বিদেশি নম্বরে হোয়াটসঅ্যাপ, টার্গেট করে চাঁদা দাবি – দৈনিক আজাদী

বিদেশি নম্বর দিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ চালু। তারপর টার্গেটকে ওই নম্বর থেকে ফোন। চট্টগ্রামের আলোচিত সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন, বড় সাজ্জাদ, রায়হানের নাম ব্যবহার করে দাবি করা হতো মোটা অংকের টাকা। হাটহাজারী ও নগরীর বায়েজিদ এলাকা থেকে এ রকম সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো কামরুল হাসান প্রকাশ সাগর (২৫), মো. রিকু (২৫), মো. তরিকুল ইসলাম ওরফে রোহিত (২০), আহমদুল্লাহ প্রকাশ মাসুম মেম্বর (৪০), আহমদ রেজা শাকিল (২৫), মো. মানিক (৪০) ও নুরুল আলম (৪০)। তাদের মধ্যে আহমদ রেজা শাকিলের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও চাঁদাবাজির ঘটনায় দুটি করে, অপহরণ, ডাকাতির প্রস্তুতি ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি করেসহ মোট আটটি মামলা আছে।

পুলিশ জানিয়েছে, এই সন্ত্রাসীরা টার্গেটকে ফোন করে বলতো আমার লোক যাবে, টাকাটা দিয়ে দিবি। অন্যথায় একশ’জন পুলিশ পাহারা বসিয়েও বেঁচে থাকতে পারবি না। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালেই প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হতো। স্কুল কলেজ পড়ুয়া বাচ্চাদের তথ্য জানিয়ে বলা হতো, স্কুলে যাওয়ার সময় তুলে নিয়ে যাবো। এক চিকিৎসকের কাছে প্রথমে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে চাঁদার অংক বাড়িয়ে করা হয় ২০ লাখ টাকা। বলা হয়, না দিলে গুলি করে জানে মেরে ফেলবো, ‘১০০ পুলিশ রাখলেও’ বাঁচতে পারবি না। অপর এক চিকিৎসকের কাছে বিদেশি নম্বর থেকে পাঠানো বার্তায় বলা হয়, ‘আপনি কোথায় জায়গা নিচ্ছেন না নিচ্ছেন, আপনি কত টাকার মালিক সেটা আমরা জানি। আমরা গরিব মানুষের পেটে লাথি মারি না।

চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার মাসুদ আলম গতকাল (মঙ্গলবার) নিজের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এ সব ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এ চাঁদাবাজরা হুমকি দিয়েছিল, টাকা না দিলে ১০০ পুলিশ রাখলেও ওই চিকিৎসককে মেরে ফেলা হবে। যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তারা কারাগারে থাকা আলোচিত সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনের ‘বেতনভুক্ত কর্মচারী’ বলেও উল্লেখ করেন পুলিশ সুপার। তিনি বলেন, এরা ডেভিড ইমনের হয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজ করে। আবার তাদের (ইমনদের) অজান্তেও বিভিন্ন জায়গায় তারা চাঁদাবাজি করে। এভাবে একটি চক্র তারা তৈরি করে ফেলেছে।

পুলিশ সুপার বলেন, বিত্তবান, ব্যবসায়ী ও ধনাঢ্য ব্যক্তিদের বিভিন্ন তথ্য তারা সংগ্রহ করে। এমনকি তাদের পরিবারের সদস্যরা কে কখন কোথায় যাচ্ছে, সেসব তথ্য ব্যবহার করে ভীতির পরিবেশ তৈরি করে। এ কারণে অনেকেই নীরবে চাঁদা দিয়ে যায়। যে নম্বর ও মোবাইল ব্যবহার করে চিকিৎসকের কাছে চাঁদা দাবি করা হয়েছে, সেগুলো জব্দ করার কথা জানান পুলিশ সুপার মাসুদ আলম।

পুলিশ জানায়, গত ২ সেপ্টেম্বর রাতে এক চিকিৎসকের চেম্বারে ফোন করে বড় সাজ্জাদের পরিচয় দিয়ে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দবি করা হয়। বিষয়টি তিনি এড়িয়ে গেলে দফায় দফায় হোয়াটস অ্যাপে মেসেজ পাঠিয়ে হুমকি দেওয়া শুরু হয়। এক পর্যায়ে তারা ২০ লাখ টাকা দাবি করে মেরে ফেলার হুমকি দেয়।

চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হাটহাজারি সার্কেল) কাজী মো. তারেক আজিজ বলেন, গ্রেপ্তার কামরুল হাসান সাগর ও তরিকুল ইসলাম রোহিত ওই চিচিৎসককে ফোন করে চাঁদা দাবি করে। তারাই বিভিন্নভাবে হুমকি দিয়ে আসছিল।

বড় দিঘীর পাড় এলাকায় এক ব্যবসায়ীর নির্মাণাধীন বাড়িতে চাঁদার দাবিতে ভাংচুর এবং নগরীর মোজাফ্‌ফর নগর এলাকায় এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে চাঁদা দাবির ঘটনাতেও এ চক্র জড়িত বলে তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

গত ৩ সেপ্টেম্বর হাটহাজারি থানায় করা সাধারণ ডায়েরিতে চিকিৎসক ইউসুফ ফারুকী পারভেজ অভিযোগ করেন, গত ২ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ১১টার দিকে তার চেম্বারের সিরিয়াল নম্বর নেয়ার মোবাইলে কল করে তার সাথে কথা বলতে চান এক ব্যক্তি। টেলিফোনের ওই প্রান্তে থাকা ব্যক্তি নিজেকে বড় সাজ্জাদ পরিচয় দিয়ে ১০ লাখ টাকা তৈরি রাখতে বলেন। টাকা দিতে ব্যর্থ হলে যে কোনো সময় চেম্বারে গিয়ে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেন।

চিকিৎসকের কাছে চাঁদা দাবির খবর পেয়ে জেলা পুলিশ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করে। তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে ফোনকল ও যোগাযোগের তথ্য বিশ্লেষণের পাশাপাশি গোপন সূত্রে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। আগে গ্রেপ্তার ডেভিড ইমন ও কালা মোবারককে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তিনি আরও বলেন, গ্রেপ্তারকৃতরা নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে বিদেশি নম্বর ও হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে চাঁদাবাজি করতো। টার্গেট ব্যক্তিদের সম্পর্কে আগে তথ্য সংগ্রহ করে পরে ডেভিড ইমন, কালা মোবারক, বড় সাজ্জাদ ও রায়হানের মতো পরিচিত সন্ত্রাসীদের নাম ব্যবহার করে ভয় দেখানো হতো। তবে তারা মূলত নিজেদের পৃথক চাঁদাবাজ চক্র গড়ে তুলেছিলেন।

জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, গ্রেপ্তারকৃতরা মূলত গত জুলাই মাসে যশোর থেকে গ্রেপ্তার হওয়া ডেভিড ইমনের সহযোগী। ইমন জেলে থাকায় তারা রায়হান ও বড় সাজ্জাদের নামে চাঁদাবাজি করে থাকে।

তবে এসব চাঁদাবাজির অনেক কিছুই সাজ্জাদ, রায়হান বা ইমন কেউ জানে না। তাদের নাম ভাঙিয়ে তারা চাঁদা তোলে। চক্রটির অন্যান্য সদস্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও জেলা পুলিশ জানিয়েছে।

Explore More Districts