মরণবাঁধ ফারাক্কার ৫০ বছর: আজ ঐতিহাসিক ফারাক্কা দিবস – DesheBideshe

মরণবাঁধ ফারাক্কার ৫০ বছর: আজ ঐতিহাসিক ফারাক্কা দিবস – DesheBideshe



মরণবাঁধ ফারাক্কার ৫০ বছর: আজ ঐতিহাসিক ফারাক্কা দিবস – DesheBideshe

ঢাকা, ১৬ মে – আজ ১৬ মে, ঐতিহাসিক ফারাক্কা দিবসের ৫০ বছর পূর্তি বা সুবর্ণ জয়ন্তী। আজ থেকে ঠিক পাঁচ দশক আগে, ১৯৭৬ সালের এই দিনে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের প্রতিবাদে এবং বাংলাদেশের ন্যায্য পানির হিস্যার দাবিতে গর্জে উঠেছিল টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর দূরদর্শী নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ইতিহাসের সেই কালজয়ী ‘ফারাক্কা লংমার্চ’, যা কাঁপিয়ে দিয়েছিল আন্তর্জাতিক মহলকে।

রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা ময়দান থেকে লাখো জনতার বজ্রকণ্ঠে শুরু হওয়া সেই লংমার্চ চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট হাইস্কুল মাঠে গিয়ে এক বিশাল মহাসমাবেশের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছিল। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নদী বাঁচানোর এই লড়াই আজ ৫০ বছরে পদার্পণ করলেও, ফারাক্কার সেই মরণকামড় থেকে আজও মুক্তি পায়নি বাংলাদেশ।

কী ঘটেছিল ১৯৭৬ সালে?

১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল ভারত পরীক্ষামূলকভাবে ফারাক্কা বাঁধ চালু করার পরপরই বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে তার ভয়াবহ পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পদ্মার পানিপ্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় কৃষি, সেচ, নৌচলাচল এবং জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে পড়ে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ফরিদপুর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ পদ্মা অববাহিকা শুষ্ক মৌসুমে মরুভূমিতে পরিণত হতে শুরু করে।

এই চরম অন্যায়ের বিরুদ্ধে মওলানা ভাসানী ডাক দেন রাজপথের লড়াইয়ের। ১৯৭৬ সালের ১৬ মে লাখো মানুষ ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে লংমার্চে শামিল হন। পরদিন কানসাটের মাঠে দাঁড়িয়ে মওলানা ভাসানী ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন, “আজ কানসাটে যে ইতিহাস শুরু হলো, তা অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ জাতির রুখে দাঁড়ানোর জ্বলন্ত নজির।”

তার মুখে ফারাক্কা বাঁধ ‘মরণবাঁধ’ আখ্যা পাওয়ার পর লাখো জনতার স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠেছিল সীমান্ত এলাকা— “ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও মরণবাঁধ ফারাক্কা।” এই তীব্র আন্দোলনের মুখে আন্তর্জাতিক চাপের পড়ে ১৯৭৭ সালে ভারতের সাথে ৫ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছিল দিল্লি।

নদী গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, ফারাক্কার বিরূপ প্রভাব পাঁচ দশক পেরিয়ে আজও দেশের ওপর চেপে বসে আছে। গঙ্গা-পদ্মার পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় দেশের শতাধিক নদ-নদী এখন মৃতপ্রায়।

গবেষকদের দেওয়া চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য:

  • ৫০% আয়তন হ্রাস: ১৯৮৪ সালের তুলনায় রাজশাহী অংশে গঙ্গা নদীর আয়তন কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ। কমেছে গভীরতা ও পানির তীব্র প্রবাহ।
  • লবণাক্ততার আগ্রাসন: দেশের দক্ষিণাঞ্চলে স্বাদু পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় সুন্দরবনসহ উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, যা ধ্বংস করছে কৃষি ও বনভূমি।
  • ভূগর্ভস্থ পানির সংকট: উত্তরাঞ্চল জুড়ে সেচ সংকট এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হু হু করে নিচে নেমে যাচ্ছে।
  • গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: ১৯৯৬ সালে ভারতের সাথে বাংলাদেশের যে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি হয়েছিল, তার মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরেই শেষ হতে চলেছে। তবে এই চুক্তির অধীনেও বাংলাদেশ তার প্রত্যাশিত পানির হিস্যা পুরোপুরি পায়নি বলে দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে।

ফারাক্কা দিবসে আজ দেশজুড়ে একঝাঁক কর্মসূচি

ঐতিহাসিক এই দিনটি স্মরণে এবং পানির ন্যায্য অধিকারের দাবিতে আজ রাজধানী ঢাকাসহ রাজশাহীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে:

বিএনপির আলোচনা সভা: রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (আইইবি)-এ বিশেষ আলোচনা সভার আয়োজন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।

রাজশাহীতে ১১ দলীয় জোটের সমাবেশ: রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা ময়দানে বিভাগীয় সমাবেশ করবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান।

অন্যান্য কর্মসূচি: এছাড়া রাজশাহীর বড়কুঠি এলাকা এবং রাজধানীর তোপখানা রোডেও পৃথক আলোচনা সভা ও গণসমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে।

এনএন/ ১৬ মে ২০২৬



Explore More Districts