বৃষ্টি বা একটু রোদ হলেই দ্বিগুণ, রিকশা ভাড়ায় সীমাহিন নৈরাজ্য, জিম্মি নগরবাসী

বৃষ্টি বা একটু রোদ হলেই দ্বিগুণ, রিকশা ভাড়ায় সীমাহিন নৈরাজ্য, জিম্মি নগরবাসী


দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/

শহরে এখন রিকশায় উঠলেই যেন সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা। মাত্র কয়েকশ গজ পথ হলেও এর কমে যেতে রাজি হন না অধিকাংশ চালক। একটু বেশি দূরত্ব হলেই শুরু হয় দর-কষাকষি, এমনকি অনেক সময় যাত্রীকে বিব্রত করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের চেষ্টা করা হয়। আর বৃষ্টি শুরু হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। যে পথের ভাড়া ২০ টাকা, সেটিই মুহূর্তে ৪০, ৫০ কিংবা ৬০ টাকায় পৌঁছে যায়। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন স্কুলগামী শিশু, নারী, বৃদ্ধ, রোগী ও অফিসগামী মানুষ, যাদের নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর বিকল্প থাকে না।

প্রযুক্তির উন্নয়নে এখন অধিকাংশ রিকশায় ব্যাটারি সংযোজন করা হয়েছে। ফলে আগের তুলনায় অনেক কম সময়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করা সম্ভব হচ্ছে। যে পথ প্যাডেল রিকশায় ১৫–২০ মিনিট লাগত, ব্যাটারিচালিত রিকশায় সেটি প্রায় ৫ মিনিটেই পাড়ি দেওয়া যায়। অথচ এই অল্প সময়ের যাত্রার জন্য ২০, ৩০ বা তারও বেশি টাকা ভাড়া দাবি করা হচ্ছে।
অর্থনীতির দৃষ্টিতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে—মাত্র পাঁচ মিনিটে একটি ট্রিপ থেকে ২০ টাকা আয় করলে, ঘণ্টায় একজন চালকের সম্ভাব্য আয় কত দাঁড়ায়? যদি প্রতি পাঁচ মিনিটে একটি ট্রিপ সম্পন্ন হয়, তবে এক ঘণ্টায় ১২টি ট্রিপ থেকে আয় হতে পারে প্রায় ২৪০ টাকা। দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা কাজ করলে সম্ভাব্য আয় দাঁড়ায় প্রায় ১,৯২০ থেকে ২,৪০০ টাকা। বাস্তবে যানজট, যাত্রী না পাওয়া বা বিরতির কারণে এই হিসাব কম হতে পারে, তবুও এটি স্পষ্ট যে বর্তমান ভাড়া কাঠামো নিয়ে যৌক্তিক প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে।

চালকদের দাবি, বৃষ্টি, যানজট, জলাবদ্ধতা ও ঝুঁকিপূর্ণ সড়কে চলাচলের কারণে তাদের খরচ ও শ্রম বেড়ে যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই অতিরিক্ত চাপের পুরো বোঝা কি একমাত্র যাত্রীকেই বহন করতে হবে? কোনো সরকারি নীতিমালা বা নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা ছাড়া পরিস্থিতি বুঝে ইচ্ছেমতো ভাড়া নির্ধারণ করা একটি অনিয়ন্ত্রিত বাজারব্যবস্থার লক্ষণ। এতে দর-কষাকষির ক্ষমতা যার কম, সেই যাত্রীই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।

পরিবহন অর্থনীতিবিদদের মতে, জনপরিবহন একটি জনসেবামূলক খাত। এখানে মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় শুধু অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক নয়, এটি সামাজিক নৈতিকতারও পরিপন্থী।
সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন কুষ্টিয়ার সাধারণ সম্পাদক কারশেদ আলম বলেন, “রিকশা ও অটোর অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এখন একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন। বৃষ্টি, যানজট কিংবা মানুষের জরুরি প্রয়োজনকে পুঁজি করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। যাত্রীদের জিম্মি করে মুনাফা অর্জনের এই প্রবণতা বন্ধে প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি ও নির্ধারিত ভাড়া বাস্তবায়ন জরুরি। একই সঙ্গে চালকদেরও মনে রাখতে হবে, পরিবহন শুধু আয়ের উৎস নয়, এটি একটি জনসেবা। জনস্বার্থ ও মানবিক মূল্যবোধকে উপেক্ষা করে গড়ে ওঠা কোনো ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে সমাজের জন্য কল্যাণকর হতে পারে না।”

স্কুল শিক্ষার্থী ইসমত আরা রোজা বলে, “বৃষ্টি হলে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হয় আমাদের মতো শিক্ষার্থীদের। সময়মতো স্কুলে পৌঁছানোর তাড়া থাকে, তাই রিকশাচালক যত ভাড়াই চান, অনেক সময় বাধ্য হয়ে দিতে হয়। সাধারণ দিনে যে পথে ২০ টাকা লাগে, বৃষ্টি হলেই ৪০ বা ৫০ টাকা চাওয়া হয়। ভাড়া নিয়ে কথা বললে অনেকেই যেতে চান না। এতে আমাদের দেরি হয়, মানসিক চাপও বাড়ে। প্রশাসনের উচিত এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া, যাতে আবহাওয়ার অজুহাতে কেউ শিক্ষার্থী বা সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত ভাড়া দিতে বাধ্য করতে না পারে।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র জানায়, বর্তমানে অধিকাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক মালিকের কাছ থেকে দৈনিক ভাড়ায় রিকশা চালান। এ জন্য প্রতিদিন গড়ে ২৫০ টাকা মালিককে পরিশোধ করতে হয়। চালকদের দাবি, এই ভাড়ার পাশাপাশি ব্যাটারি চার্জ, ছোটখাটো রক্ষণাবেক্ষণ, খাবার ও ব্যক্তিগত খরচ বহন করতে হয়। তবে যাত্রীদের অভিযোগ, এসব ব্যয়ের অজুহাতে অনেক চালক অযৌক্তিকভাবে ভাড়া বাড়িয়ে দিচ্ছেন, যার পুরো চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ যাত্রীদেরই বহন করতে হচ্ছে।

এ অবস্থায় স্থানীয় প্রশাসন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের উচিত রিকশা ও অটোর জন্য দূরত্বভিত্তিক ভাড়ার নির্দেশিকা প্রণয়ন, দৃশ্যমান ভাড়ার তালিকা বাধ্যতামূলক করা এবং অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা চালু করা। অন্যথায় প্রতিটি বৃষ্টির দিন সাধারণ মানুষের জন্য কেবল দুর্ভোগ নয়, এক ধরনের বৈধহীন অর্থনৈতিক শোষণের প্রতীকে পরিণত হবে।

Explore More Districts