১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তৎকালীন চিফ হুইপ আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমার মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় পার্বত্য চুক্তি। চুক্তির আওতায় ১৯৯৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে অস্ত্র জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে শান্তি বাহিনীর সদস্যরা।
তবে চুক্তির ২৭ বছর পার হলেও এখনো পাহাড়ি অঞ্চলে সম্পূর্ণ শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং নতুন নতুন আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনের আবির্ভাবে সংঘাত ও সহিংসতা বেড়েছে। পাহাড়ের ৬টি সশস্ত্র সংগঠন—জেএসএস (সন্তু), জেএসএস (এমএন লারমা), ইউপিডিএফ (প্রসীত), ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক), মগ লিবারেশন পার্টি (এমএলপি), এবং কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)—এর মধ্যে আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজি নিয়ে সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে।
চুক্তির পর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন সহস্রাধিক মানুষ, গুম হয়েছেন প্রায় ১,৫০০ জন। গত তিন মাসে শুধু খাগড়াছড়ি জেলায় আধিপত্যের লড়াইয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৬ জন।
চুক্তির বেশ কিছু ধারা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) এবং অন্যান্য পাহাড়ি সংগঠন চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের দাবি জানালেও বাঙালি সংগঠনগুলো দাবি করছে সাংঘর্ষিক ধারাগুলো বাতিলের।
জনসংহতি সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সুর্দশন চাকমা বলেছেন, “চুক্তির ২৭ বছরেও বহু ধারা বাস্তবায়ন হয়নি। তবে নতুন সরকারের কাছে আমরা আশা করি, শান্তি ফিরে আসবে।”
পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মজিদ বলেছেন, “চুক্তি পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করেছে। এ বৈষম্যমূলক চুক্তি বাতিল করে সমাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।”
পাহাড়ের সংঘাতের মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে চাঁদাবাজি, অস্ত্রের আধিপত্য এবং ভূমি বিরোধ। সশস্ত্র সংগঠনগুলোর হাতে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে, যা প্রতিবেশী দেশ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মো. সহিদুজ্জামান বলেন, “সন্ত্রাস দমনে নিরাপত্তা বাহিনী সর্বদা সক্রিয়। শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
চুক্তির পর পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং অবকাঠামো খাতে উন্নয়ন হয়েছে। দুর্গম অঞ্চলে সীমান্ত সড়ক নির্মাণসহ নানা প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। কিন্তু সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও সংঘাতের কারণে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
পাহাড়ি-বাঙালি উভয়ের মধ্যেই রয়েছে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা। তবে তা অর্জনে প্রয়োজন সব পক্ষের সমঝোতা, চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন, চাঁদাবাজি বন্ধ, এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ।
এমভি/সিটিজিনিউজ


