মৌলভীবাজারে জামায়াত পাস করা ওয়ার্ডের ফ্যামিলি কার্ড বাদ!

মৌলভীবাজারে জামায়াত পাস করা ওয়ার্ডের ফ্যামিলি কার্ড বাদ!

মৌলভীবাজারে জামায়াত পাস করা ওয়ার্ডের ফ্যামিলি কার্ড বাদ!

মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁও ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের সাধারণ মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত দ্বিতীয় ধাপের সরকারি ফ্যামিলি কার্ড হুট করে বাদ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। ফ্যামিলি কার্ড পাওয়ার আশায় টানা কয়েকদিন দৌড়াদৌড়ি করে কাগজপত্র যোগাড়, নতুন সিম কেনা এবং বিকাশ অ্যাকাউন্ট খোলার পর শেষ মুহূর্তে কার্ড বাদ দিয়ে অন্য ইউনিয়নের ওয়ার্ডে নেয়ায় চরম ক্ষোভ ও হতাশায় ভুগছেন ওই ওয়ার্ডের শত শত নিম্নবিত্ত মানুষ। ভুক্তভোগীদের দাবি—সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে এই ওয়ার্ডে জামায়াত সমর্থিত এমপি প্রার্থী পাস করায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে পুরো ওয়ার্ডের কার্ড বাদ দিয়ে টেংরা ইউনিয়নে নেয়া হয়েছে। এই বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) স্থানীয় এমপির ইচ্ছার কথা জানান।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় (ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি, বাংলাদেশ সচিবালয়) থেকে গত ১৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে (স্মারক নম্বর-৪১.০০.০০০০.০০০.০২৩.১৮.০০০১.২৬.২৫০) একটি অফিশিয়াল প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। উপসচিব মোঃ সাইফুল হক স্বাক্ষরিত উক্ত চিঠিতে ‘এপ্রিল-মে, ২০২৬’ সময়ে ২য় ধাপের ফ্যামিলি কার্ড সম্প্রসারণ কার্যক্রমের আওতায় নির্বাচিত ২৩টি ইউনিটে তথ্য সংগ্রহ, যাচাই-বাছাই, উপকারভোগী চূড়ান্তকরণ ও সফটওয়্যারে ডেটা এন্ট্রির জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

​উক্ত প্রজ্ঞাপনের সংযুক্ত নির্বাচিত এলাকার তালিকার ৯ নম্বর ক্রমিকে সিলেট বিভাগের অধীনে ‘মৌলভীবাজার জেলা, রাজনগর উপজেলা, পাঁচগাঁও ইউনিয়ন, ওয়ার্ড নং: ৫’ সুনির্দিষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই ৫ নং ওয়ার্ডকে তালিকায় রাখার পেছনে সুনির্দিষ্ট ‘নির্বাচনের যৌক্তিকতা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল—”জেলে সম্প্রদায়ের বসবাস; সুবিধাবঞ্চিত শ্রমিক পরিবার বেশি।”

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সরকারের পক্ষ থেকে হাওর বেষ্টিত এলাকা পাঁচগাঁও ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের দরিদ্র মানুষের তালিকা করে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই ঘোষণা শুনে দু-তিন দিন ধরে হাড়ভাঙা খাটুনি ও দৌড়াদৌড়ি করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করে জমা দেন স্থানীয় বাসিন্দারা। নিয়ম অনুযায়ী যাদের সিম কার্ড বা মোবাইল ব্যাংকিং ছিল না, তারা ধারদেনা করে নতুন সিম কেনেন এবং বিকাশ অ্যাকাউন্ট খোলেন বলে জানিয়েছেন। কিন্তু সব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর হুট করে জানা যায়, ৫ নং ওয়ার্ডকে বাদ দিয়ে দ্বিতীয় ধাপের ফ্যামিলি কার্ড নেয়া হয়েছে টেংরা ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ডে।

​৫নং ওয়ার্ডের নির্বাচনী ফলাফল ও রাজনৈতিক গুঞ্জন:

নির্বাচনী ফলাফল সূত্রে জানা যায়, ৫ নং ওয়ার্ডের অন্তর্গত ‘রক্তা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ (গ্রাম: রক্তা, পো: পাঁচগাঁও) ভোটকেন্দ্রে সদ্য সমাপ্ত সংসদ নির্বাচনে জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী মোঃ আব্দুল মান্নান (দাঁড়িপাল্লা প্রতীক) সর্বোচ্চ ৮৪২ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। অন্যদিকে বিএনপির নাসের রহমান (ধানের শীষ প্রতীক) পান ৭০১ ভোট, আহমদ বিলাল (দেওয়াল ঘড়ি প্রতীক) পান ৮১ ভোট এবং জহর লাল দত্ত (কাস্তে প্রতীক) পান ২ ভোট।

পাঁচগাও ইউনিয়নের ​৫ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা অঞ্জনা বেগম করে বলেন, “দিনের ভিতরে কাগজপত্র জমা দেয়ার কথা বলা হয়েছিল। আমি আমার ছোট ৫ মাসের বাচ্চাকে নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করে টাকা খরচ করে সবকিছু জমা দিয়েছি একদিনের ভিতরে। এখন শুনি আমরা বাদ।”

সাহিদ আলী বলেন, “আমরা বিএনপি করি, ৩০ বছর আগে থেকে বিএনপির সাথে ছিলাম। নাসের রহমান সাহেবের ওয়াইফ এসেছেন, আমার পকেট থেকে ১১ হাজার টাকা দিয়েছি প্রোগ্রামের জন্য। ফ্যামিলি কার্ডের জন্য সীমা এসেছে, বিকাশ খোলার কথা বলছে, কাগজপত্র জমা দেয়ার কথা বলছে, পরে শুনি আমাদের ফ্যামিলি কার্ড দেয়া হবে না।”

​এই ওয়ার্ডের বাসিন্দা হরেন্ড নমশুধ্র বলেন, ” ফ্যামিলি কার্ডের জন্য এসেছে, আমরা সবকিছু দিয়েছি। বিএনপি ভোটও দিয়েছি কিন্তু আমরা বাদ। কেন বাদ সেটা তো আমরা জানতাম চাই।”

অবলা রাণী বলেন, ” ফ্যামিলি কার্ডের জন্য কাগজপত্র জমা দিয়েছি, টাকা পয়সাও খরচ হয়েছে আমাদের। আমরা কোন কারণে বাদ তা আমাদের জানা দরকার।”

সুকন্দা বিশ্বাস বলেন, ” সরকারি মানুষ যে আসলো, আমাদের কাগজপত্র নিল, আমাদের যেহেতু দিবেই না তাহলে আমাদের তো হয়রানি না করলেও পারতো। টাকা পয়সা খরচ হয়েছে আমাদের। আমরা পেট ভোখা মানুষ। “

এছাড়াও বিষয়টি নিয়ে এলাকায় তীব্র রাজনৈতিক গুঞ্জন ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় বিএনপির ভোটার ও ৫নং ওয়ার্ডের ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করে বলছেন, এই ওয়ার্ডে জামায়াত সমর্থিত এমপি প্রার্থী বিজয়ী হওয়ায় স্থানীয় সংসদ সদস্য রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে পুরো ওয়ার্ডের দরিদ্র মানুষের এই সরকারি সুবিধা বন্ধ করে দিয়েছেন।

৫নং ওয়ার্ডের ফ্যামিলি কার্ড বাতিলের বিষয়টি নিশ্চিত করে পাঁচগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জুবেল আহমদ বলেন, “সরকারের নির্দেশে পুরো ৫ নং ওয়ার্ডের মানুষের তথ্য সংগ্রহ করে তালিকা প্রস্তুত করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে আমরা জেনেছি উপরের নির্দেশে এই ওয়ার্ডের ফ্যামিলি কার্ড বাতিল করে টেংরা ইউনিয়নে দেয়া হয়েছে। উপরের নির্দেশ বলেছেন ইউএনও। বাদ দেয়ার কারণে আমাদের মন খারাপ।”

​পুরো একটি ওয়ার্ডের সরকারি সুবিধা এভাবে হুট করে বাদ দেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিপুল সিকদার বলেন, “ওখানের ডাটা কালেক্ট করা হয়েছে, যখন এমপি মহোদয় চাইবেন, তখন দেয়া হবে। এখন পাঁচগাও থেকে টেংরায় নেয়া হয়েছে এমপি মহোদয়-এর ইচ্ছা এটা। এমপি মহোদয় চাচ্ছেন যে এটা এখানে (টেংরা ইউনিয়নে) উদ্বোধন হবে। আমরা জানতাম না টেংরা-তে দেয়া হবে। “

তবে পাঁচগাঁও ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের ‘বাতিল’ করার কথা নাকচ করে ইউএনও বলেন, “বাতিল বা পরিবর্তন হয় নাই। ধাপে ধাপে পরে দেওয়া হবে যদি সরকার চায়।”

এদিকে এই বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য এম. নাসের রহমান-এর সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

ডিএস/এফআর/এসএ

Explore More Districts