| ২৭ February ২০২৬ Friday ১১:০১:০৬ PM | |
রাহাদ সুমন,বিশেষ প্রতিনিধি:

ইতিহাস-ঐতিহ্য ও জ্ঞানী-গুণীর চারণভূমি বরিশালের বানারীপাড়ার কৃতি সন্তান আলী আহমদ বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার পাওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫ তুলে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এবার ৯ জনকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে অমর একুশে বইমেলা-২০২৬ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় অবদান রাখায় ৯ বিশিষ্টজনকে এই পুরস্কার তুলে দেন।
পুরস্কার প্রাপ্তরা হলেন— কবিতায় মোহন রায়হান, কথাসাহিত্যে নাসিমা আনিস, প্রবন্ধ-গদ্যে সৈয়দ আজিজুল হক, শিশুসাহিত্যে হাসান হাফিজ, অনুবাদ আলী আহমদ, গবেষণা মুস্তাফা মজিদ ও ইসরাইল খান, বিজ্ঞানে ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী এবং মুক্তিযুদ্ধ মঈদুল হাসান। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আজম এবং সভাপতিত্ব করেন একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। প্রসঙ্গত, সমকালীন বিশ্বসাহিত্য বাংলাভাষাভাষী পাঠকের কাছে সাবলিল ভাষায় ও নান্দনিক সৌন্দের্যে উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে আলী আহমদ অহর্নিশ সাধনা করেছেন। এ পুরস্কারপ্রাপ্তী তার সাহিত্যসাধনার বিশালতায় ক্ষুদ্র অর্জন। তার চিন্তাদর্শন, নান্দনিক ভুবন ও সাহিত্যসাধনার ব্যাপ্তি আকারে আরও বৃহৎ, ভাবনায় আরও গভীর, ভাষায় আরও প্রাঞ্জল, সময় ও কালে আরও টেকসই বটে।
বরিশালের বানারীপাড়ায় সন্ধ্যা নদীর তীরঘেষা গ্রামের নাম মসজিদ বাড়ি। এ গ্রামের মমতাজ উদ্দিন আহমদ ও হাসিনা বানু দম্পতির সন্তান আলী আহমদ। সন্ধ্যা নদীর ভাঙা-গড়ায় জীবনস্রোতের চলিষ্ণু সত্তা নিয়ে এ গ্রামেই আলী আহমদের জন্ম ও শৈশবে বেড়ে ওঠা। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যচর্চায় তিনি মনোনিবেশ করেন। গল্প, উপন্যাস ও বিভিন্ন ভাষার কাব্যবিশ্লেষণে তাঁর আগ্রহ ছিল গভীর। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পড়াশোনা শেষ করে বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। কর্মজীবনে সততা ও দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে তিনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সেখান থেকেই অবসর গ্রহণ করেন।।বর্ণাঢ্য কর্মময় এ পথে পূর্ণ তৃপ্ত পায়নি তার অতৃপ্ত আত্মা। জীবনচলার পথে পথে তিনি মন ও মননে ডুব দেন সাহিত্যসাধনায়। দীর্ঘ সাধনায় এ ক্ষুদ্র অর্জন জীবদ্দশায় দেখে যাওয়া তাঁর জন্য পরমানন্দের।
জীবন-জীবিকায় আলী আহমদ সরকারি চাকরি করেছেন বটে, তবে রূপ-রস আস্বাদনে শিল্প-সাহিত্যের দেশজ ভুবন অতিক্রম করে বৈশ্বিক ভুবনের মহানেশায় মজেছেন তিনি। রবী ঠাকুরের প্রচণ্ড অনুরাগী এ মানুষটির ইংরেজি সাহিত্য ও ভাষায় অসাধারণ দখল তার, শুধুই ব্যক্তি উদ্যোগে, মানসের ক্ষুধা নিবারণের নেশায়। তিনি বিশ্বসাহিত্যের মহারথীদের নিয়ে কালযাপন করেছেন এবং সিদ্ধহস্তে অনুবাদ করে বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের তৃপ্ত করেছেন। চাকরির পাশাপাশি দীর্ঘ তিন দশক ধরে তিনি অনুবাদ-সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন। বাংলা থেকে ইংরেজি এবং ইংরেজি থেকে বাংলা—দুই ধারাতেই সমান দক্ষতায় অনুবাদ করে তিনি বাংলাদেশের অনুবাদ জগতে এক অনন্য অবস্থান তৈরি করেছেন। দেশি-বিদেশি কথাসাহিত্য অনুবাদের পাশাপাশি তিনি খ্যাতিমান সমালোচক হিসেবেও পরিচিত।
আলী আহমদের অনূদিত গ্রন্থের তালিকা অত্যন্ত সমৃদ্ধ।
তাঁর উল্লেখযোগ্য অনুবাদ গ্রন্থগুলো হল- নোবেলজয়ীদের ছোটগল্প, বিশ্বসাহিত্যের আঙিনায়, বারো অভিযাত্রীর কাহিনী, শিকার ও অন্যান্য গল্প, পাস্কুয়াল দুয়ার্তের পরিবার, খোঁজ, স্বপ্নগিরি,, বিশ্বসেরা ছোটগল্প, চোর ও সারমেয় সমাচার, প্রেম ও অন্যান্য দানব, হে সুন্দর হে বিষণ্ণতা, আমার সাক্ষ্য ও পাখির গান।
প্রসঙ্গত, আলী আহমদের অনুবাদকৃত বই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যতালিকাভুক্ত করা হয়েছে। বিশ্বসাহিত্যের নানা ভাষা ও সংস্কৃতির সেতুবন্ধন রচনায় তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। অনুবাদের মাধ্যমে তিনি বাংলা ভাষাভাষী পাঠকের সামনে বিশ্বসাহিত্যের দিগন্ত উন্মোচন করেছেন।। আলী আহমদের বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার অর্জন বানারীপাড়ার জন্য সম্মান ও গৌরবের, একইসঙ্গে দেশের অনুবাদ-সাহিত্যের জন্য এক অনন্য স্বীকৃতি।
সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক
| শেয়ার করতে ক্লিক করুন: | Tweet |

