মরদেহ মেডিকেলে দানের ইচ্ছা রেখে বিদায় নিলেন আজাদুল কবির আরজু

মরদেহ মেডিকেলে দানের ইচ্ছা রেখে বিদায় নিলেন আজাদুল কবির আরজু

বাংলাদেশের উন্নয়ন অঙ্গনের অন্যতম পথিকৃৎ, বিশিষ্ট সমাজসেবক এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন (জেসিএফ)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক মো. আজাদুল কবির আরজু আর নেই। (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। শনিবার (২৪ জানুয়ারি ২০২৬) দুপুরে যশোর শহরের পশ্চিম বারান্দীপাড়ায় নিজ বাসভবনে তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭২ বছর।

পরিবার ও প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। মৃত্যুকালে তিনি অসংখ্য গুণগ্রাহী, সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন। তাঁর মৃত্যুতে যশোরসহ সারাদেশের উন্নয়নকর্মী, সুশীল সমাজ, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

তাঁর মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়লে জেসিএফ পরিবার, সুবিধাভোগী ও স্থানীয়-জাতীয় উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে শোকাবহ পরিবেশ সৃষ্টি হয়। মুজিব সড়কস্থ জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশনের প্রধান কার্যালয়ে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের ঢল নামে।

১৯৭৫ সালে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে একদল সমাজসচেতন তরুণকে সঙ্গে নিয়ে যশোরে ‘জাগরণী চক্র’-এর যাত্রা শুরু করেন আজাদুল কবির আরজু। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব, সৎ ও মানবিক ব্যবস্থাপনায় একটি ক্ষুদ্র সংগঠন সময়ের ব্যবধানে দেশের অন্যতম বৃহৎ ও সুসংগঠিত এনজিওতে পরিণত হয়।

গত প্রায় পাঁচ দশকে জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম, শিক্ষা বিস্তার, স্বাস্থ্যসেবা, নারী ক্ষমতায়ন এবং টেকসই উন্নয়ন কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা উন্নয়ন মডেল দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরেও প্রশংসিত হয়েছে।

যশোর অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনে তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মাঠপর্যায়ে কাজের প্রতি গভীর অনুরাগ ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা তাঁকে একজন ব্যতিক্রমী উন্নয়নকর্মীতে পরিণত করেছিল। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন সাদামাটা, বিনয়ী ও অমায়িক স্বভাবের মানুষ।

বাদ আসর যশোর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে তাঁর প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে জেসিএফ সাধারণ পরিষদ ও নির্বাহী পরিষদের সদস্যবৃন্দ, জেসিএফ পরিবারসহ উদীচী, কিংশুক, বাংলার ভোর, স্পন্দন, চাঁদেরহাট, যশোর সাংবাদিক ইউনিয়ন, বাংলাদেশ বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ, মাওলানা ভাষানী পরিষদ, সিপিবি যশোর শাখা, বিবর্তন, যমুনা ব্যাংক, জয়তী সোসাইটি, টিএমএসএস, জাসদ, থিয়েটার ক্যানভাস, চারুপীঠ, তীর্যক, আরআরএফ, সুরধনি, প্রাচ্য একাডেমি যশোর, ওয়ার্কার্স পার্টি এবং দৈনিক গ্রামের কাগজসহ বিভিন্ন সংগঠন তাঁর মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করে।

সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত মরদেহটি জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশনের প্রধান কার্যালয়ে রাখা হয়। পরে তাঁর জন্মস্থান যশোর সদর উপজেলার হৈবতপুর ইউনিয়নের এনায়েতপুর গ্রামে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে দ্বিতীয় দফা নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। রাতে মরদেহটি যশোর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের হিমঘরে সংরক্ষণ করা হয়।

রোববার (২৫ জানুয়ারি) সকাল সাড়ে ৯টায় মুজিব সড়কস্থ জেসিএফ প্রধান কার্যালয়ে তাঁর আরেক দফা নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। সকাল সাড়ে ৮টা থেকে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মরদেহ উন্মুক্ত রাখা হবে। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী মরদেহ মেডিকেল শিক্ষার্থীদের শিক্ষার কাজে ব্যবহারের জন্য যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দান করা হবে।

এদিকে তাঁর মৃত্যুতে ৭ দিনের শোক কর্মসূচি ঘোষণা করেছে জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন। কর্মসূচির অংশ হিসেবে রোববার জেসিএফ-এর সকল কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। এছাড়াও শোকসভা, দোয়া মাহফিলসহ মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনায় বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

Explore More Districts