রঙে-কারুকাজে মুগ্ধতার স্থাপত্য – দৈনিক আজাদী

রঙে-কারুকাজে মুগ্ধতার স্থাপত্য – দৈনিক আজাদী

চট্টগ্রাম নগরের ব্যস্ততম সড়ক। যানবাহনের ছোটাছুটি, মানুষের কোলাহলসবকিছুর মাঝেও হঠাৎ চোখ আটকে যায় এক দৃষ্টিনন্দন স্থাপনার দিকে। চকবাজারের নবাব সিরাজউদদৌলা সড়কের পশ্চিম পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই স্থাপনাটি যেন কালের সাক্ষী। বহু দূর থেকেই চোখে পড়ে রঙিন গম্বুজ আর সুউচ্চ মিনার। এটি চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী চন্দনপুরা মসজিদ, যা স্থানীয়দের কাছে চন্দনপুরা বড় মসজিদ বা তাজ মসজিদ নামেও পরিচিত। প্রায় দেড় শতাব্দীর ইতিহাস বুকে ধারণ করা এই মসজিদ শুধু ধর্মীয় উপাসনালয়ই নয়এটি চট্টগ্রামের স্থাপত্য ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন। এর কারুকাজ, রঙের ব্যবহার এবং স্থাপত্যশৈলী প্রতিদিনই দর্শনার্থী ও মুসল্লিদের মুগ্ধ করে।

চন্দনপুরা তাজ মসজিদের চারদিকে যেন রঙের উৎসব। স্থাপনার প্রতিটি অংশে ব্যবহার করা হয়েছে সবুজ, নীল, হলুদ, সাদা, গোলাপিবিভিন্ন উজ্জ্বল রঙ। লতাপাতার নকশা, ফুলের অলংকরণ এবং সূক্ষ্ম কারুকাজ মসজিদের দেয়াল, সিঁড়ি ও মিনারে ফুটিয়ে তুলেছে অসাধারণ নান্দনিকতা।

দূর থেকেই দেখা যায় এর বহু গম্বুজ ও মিনার। সূর্যের আলো পড়লে মসজিদের রঙিন কারুকাজ যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। মসজিদের চারপাশের দেয়ালগুলো এমনভাবে নির্মিত যে ভেন্টিলেশন সিস্টেমের মাধ্যমে দেয়ালের ফাঁক গলে ভেতরে প্রবেশ করে আলো ও বাতাস। ফলে মসজিদের ভেতরটা সারাদিনই থাকে আলোকোজ্জ্বল ও প্রশান্তিময় পরিবেশে ভরা। স্থাপত্য বিশ্লেষকদের মতে, এই মসজিদে মুঘল স্থাপত্যের অনুপ্রেরণা স্পষ্টভাবে দেখা যায়বিশেষ করে বহু গম্বুজ, মিনার এবং অলংকরণে। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামে মুঘল শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই এখানে মসজিদ নির্মাণের ঐতিহ্য গড়ে ওঠে। তবে চন্দনপুরা তাজ মসজিদের বর্তমান কাঠামোর ভিত্তি স্থাপন করা হয় উনিশ শতকের শেষভাগে।

ইতিহাস অনুযায়ী, ১৬৬৬ সালে শায়েস্তা খানের নেতৃত্বে মুঘল বাহিনী আরাকানদের কাছ থেকে চট্টগ্রাম দখল করে এবং এখানে মুঘল শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর শাহি ফরমানের মাধ্যমে এলাকায় বেশ কিছু মসজিদ নির্মাণ করা হয়যার মধ্যে হামজা খানের মসজিদ, আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ ও অলি খাঁ জামে মসজিদ উল্লেখযোগ্য। যদিও এই সময়েই স্থাপত্যশিল্পের ভিত্তি গড়ে ওঠে, তবে চন্দনপুরা তাজ মসজিদের প্রথম সংস্কার করা হয় ব্রিটিশ আমলে মাস্টার হাজি আব্দুল হামিদের উদ্যোগে।

১৮৭০ সালে স্থানীয় সমাজসেবক ও ঠিকাদার আব্দুল হামিদ মাস্টার মাটি ও চুনসুরকির দেয়াল এবং টিনের ছাদ দিয়ে এই মসজিদ নির্মাণ করেন। শুরুতে এর নাম ছিল ‘হামিদিয়া তাজ মসজিদ’। নির্মাণকাজে লখনউ ও বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) থেকে কারিগর ও স্থপতি আনা হয়েছিল বলে ইতিহাসবিদদের ধারণা।

সময়ের পরিক্রমায় মসজিদটির আরও বিস্তৃতি ঘটে। ১৯৪৬ সালে আব্দুল হামিদের বংশধর ও ব্রিটিশ সরকারের ঠিকাদার আবু সৈয়দ দোভাষ এর সংস্কারকাজ শুরু করেন। কলকাতা, দিল্লিসহ বিভিন্ন স্থান থেকে নির্মাণসামগ্রী ও কারিগর এনে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ব্যয়ে মসজিদটি নতুন রূপ দেওয়া হয়।

ব্রিটিশ আমলের শেষ ভাগে শুরু হওয়া এই সংস্কারকাজ শেষ হয় পাকিস্তান আমলের শুরুর দিকে, প্রায় ১৯৫০৫২ সালের মধ্যে। অন্যদিকে আবু সৈয়দ দোভাষ একই নকশার অনুসরণে নগরীর কোতোয়ালী মোড় এলাকায় তাঁর শ্বশুরবাড়িতেও আরেকটি মসজিদ নির্মাণ করেন। তবে আকারের দিক থেকে সেটি এই মসজিদের তুলনায় কিছুটা ছোট ছিল।

চন্দনপুরা তাজ মসজিদের অন্যতম আকর্ষণ এর গম্বুজসমূহ। মসজিদে ছোটবড় মিলিয়ে প্রায় ১৫টি গম্বুজ রয়েছে বলে স্থানীয়দের ধারণা। এর মধ্যে কেন্দ্রে একটি বড় গম্বুজ রয়েছে, যা নির্মাণে প্রায় ১৩ মণ রুপা ও পিতলের ব্যবহার হয়েছিল বলে প্রচলিত আছে। প্রতিটি গম্বুজে ওঠার জন্য রয়েছে আলাদা সিঁড়ি। গম্বুজ ও সিঁড়ির গায়ে মুঘল স্থাপত্যের নান্দনিক নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। গম্বুজের চারপাশে লেখা রয়েছে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ সাহাবির নাম। মসজিদের দুই পাশে রয়েছে সুউচ্চ মিনার। অতীতে মাইক ব্যবহারের প্রচলন না থাকায় মুয়াজ্জিনরা এসব মিনারে উঠে আজান দিতেন। এই মিনারগুলো প্রায় সাততলা সমান উঁচু বলে স্থানীয়দের ধারণা।

বর্তমানে এই মসজিদে নিয়মিত নামাজ আদায় করেন বিপুল সংখ্যক মুসল্লি। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮০০ থেকে ৯০০ জন মানুষ এখানে নামাজ পড়েন। আর শুক্রবার জুমার দিনে মুসল্লির সংখ্যা পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে যায়। তখন মসজিদের ভেতরে জায়গা না হলে আশপাশের সড়কেও জামাত অনুষ্ঠিত হয়। মসজিদটিতে রয়েছে দুর্লভ ইসলামি নিদর্শনাবলির সমৃদ্ধ সংগ্রহশালা; যা দেখার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্থ থেকে পর্যটকরা এখানে আসেন।

গতকাল মঙ্গলবার যোহরের নামাজ আদায় করতে এসে অনেক মুসল্লিই মসজিদের সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য নিয়ে গর্বের কথা জানান। চকবাজার এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আবদুল কাদের বলেন, আমি ছোটবেলা থেকেই এই মসজিদে নামাজ পড়ছি। প্রতিবার এখানে এলে মনে হয় যেন ইতিহাসের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছি। মসজিদের কারুকাজ আর রঙিন গম্বুজগুলো সত্যিই চোখ জুড়িয়ে দেয়।

আরেক মুসল্লি ব্যবসায়ী মো. জসিম উদ্দিন জানান, চট্টগ্রামে অনেক নতুন মসজিদ হয়েছে, কিন্তু চন্দনপুরা তাজ মসজিদের সৌন্দর্য আলাদা। এখানে নামাজ পড়লে মনটা খুব প্রশান্ত হয়। দূর থেকেও অনেক মানুষ শুধু মসজিদটা দেখার জন্য আসে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী তানভীর হাসান বলেন, আমি আগে ছবিতে এই মসজিদ দেখেছি। পরে একদিন প্রথমবার বন্ধুদের সঙ্গে এসে নামাজ পড়ি। ভেতরের আলোবাতাসের ব্যবস্থা আর নকশাগুলো সত্যিই অসাধারণ। স্থানীয় আরেক মুসল্লি আবু তাহের বলেন, এটা শুধু একটি মসজিদ নয়, চট্টগ্রামের ঐতিহ্যের অংশ। আমরা চাই এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি যেন ঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এর সৌন্দর্য দেখতে পারে।

মসজিদটি শুধু ধর্মীয় স্থানই নয়চট্টগ্রামের একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রও বটে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়াও বিদেশি পর্যটকেরাও এখানে আসেন এর রঙিন স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব দেখতে। চট্টগ্রামের পর্যটন শিল্পের পরিচিতি তুলে ধরতে দেশবিদেশের বিভিন্ন প্রকাশনায় এই মসজিদের ছবি ব্যবহার করা হয়।

দেড় শতাব্দীর পুরোনো এই স্থাপনাটি সময়ের সঙ্গে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। নগরের দ্রুত নগরায়ন, যানবাহনের কম্পন এবং পরিবেশ দূষণ মসজিদের স্থায়িত্বের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে স্থপতিরা মনে করেন। তাই ঐতিহ্যবাহী এই স্থাপনাটি সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

মসজিদের মোতোয়াল্লী মোহাম্মদ জহিরুল হক বলেন, দূরদূরান্ত থেকে অসংখ্য মুসল্লি এই মসজিদে নামাজ আদায়ের জন্য সমবেত হন। কিন্তু মসজিদের সীমিত পরিসরের কারণে সকল মুসল্লির জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। বিশেষ করে জুমার নামাজের সময় অতিরিক্ত মুসল্লির চাপ সামাল দিতে সিরাজউদ্দৌলা রোডের একটি অংশ সাময়িকভাবে বন্ধ রেখে নামাজের ব্যবস্থা করতে হয়। এছাড়া পাঁচ ওয়াক্ত নামাজেও মসজিদটি মুসল্লিতে পরিপূর্ণ থাকে। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে তাদের পরিবারই ঐতিহ্যবাহী এই মসজিদের দেখভাল ও পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে আসছে। মসজিদের উন্নয়ন ও সংস্কার কার্যক্রমে কেউ সহযোগিতা করলে তা আন্তরিকভাবে গ্রহণ করা হয়। একই সঙ্গে তিনি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, মসজিদের ঐতিহ্য সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ এবং সরকারি অনুদান প্রদান করা হলে এই ঐতিহ্য ধরে রাখা আরও সহজ হবে।

শতাব্দী পেরিয়েও চন্দনপুরা তাজ মসজিদ চট্টগ্রামের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল প্রতীক হয়ে আছে। রঙিন কারুকাজে সাজানো এই মসজিদ যেন অতীত ও বর্তমানের এক সেতুবন্ধনযেখানে ইতিহাস, শিল্প ও আধ্যাত্মিকতার মিলন ঘটেছে এক অনন্য স্থাপত্যে।

Explore More Districts