মানবতার এক নিঃশব্দ পাঠ : দক্ষিণ কোরিয়ার মানুষ – Habiganj News

মানবতার এক নিঃশব্দ পাঠ : দক্ষিণ কোরিয়ার মানুষ – Habiganj News

শাহ হারুন রশিদ: কিছু দেশ থাকে মানচিত্রে, আর কিছু দেশ থেকে যায় মানুষের বুকের ভেতর।

দক্ষিণ কোরিয়া আমার কাছে ঠিক তেমনই এক দেশ—যেখানে আমি শুধু কাজ করতে যাইনি, বরং মানবতা কী, ভালোবাসা কাকে বলে, তা নতুন করে শিখে এসেছি।

হংকং থেকে যখন আমাকে দক্ষিণ কোরিয়ায় বদলি করা হয়, তখন আমি স্যামসাং কোম্পানিতে কর্মরত। হংকংয়ের ব্যস্ত জীবন, উঁচু দালান, কংক্রিটের শহর—এসবের সঙ্গে আমি অভ্যস্ত ছিলাম। তার আগেও বহু দেশ ভ্রমণ করেছি, বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে কাজ করেছি। তাই মনে হয়েছিল, কোরিয়াও বুঝি তেমনই আরেকটি আধুনিক দেশ—শুধু নাম আলাদা, মুখ আলাদা।

কিন্তু আমি ভুল ছিলাম।

সময়টা ছিল অক্টোবর। প্রকৃতি তখন শান্ত, নির্মল, কোমল। ক্যাথে প্যাসিফিকের বিমান যখন কিম্পো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়েতে ছোঁয়, তখন বুঝতে পারিনি—এই মাটিতে নামার সঙ্গে সঙ্গে আমার ভেতরের মানুষটাও বদলে যেতে শুরু করেছে।

ইমিগ্রেশন কাউন্টারে দাঁড়িয়ে আমি প্রথম ধাক্কাটা খেলাম মানুষের ব্যবহার দেখে। অফিসাররা মার্জিত, ধীর, গভীর ভদ্রতায় কথা বলছিল। তারা ইংরেজি জানে, তবু নিজেদের ভাষাকে আগলে রাখে—কারণ এই জাতির শিরায় শিরায় বইছে দেশের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা। একজন অফিসার মুচকি হেসে বলেছিল,

“কোরিয়ায় থাকলে কিমচি বেশি করে খাবেন—এটাই আমাদের আত্মা।”

সেই কথার ভেতরেই যেন লুকিয়ে ছিল একটি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি আর আত্মসম্মান।

বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে যখন প্রথম কোরিয়ার আলো–হাওয়ার মুখোমুখি হলাম, তখন আমার চোখ বিশ্বাস করতে চাইছিল না। চারদিকে পাহাড়, পাহাড়ের গায়ে গায়ে সবুজ, রাস্তার দু’পাশে ফুলের সারি, আবার কোথাও কোথাও পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলেছে প্রশস্ত পথ। উন্নয়ন এখানে প্রকৃতিকে ধ্বংস করেনি—বরং প্রকৃতিকে সঙ্গে নিয়েই এগিয়েছে।

আমি অনেক দেশ দেখেছি, অনেক শহর ঘুরেছি। কিন্তু এমন পরিমিত, পরিশীলিত সৌন্দর্য খুব কম জায়গায় দেখেছি।

আমার কর্মস্থল ছিল কিম্পো সিটির কাছেই—পাহাড়ঘেরা এক নিস্তব্ধ এলাকায়। আশপাশে কোনো কোলাহল নেই, নেই শহরের ভিড়। শুধু পাহাড়ের ছায়া, দূরে নদীর ডাক, আর মাঝে মাঝে সমুদ্রের নোনা বাতাস। পাহাড়, নদী আর সমুদ্র—এই তিনটি জিনিসই আমার চিরদিনের ভালোবাসা। কোরিয়া যেন এই তিনটি ভালোবাসাকে এক জায়গায় এনে আমাকে উপহার দিয়েছিল।

আমার সঙ্গে আরও দুইজন বাংলাদেশি সহকর্মী ছিল। আমরা একই ডরমিটরিতে থাকতাম। ভিনদেশের মাটিতে পরিচিত মুখ পাওয়াটা যে কতটা স্বস্তির, তা প্রবাসীরাই ভালো বোঝে।

আমি যে বসের অধীনে কাজ করতাম, তার নাম ছিল কিম হার্ক সু। মাথায় চুল কম, মুখে সবসময় হাসি। তিনি কোরিয়ান ভাষা ছাড়া কিছুই জানতেন না, অথচ ভাষার দেয়াল কখনো আমাদের আলাদা করতে পারেনি। কথায় কথায় আমাকে ‘সেইক্ষা’—মানে ছোট বাচ্চা—বলে ডাকতেন। কাজের ফাঁকে হাস্যরস, চোখে-মুখে একধরনের পিতৃসুলভ স্নেহ। তিনি আমার কাছে কখনোই শুধু একজন বস ছিলেন না—ছিলেন অভিভাবকের মতো।

কিন্তু কোরিয়াকে আমার হৃদয়ে স্থায়ী করে দিয়েছে একটি ঘটনা।

আমাদের সঙ্গে থাকা এক বাংলাদেশি সহকর্মী হঠাৎ প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়ল। গায়ে জ্বর, শরীরজুড়ে ফুসকুড়ি। সে টানা কয়েকদিন কাজে যেতে পারল না। আমরা ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম—ভিনদেশ, ভাষা জানি না, চিকিৎসার ব্যবস্থা কীভাবে হবে?

একদিন হঠাৎ করে আমাদের ডরমিটরিতে এসে হাজির হলেন সেই বসের স্ত্রী।

তিনি কোনো প্রশ্ন করলেন না, কোনো অভিযোগও না। অসুস্থ ছেলেটিকে দেখে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, নিজের হাতে পানি ঢেলে দিলেন। চোখের কোণে জমে উঠেছিল জল। সেই দৃশ্য দেখে আমি পাথরের মতো দাঁড়িয়ে ছিলাম।

আমি ভাবছিলাম—এই কি মালিক? এই কি কর্তৃত্ব?

না, এ ছিল নিখাদ মানবতা।

তিনি আর দেরি করেননি। সঙ্গে সঙ্গে তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলেন। হিসাব–নিকাশ, লাভ–লোকসানের কোনো চিন্তা নেই—শুধু একজন মানুষ আরেকজন মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে।

সেই মুহূর্তে আমি বুঝেছিলাম, মানবতা কোনো বড় কথা নয়, কোনো বক্তৃতা নয়। মানবতা হলো নিঃশব্দে পাশে দাঁড়ানো। অসুস্থ কাঁধে হাত রাখা। অচেনা মানুষকে আপন করে নেওয়া।

দক্ষিণ কোরিয়া আমাকে শিখিয়েছে—উন্নয়ন শুধু দালানকোঠা বা প্রযুক্তিতে নয়, উন্নয়ন মানুষের মননে, আচরণে, হৃদয়ে।

আজ অনেক বছর পরও যখন কোরিয়ার কথা মনে পড়ে, তখন সবচেয়ে আগে মনে পড়ে সেই মানুষগুলোর কথা—যারা আমাকে বুঝিয়েছিল, মানুষ হওয়াটাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পরিচয়।

Explore More Districts