বর্ষায় বাড়ছে সাপের উপদ্রব, সাপে কামড়ালে কী করবেন?

বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা, বন্যা ও ভারী বৃষ্টির কারণে সাপের স্বাভাবিক আবাসস্থলে পরিবর্তন আসে। ফলে সাপ শুকনো জায়গার সন্ধানে মানুষের বসতবাড়ি, বাড়ির আশপাশ, ঝোপঝাড়, গুদামঘর কিংবা উঁচু স্থানে চলে আসতে পারে। এতে এ সময় সাপে কামড়ানোর ঝুঁকিও বেড়ে যায়।

সাপে কামড়ানোর ঘটনা ঘটলে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে প্রচলিত বিভিন্ন ভুল পদ্ধতির আশ্রয় নেন। এতে আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা আরও জটিল হতে পারে এবং চিকিৎসা পেতে দেরি হতে পারে। তাই সাপে কামড়ানোর পর কী করা উচিত এবং কী করা উচিত নয়-এ বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।

সাপে কামড়ানোর পর প্রথমেই যা করবেন

সাপে কামড়ানোর পর আতঙ্কিত না হয়ে আক্রান্ত ব্যক্তিকে শান্ত রাখতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে যতটা সম্ভব স্থির অবস্থায় রাখতে হবে এবং কামড়ানো অঙ্গের নড়াচড়া কমাতে হবে। এরপর দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতাল বা উপযুক্ত চিকিৎসাকেন্দ্রে নিতে হবে।

আক্রান্ত ব্যক্তিকে নিজে হাঁটিয়ে বা দৌড় করিয়ে হাসপাতালে নেওয়া উচিত নয়। সম্ভব হলে বহন করে বা যানবাহনের মাধ্যমে দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া ভালো। সাপের ধরন জানা থাকলে চিকিৎসকদের জন্য তা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে সাপ শনাক্ত করতে গিয়ে কোনোভাবেই সাপের কাছে যাওয়া যাবে না।

ক্ষতস্থান কাটবেন না, বিষ চুষবেনও না

সাপে কামড়ানোর পর অনেকের মধ্যে কামড়ের স্থান কেটে রক্ত বের করা কিংবা মুখ দিয়ে বিষ চুষে বের করার প্রচলিত ধারণা রয়েছে। এ ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত নয়।

কামড়ের স্থান কেটে দিলে অতিরিক্ত রক্তপাত, সংক্রমণ ও টিস্যুর ক্ষতি হতে পারে। একইভাবে মুখ দিয়ে বিষ চুষে বের করার চেষ্টা করেও বিষ দূর করা যায় না; বরং আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষতস্থানে অতিরিক্ত আঘাত লাগতে পারে।

তাই কামড়ের স্থান নিয়ে কোনো ধরনের কাটাছেঁড়া বা আক্রমণাত্মক পদ্ধতি প্রয়োগ না করে দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়াই নিরাপদ।

শক্ত করে দড়ি বাঁধা বিপজ্জনক

সাপে কামড়ানোর পর বিষ শরীরে ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে অনেকেই আক্রান্ত অঙ্গের ওপর শক্ত করে দড়ি, কাপড় বা অন্য কিছু দিয়ে বাঁধেন। এভাবে শক্ত করে বাঁধা বিপজ্জনক হতে পারে।

দীর্ঘ সময় শক্ত করে বাঁধা থাকলে আক্রান্ত অঙ্গে রক্ত চলাচল ব্যাহত হয়ে টিস্যুর ক্ষতি হতে পারে। তাই এ ধরনের প্রচলিত পদ্ধতি অনুসরণ না করে আক্রান্ত অঙ্গকে যতটা সম্ভব স্থির রেখে দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া উচিত।

সাপটিকে ধরতে বা মারতে যাবেন না

সাপে কামড়ানোর পর অনেকেই সাপটিকে ধরে ফেলা বা মেরে ফেলার চেষ্টা করেন, যাতে সাপের ধরন শনাক্ত করা যায়। এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আহত বা আতঙ্কিত সাপ আবারও কামড়াতে পারে।

তাই সাপটিকে ধরতে, মারতে বা কাছে গিয়ে ছবি তুলতে যাবেন না। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন। সাপটি চলে গেলে তার রং, আকার ও বৈশিষ্ট্য মনে রাখার চেষ্টা করতে পারেন। সম্ভব হলে নিরাপদ দূরত্ব থেকে ছবি তোলা যেতে পারে, তবে এজন্য কোনোভাবেই ঝুঁকি নেওয়া যাবে না।

লক্ষণ দেখা দেওয়ার অপেক্ষা করবেন না

সাপে কামড়ানোর পর অনেক সময় আক্রান্ত ব্যক্তি প্রথম দিকে স্বাভাবিক থাকতে পারেন। তাই কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না বলে চিকিৎসা নিতে দেরি করা উচিত নয়।

বিষধর সাপের কামড়ের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। যেমন- কামড়ের স্থানে ব্যথা বা ফোলা, দুর্বলতা, বমি, চোখের পাতা ভারী হয়ে আসা, কথা বলতে বা গিলতে সমস্যা, শ্বাসকষ্টসহ গুরুতর উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

তবে লক্ষণ প্রকাশের অপেক্ষা না করে সাপে কামড়ানোর পর যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত চিকিৎসা শুরু হলে গুরুতর জটিলতা মোকাবিলা করার সুযোগ বাড়ে।

আতঙ্ক নয়, দ্রুত চিকিৎসা

সাপে কামড়ানোর ঘটনা ঘটলে আতঙ্কিত হয়ে ভুল চিকিৎসা বা ঝাড়ফুঁকের ওপর নির্ভর না করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া উচিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও সাপে কামড়ানোর পর দ্রুত উপযুক্ত চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানো এবং আক্রান্ত ব্যক্তিকে যতটা সম্ভব স্থির রাখার ওপর গুরুত্ব দেয়।

বর্ষাকালে বাড়ির আশপাশের ঝোপঝাড় ও আবর্জনা পরিষ্কার রাখা, রাতে চলাচলের সময় টর্চ ব্যবহার করা এবং জুতা, কাপড় ও বিছানাপত্র ব্যবহারের আগে ভালোভাবে দেখে নেওয়ার মাধ্যমে সাপের কামড়ের ঝুঁকি কিছুটা কমানো যায়।

মনে রাখুন- সাপে কামড়ালে সময় নষ্ট না করে দ্রুত চিকিৎসা নিন। ভুল পদ্ধতি নয়, সঠিক সময়ে চিকিৎসাই পারে জীবন বাঁচাতে।

Explore More Districts