
তেহরান, ১৭ জুন – ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, চতুর্মুখী নিষেধাজ্ঞা আর সাম্প্রতিক বিধ্বংসী যুদ্ধ—কোনো কিছুই দমাতে পারছে না ইরানের মহাকাশ জয়ী স্বপ্নকে। সমস্ত যুদ্ধকালীন ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে এক অভূতপূর্ব গতিতে এগিয়ে চলেছে দেশটির মহাকাশ কর্মসূচি। এর ধারাবাহিকতায় খুব শিগগির কক্ষপথে শক্তিশালী ‘পার্স-২’ (Pars-2) স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করতে যাচ্ছে ইরান। শুধু তাই নয়, চলতি ২০২৬ বছরের শেষ নাগাদ মহাকাশে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে ‘শহীদ সোলেইমানি’ স্যাটেলাইট মোতায়েনের মেগা পরিকল্পনাও চূড়ান্ত করেছে তেহরান।
আজ বুধবার দেশটির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রী সাত্তার হাসেমি আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা দিয়েছেন বলে ইরানের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভি এক প্রতিবেদনে নিশ্চিত করেছে।
ইরানের মহাকাশ গবেষণা ইনস্টিটিউটের শীর্ষ বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের সাথে এক হাই-প্রোফাইল বৈঠকে এই বড় ঘোষণা দেন তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী সাত্তার হাসেমি। বৈঠকে ইরানি মহাকাশ সংস্থার (আইএসএ) প্রধান হাসান সালারিয়েহ-ও উপস্থিত ছিলেন।
আমেরিকা এবং ইসরায়েলের সাথে সাম্প্রতিক ভয়াবহ সামরিক সংঘাতের পর কীভাবে ইরানের মহাকাশ খাত এত দ্রুত ঘুরে দাঁড়াল, সেই রহস্য উন্মোচন করেছেন মহাকাশ সংস্থার প্রধান হাসান সালারিয়েহ। তিনি জানান, শত্রুপক্ষের ব্যাপক হামলা সত্ত্বেও ইরানের মহাকাশ প্রকল্পগুলো রকেট গতিতে এগিয়ে চলছে। এর মূল কারণ হলো—ইরানের মহাকাশ অবকাঠামো সম্পূর্ণ বিকেন্দ্রীভূত (Decentralized)। ফলে শত্রুরা কোনো একক স্থাপনায় বড় আঘাত করলেও পুরো ব্যবস্থাটিকে অচল করা অসম্ভব। আর এই কৌশলের কারণেই যুদ্ধ চলাকালীন সময়েও ইরানের স্যাটেলাইট যোগাযোগ, তথ্য গ্রহণ এবং মহাকাশ থেকে চিত্র সংগ্রহের মতো অতি সংবেদনশীল সেবাগুলো এক মুহূর্তের জন্যও বন্ধ হয়নি।
ইরানি মহাকাশ সংস্থার নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি এই স্যাটেলাইটগুলো কেবল প্রতিরক্ষা নয়, দেশটির অভ্যন্তরীণ উন্নয়নে আমূল পরিবর্তন আনবে। প্রযুক্তি মন্ত্রী সাত্তার হাসেমির মতে, মহাকাশ প্রযুক্তিকে ইরান সম্পূর্ণ ‘কৌশলগত’ হাতিয়ার হিসেবে দেখছে।
পার্স-২ (Pars-2): এটি অত্যন্ত উন্নত এবং উচ্চ-নির্ভুলতাসম্পন্ন একটি পৃথিবী পর্যবেক্ষণ ও দূর অনুধাবন (রিমোট সেন্সিং) স্যাটেলাইট। এর মূল কাজ হবে পরিবেশের নিখুঁত ডেটা সংগ্রহ, স্মার্ট কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন, পানি সম্পদ ও ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং তথ্যভিত্তিক সুশাসন নিশ্চিত করা।
শহীদ সোলেইমানি নক্ষত্রমণ্ডল (Shahid Soleimani Constellation): বছরের শেষ নাগাদ এই স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হবে। এটি মূলত একটি নক্ষত্রমণ্ডল বা স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক প্রকল্প।
“যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক বিধ্বংসী সংঘাতের পর আমাদের মহাকাশ খাতকে দ্রুত পুনর্গঠন করা এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিগত সহযোগিতা জোরদার করা এখন আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার।”
— সাত্তার হাসেমি (তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রী, ইরান)
ইরানি মহাকাশ সংস্থার প্রধান হাসান সালারিয়েহ স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, জেনারেল কাসেম সোলেইমানির নামে উৎসর্গীকৃত ‘শহীদ সোলেইমানি’ মেগা প্রজেক্টটি নিখুঁত পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে চলছে। ইরানি বর্ষপঞ্জির ১৪০Useful ৫ সালের মধ্যেই (যা ২০ মার্চ ২০২৭ এর মধ্যে শেষ হবে) এই সম্পূর্ণ স্যাটেলাইট নক্ষত্রমণ্ডল তৈরির কাজ শেষ হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের চরম যুদ্ধকালীন অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যেও ইরানের এই মহাকাশ অভিযান বিশ্বের বড় বড় পরাশক্তিগুলোকে রীতিমতো চমকে দিয়েছে। সামরিক বোদ্ধাদের মতে, মার্কিন-ইসরায়েলি জোটকে টেক্কা দিয়ে ইরানের এই মহাকাশ কূটনীতি আগামী দিনে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে।
এনএন/ ১৭ জুন ২০২৬




