ব, একটি ভুল সিদ্ধান্ত

কিছু কিশোর-কিশোরী সমবয়সী বন্ধুদের সঙ্গে অতিরিক্ত সময় কাটাতে গিয়ে ধীরে ধীরে পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যায়। কেউ স্কুল ফাঁকি দিয়ে রাস্তায় আড্ডা দেয়, কেউ অকারণে বিভিন্ন জায়গায় ঘোরে, কেউ আবার আবেগের বশে অনুপযুক্ত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে।

বিশেষ করে কন্যাসন্তানের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। কারণ কৈশোরের আবেগ অনেক সময় বাস্তবতার চেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

কখনো কখনো বন্ধুত্বের আড়ালে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যার পরিণতি অত্যন্ত দুঃখজনক হতে পারে। নির্জন জায়গা কিংবা অপরিচিত পরিবেশে গিয়ে একজন কিশোরী নিজের নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।

তখন শুধু সন্তান নয়—পুরো পরিবারকে সেই ভুলের বোঝা বহন করতে হয়।

কোনো কোনো ঘটনায় পরিস্থিতি এতদূর গড়ায় যে পুলিশ পর্যন্ত কিশোর-কিশোরীদের থানায় নিয়ে আসে। অভিভাবককে থানায় যেতে হয়, নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। একপর্যায়ে শিক্ষককেও বলতে হয়—

“ছেলেটি বা মেয়েটি ভালো শিক্ষার্থী, এবার একটি সুযোগ দিন।”

তখন মনে হয়—

সন্তান যখন ভুল পথে হাঁটা শুরু করছিল, তখন আমরা কোথায় ছিলাম?

মা-বাবাই সন্তানের প্রথম আদর্শ

সন্তানকে শুধু উপদেশ দিয়ে ভালো মানুষ বানানো যায় না। সন্তান তার সবচেয়ে বড় শিক্ষা পায় পরিবার থেকে।

মা-বাবার কথাবার্তা, আচরণ, পারস্পরিক সম্মান, সততা ও দায়িত্ববোধ সন্তান খুব কাছ থেকে দেখে। তাই সন্তানের কাছে ভালো হওয়ার শিক্ষা দেওয়ার আগে নিজেদের জীবনেও সেই আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

বিশেষ করে একজন মা তার মেয়ের কাছে সবচেয়ে বড় আদর্শ হতে পারেন। মেয়েটি মায়ের কাছ থেকেই শেখে—কীভাবে নিজেকে সম্মান করতে হয়, কীভাবে ভালো-মন্দ বুঝতে হয়, কীভাবে নিজের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎকে গুরুত্ব দিতে হয়।

তাই মায়েদের প্রতি অনুরোধ—আপনার মেয়ে আপনাকে দেখছে। আপনার আচরণ তার ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করছে।

তবে সন্তানের চরিত্র গঠনের দায়িত্ব শুধু মায়ের নয়। বাবার ভূমিকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একজন সৎ, দায়িত্বশীল ও চরিত্রবান বাবা সন্তানের সামনে জীবন্ত আদর্শ হয়ে উঠতে পারেন।

অভিভাবকের অবহেলা যেন সন্তানের শাস্তি না হয়

কিছু অভিভাবক মনে করেন—সন্তানকে প্রয়োজনীয় টাকা-পয়সা, পোশাক, মোবাইল ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দিলেই দায়িত্ব শেষ।

না, সন্তানের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সময়, ভালোবাসা, সঠিক দিকনির্দেশনা ও নজরদারি।

সন্তান কোথায় যাচ্ছে?

কার সঙ্গে যাচ্ছে?

কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে?

বিদ্যালয়ে নিয়মিত যাচ্ছে কি না?

কেন হঠাৎ পড়াশোনায় মন বসছে না?

কেন তার আচরণ বদলে যাচ্ছে?

এসব প্রশ্ন করার অধিকার যেমন বাবা-মায়ের আছে, তেমনি এটি তাদের দায়িত্বও।

বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের অন্যের বাড়িতে রাত কাটানোর বিষয়ে অভিভাবকদের সতর্ক থাকা উচিত। ভালোবাসার কারণে সন্তানকে স্বাধীনতা দেওয়া যায়, কিন্তু নিরাপত্তার বিষয়টি কখনোই উপেক্ষা করা যায় না।

মোবাইলের পর্দায় হারিয়ে যাচ্ছে শৈশব

আজ অনেক শিক্ষার্থীর হাতে বইয়ের চেয়ে মোবাইল বেশি সময় থাকে। গল্পের বই, উপন্যাস বা জ্ঞানমূলক বই পড়ার পরিবর্তে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভিডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অকারণ হাসি-তামাশা ও নাচানাচিতে সময় কেটে যায়।

বিনোদন খারাপ নয়। কিন্তু যখন বিনোদন পড়াশোনা, শৃঙ্খলা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে গ্রাস করে, তখন অভিভাবকদের সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে।

মোবাইল কেড়ে নেওয়া নয়—মোবাইলের সঠিক ব্যবহার শেখানোই প্রয়োজন।

শিক্ষককে শত্রু নয়, অভিভাবকের সহযোগী ভাবুন

একজন শিক্ষক শুধু পাঠ্যবই পড়ান না; শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবেন। কোনো শিক্ষার্থীর আচরণে পরিবর্তন দেখা দিলে শিক্ষককে তার কারণ জানার চেষ্টা করতে হয়।

কিন্তু শিক্ষক একা পারবেন না। বাড়ি ও বিদ্যালয়কে পাশাপাশি কাজ করতে হবে।

একসময় অভিভাবকেরা বলতেন—

“স্যার, সন্তানকে আপনার কাছে দিলাম, মানুষ করে দেবেন।”

আজও সেই বিশ্বাস প্রয়োজন। তবে সন্তান মানুষ করার দায়িত্ব শুধু শিক্ষকের নয়—বাবা-মা, শিক্ষক ও সমাজ—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।

ঘটনা ঘটার পর থানায় দৌড়ানোর চেয়ে ঘটনা ঘটার আগেই সন্তানের পাশে দাঁড়ানো অনেক ভালো। ভুল করার পর শিক্ষকের কাছে সুপারিশ করার চেয়ে ভুল করার আগেই সন্তানকে সঠিক পথ দেখানো অনেক বড় দায়িত্ব।

কাউকে আঘাত করা নয়, সচেতন করাই উদ্দেশ্য

এই লেখায় কোনো নির্দিষ্ট পরিবারকে অভিযুক্ত করা আমার উদ্দেশ্য নয়। কারও নাম, পরিচয় বা ব্যক্তিগত ঘটনা প্রকাশ করতেও চাই না। কারণ একটি পরিবারের ব্যক্তিগত বিষয় প্রকাশ করলে কেউ কষ্ট পেতে পারেন।

একজন শিক্ষক হিসেবে প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা থেকে শুধু একটি কথাই বলতে চাই—

সন্তানকে হারানোর পর আফসোস করার চেয়ে, হারানোর আগেই তার হাত শক্ত করে ধরে রাখুন।

তার সঙ্গে কথা বলুন।

তার বন্ধুদের চিনুন।

তার কথা শুনুন।

তার বিদ্যালয়ের খোঁজ নিন।

তার মোবাইল ব্যবহারে নজর রাখুন।

ভুল করলে অপমান নয়, সংশোধনের সুযোগ দিন।

সন্তান যেন মনে না করে—“আমার বাবা-মা আমাকে বোঝেন না।”

সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক


শেয়ার করতে ক্লিক করুন:

Explore More Districts