ব্যস্ত সড়কের মাঝে মরণফাঁদ, সংস্কারে নেই উদ্যোগ

ব্যস্ত সড়কের মাঝে মরণফাঁদ, সংস্কারে নেই উদ্যোগ

ব্যস্ত সড়কের মাঝে মরণফাঁদ, সংস্কারে নেই উদ্যোগ

মৌলভীবাজারের বড়লেখা পৌর শহরের ব্যস্ততম সড়কের মাঝখানে দেবে যাওয়া গ্যাসের ম্যানহোল এখন যেন দুর্ঘটনার ফাঁদ। সড়কের পিচের স্তর থেকে ম্যানহোলের ঢাকনা অনেকটা নিচে নেমে যাওয়ায় প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে মোটরসাইকেল, রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ ছোট যানবাহন। একই সঙ্গে পৌর শহরের বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও এই সড়ক দিয়ে যাতায়াত করতে গিয়ে পড়ছে ভোগান্তি ও দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সমস্যাটি দৃশ্যমান হলেও কার্যকর সংস্কার হয়নি। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো সমস্যার কথা জানার কথা স্বীকার করলেও কাজ শুরু না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে- আর কত দুর্ঘটনার পর সংস্কার করবে কর্তৃপক্ষ?

সরেজমিনে দেখা গেছে, পৌর শহরের মধ্যবাজার এলাকায় ভূমি অফিসসংলগ্ন প্রধান সড়কের মাঝখানে গ্যাসলাইনের একটি ম্যানহোলের ঢাকনা আশপাশের পিচের স্তর থেকে অনেকটা নিচে দেবে গেছে। চারপাশের সড়কও ভেঙে অসমান হয়ে পড়েছে। দূর থেকে জায়গাটি সহজে বোঝা না যাওয়ায় চালকদের হঠাৎ ব্রেক করতে হচ্ছে কিংবা ঝুঁকি নিয়ে পাশ কাটিয়ে যেতে হচ্ছে।

এ সড়কের আশপাশে রোকেয়া খাতুন লাইসিয়াম স্কুলসহ পৌর শহরের কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। সকাল ও ছুটির সময়ে শিক্ষার্থীদের বহনকারী রিকশা, অটোরিকশা, মোটরসাইকেল ও অন্যান্য ছোট যানবাহনের চাপ বেড়ে যায়। ফলে দেবে যাওয়া ম্যানহোলের কাছে যানবাহন হঠাৎ গতি কমানো বা দিক পরিবর্তন করায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বিড়ম্বনাও বাড়ছে। বিশেষ করে কম বয়সী শিক্ষার্থীদের নিয়ে অভিভাবকেরা এ স্থান পার হওয়ার সময় উদ্বেগে থাকেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। ম্যানহোলের আশপাশে পানি জমে গেলে কোথায় সড়ক সমতল আর কোথায় দেবে যাওয়া অংশ- তা সহজে বোঝা যায় না। স্কুল ছুটির সময় একই সঙ্গে শিক্ষার্থী, পথচারী ও ছোট যানবাহনের চাপ থাকায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা আরও বাড়ে।

এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন কুলাউড়া-শাহবাজপুর আঞ্চলিক রুটের পাশাপাশি ঢাকা-সিলেটসহ বিভিন্ন গন্তব্যের দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল করে। কাছেই উপজেলা ভূমি অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং একাধিক এলাকার সংযোগ সড়ক থাকায় দিনভর যানবাহন ও পথচারীর চাপ থাকে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও চালকদের ভাষ্য, সড়ক সংস্কার বা পুনর্নির্মাণের সময় পিচের স্তর উঁচু হলেও গ্যাসের ম্যানহোলগুলো আগের উচ্চতায় থেকে গেছে। এর ফলে সড়কের মাঝেই তৈরি হয়েছে গভীর নিচু অংশ। বিশেষ করে রাতে কিংবা বৃষ্টির সময় সেখানে পানি জমলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। চালকেরা সামনে এসে হঠাৎ গর্ত দেখতে পেয়ে ব্রেক কষলে পেছনের যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষের আশঙ্কাও তৈরি হয়।

স্থানীয়দের একাংশ ম্যানহোলের নিচে থাকা গ্যাসলাইনের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে গ্যাসলাইনে কোনো ফাটল বা তাৎক্ষণিক বিস্ফোরণঝুঁকি রয়েছে কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট কোনো তথ্য জানায়নি।

অটোচালক ছায়দুল আহমদ নিজের দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, “গত মাসে রাত আনুমানিক ১১টার দিকে বড় একটি বাসের পেছনে প্রায় ৩০ কিলোমিটার বেগে অটো চালাচ্ছিলাম। বাসটির বড় চাকা ম্যানহোলের ওপর দিয়ে চলে গেলেও আমার অটোর ছোট চাকা হঠাৎ দেবে যাওয়া অংশে পড়ে যায়। হার্ড ব্রেক করেও নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারিনি। পেছন থেকে একটি মোটরসাইকেল এসে ধাক্কা দেয়। অটোরিকশার ব্যাপক ক্ষতি হয়, দুই যাত্রীও আঘাত পান।” তার অভিযোগ, “সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলার খেসারত চালক ও যাত্রীদের দিতে হচ্ছে।”

ব্যবসায়ী আহমেদ আলী বলেন, দেবে যাওয়া ম্যানহোলের কারণে ছোট যানবাহনগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে। শহরের প্রাণকেন্দ্র হওয়ায় প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীও এ সড়ক ব্যবহার করে।
তিনি বলেন, “বৃষ্টি হলে সেখানে পানি জমে যায়। তখন গর্ত বোঝার কোনো উপায় থাকে না। পাশে আরও একটি ঝুঁকিপূর্ণ ম্যানহোল আমরা কয়েকজন ব্যবসায়ী মিলে ইট-বালু দিয়ে সাময়িকভাবে ঠিক করেছি। কিন্তু এভাবে তো স্থায়ী সমাধান হবে না।”

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) বড়লেখা উপজেলা শাখার দুর্ঘটনা ও অনুসন্ধানবিষয়ক সম্পাদক আব্দুল হামিদ বলেন, “সড়কের ওপর ম্যানহোলের ঢাকনা দেবে যাওয়ার কারণে নিয়মিত ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। আমরা এটি সংস্কারের জন্য বারবার দাবি জানাচ্ছি, অথচ এতদিনেও স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।” তিনি বলেন, জালালাবাদ গ্যাস কর্তৃপক্ষকে ম্যানহোলগুলো সড়কের সমান লেভেলে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। বিষয়টি নিয়ে পৌর প্রশাসকের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে।

ট্রাফিক সদস্য রুহুল আমিন বলেন, “প্রায় এক বছর ধরে ম্যানহোলটি পিচের স্তর থেকে নিচে দেবে আছে। এখানে ছোট-বড় দুর্ঘটনা প্রতিদিন ঘটছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানটি দ্রুত সংস্কার করা প্রয়োজন।”

হাজীগঞ্জ বাজার বণিক সমিতির সদস্যসচিব আব্দুল হক বলেন, বিষয়টি তারা অনেক আগেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। দ্রুত মেরামতের আশ্বাসও পাওয়া গেছে।
তবে আশ্বাসের পরও কেন কাজ শুরু হয়নি, সেই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর মেলেনি।

জালালাবাদ গ্যাস আঞ্চলিক বিতরণ কার্যালয়ের (বড়লেখা-জুড়ী) মার্কেটিং বিভাগের কর্মকর্তা মিনহাজুল ইসলাম বলেন, “বিষয়টি নজরে আসার পর আমরা দেবে যাওয়া ম্যানহোল সংস্কারের জন্য হেড অফিসে একাধিকবার যোগাযোগ করেছি। ধারাবাহিক কাজের চাপের কারণে হয়তো দেরি হচ্ছে। আমরা আবারও যোগাযোগ করছি, যাতে দ্রুত সংস্কার করা হয়।”

বড়লেখা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও পৌর প্রশাসক নাঈমা নাদিয়া বলেন, “দেবে যাওয়া ম্যানহোলের বিষয়টি অনেক আগেই আমাদের নজরে এসেছে। জালালাবাদ গ্যাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করা হয়েছে, কিন্তু এখনো সংস্কার হয়নি। আমি আবারও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করব।”

স্থানীয়দের প্রশ্ন, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই যখন সমস্যার কথা জানে এবং দুর্ঘটনার ঘটনাও ঘটছে, তখন শহরের প্রাণকেন্দ্রের এমন ব্যস্ত সড়কে দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা কেন বহাল থাকবে। বিশেষ করে প্রতিদিন যেখানে স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের যাতায়াত, সেখানে একটি দেবে যাওয়া ম্যানহোল সামান্য অবহেলাতেই বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তাদের দাবি, আর আশ্বাস নয়- বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা প্রাণহানির আগেই ম্যানহোলটি সড়কের সমতলে এনে স্থায়ীভাবে সংস্কার করতে হবে।

ডিএস/এফআর/এসএ

Explore More Districts