| ১৪ February ২০২৬ Saturday ৩:৩৭:০৮ PM | |
আমাদের বরিশাল ডেস্ক:

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল বিভাগের ২১টি আসনে শুরু থেকেই আলোচনায় ছিলেন জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরা। ভোটের ফলাফলে বরিশাল সদরসহ বেশ কিছু আসনে তাদের আধিপত্য ফুটে উঠবে, ধারণা ছিল ভোটারদের। তবে ফল হয়েছে উল্টো। ভরাডুবি হয়েছে দুই দল এবং জোটের হেভিওয়েট প্রার্থীদের। ২১টির মধ্যে তারা আসন পেয়েছেন মাত্র তিনটি। বাকি ১৮ আসনে পুরোনো আধিপত্য দেখিয়েছে বিএনপি। এর মধ্য দিয়ে বিএনপি জানান দিয়েছে, রাজনীতির মাঠে দীর্ঘদিন ‘কোণঠাসা’ থাকলেও তারা একেবারে হারিয়ে যায়নি। ঐক্যে ফাটল, নারীবিদ্বেষী আচরণ এবং ভোটের আগের রাতে কালো টাকার ছড়াছড়ি বরিশাল বিভাগে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের ভরাডুবির কারণ হিসেবে দেখছেন ভোটাররা। এদিকে, যে দুটি আসনে বিএনপি হেরেছে, সেখানে প্রার্থী পছন্দ এবং দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে দায়ী করা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগের ২১টি আসনের মধ্যে ১৮টিতে বিজয়ী হয়েছে বিএনপি ও তাদের নেতৃত্বাধীন জোট। এর মধ্যে ১৬টিতে ধানের শীষ এবং দুটিতে জোটের প্রার্থী আন্দালিব রহমান পার্থ ও গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর বিজয়ী হয়েছেন। এর বাইরে পিরোজপুর-১-এ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাসুদ সাঈদী, পটুয়াখালী-২ আসনে জামায়াতের ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এবং বরগুনা-১ আসনে বিজয়ী হয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী।
বিভাগের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বরিশাল জেলার ছয়টি আসন। এ ছয়টিতেই বিএনপির প্রার্থীরা বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন। এখানকার চারটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন ইসলামী আন্দোলন, জামায়াতে ইসলামী এবং এবি পার্টির শীর্ষ চার নেতা। তারা চারজনই হেরেছেন বড় ব্যবধানে।
ঘোষিত ফলে দেখা যায়, বরিশাল জেলায় ভোট পড়েছে ৫৬ দশমিক ৭০ শতাংশ। ২২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৮ জন ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ১২ লাখ ৯২ হাজার ২৩৯ জন।
বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া) আসনে বিজয়ী বিএনপির প্রার্থী জহির উদ্দিন স্বপন পেয়েছেন ৯৯ হাজার ৪১৮ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী কামরুল ইসলাম পেয়েছেন ৪৫ হাজার ১৪০ ভোট। স্বপন জিতেছেন ৫৪ হাজার ২৭৮ ভোটের বিশাল ব্যবধানে। এ আসনে শুরু থেকে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী স্বপন এবং দলটির বহিষ্কৃত নেতা প্রকৌশলী আব্দুস সোবহানের মধ্যে লড়াইয়ের ধারণা ছিল ভোটারদের মধ্যে। কিন্তু লড়াই হয়েছে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। এলাকায় জনপ্রিয় হলেও ফলাফলে তৃতীয় স্থানে রয়েছেন ফুটবল প্রতীক নিয়ে ভোট করা আব্দুস সোবহান। তিনি পেয়েছেন ৪৪ হাজার ১৮৮টি ভোট। বলা হচ্ছে, দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করায় স্থানীয় বিএনপি এবং অনুসারীরা তাকে বর্জন করায় তিনি হেরেছেন।
জানা যায় বরিশাল-১ আসনে আসনে মোট ৩ লাখ ২৩ হাজার ৬৯৮ ভোটারের মধ্যে কাস্ট হয়েছে ২ লাখ ৩৫১ ভোট। এর মধ্যে বাতিল হয়েছে ৪ হাজার ২৭৫টি। ভোটের পড়ার হার ৬২ দশমিক ১১ শতাংশ।
বরিশাল-২ (উজিরপুর-বানারীপাড়া) আসনে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সরদার সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু। তিনি ধানের শীষ প্রতীকে ভোট পেয়েছেন ১ লাখ ৪১ হাজার ২৮০। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর আব্দুল মান্নান পেয়েছেন ৭১ হাজার ৯৮৯ ভোট। সান্টু ৬৯ হাজার ২৯১ ভোটের ব্যবধানে জিতে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। আসনটিতে ইসলামী আন্দোলন বা জামায়াতে ইসলামীর শক্তিশালী প্রার্থী না থাকায় শুরু থেকেই আলোচনায় ছিলেন সান্টু।
বরিশাল-৩ (মুলাদী-বাবুগঞ্জ) আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন। তিনি পেয়েছেন ৮০ হাজার ৯৩০ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার ফুয়াদ পেয়েছেন ৬১ হাজার ১৯২ ভোট। দুজনের মধ্যে ভোটের ব্যবধান ১৯ হাজার ৭৩৮। এ আসনে ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখা ১৬ হাজার ৩২৫ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছে। এ আসনে ভোট পড়েছে ৫৩ দশমিক ৫১ শতাংশ।
বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জ) আসনে বিজয়ী হয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান। তিনি পরাজিত করেছেন জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের দুজন হেভিওয়েট নেতাকে। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ২৮ হাজার ৩২২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর আব্দুল জব্বার পেয়েছেন ৭৪ হাজার ৬৮৪ ভোট। আর ইসলামী আন্দোলনের সহকারী মহাসচিব এছহাক মুহাম্মাদ আবুল খায়ের পেয়েছেন ৩৬ হাজার ৭৫৩ ভোট। ৫৩ হাজার ৬৩৮ ভোটের ব্যবধানে জিতে রাজীব প্রথমবারের মতো এমপি নির্বাচিত হয়েছেন।
বরিশাল-৫ (সদর ও সিটি করপোরেশন) আসনে বিএনপি প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম। চরমোনাই পীরের এ আসনটি এবার ইসলামী আন্দোলনের ঘরে থাকবে গুঞ্জন ছিল। এ আসন নিয়েই জামায়াত-ইসলামী আন্দোলন জোটে ফাটলের সূত্রপাত হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিএনপির ঘাঁটি এ আসনে ধানের শীষের বিজয় হয়েছে।
আসনটিতে বিএনপির প্রার্থী ও দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মজিবর রহমান সরোয়ার ১ লাখ ৩৫ হাজার ১৪৬ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামী আন্দোলনের ফয়জুল করীম পেয়েছেন ৯৫ হাজার ৪৪ ভোট।
ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, আসনটি চরমোনাই পীরকে ছাড় দিয়েছিল জামায়াতে ইসলামী। তারা হাতপাখা প্রতীকের পাশে থাকবে বলে ঘোষণাও দিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জামায়াতকে পাশে পায়নি ইসলামী আন্দোলন।
অন্যদিকে বরিশাল-৬ আসনে ভোটের ফলাফলে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম। আর ধানের শীষ প্রতীকে ৮২ হাজার ২১৭ ভোট পেয়ে দ্বিতীয়বারের মতো আসনটিতে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী আবুল হোসেন খান। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর বরিশাল জেলা সেক্রেটারি মো. মাহামুদুন্নবী তালুকদার ৫৫ হাজার ৯৮৮ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলনের ফয়জুল করীম পেয়েছেন ২৯ হাজার ১৪৬ ভোট।
বরগুনা জেলা: বরগুনার দুটি আসনের একটি বিএনপি এবং অপরটিতে বিজয়ী হয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী। গোটা বিভাগের মধ্যে বরগুনার একটি আসনই পেয়েছে ইসলামী আন্দোলন। বরগুনা-১ (সদর, আমতলী ও তালতলী) আসনে ‘হাতপাখা’ প্রতীকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী কেওড়াবুনিয়ার পীর মাওলানা মাহমুদুল হোসাইন অলিউল্লাহ ১ লাখ ৪০ হাজার ২৯১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির নজরুল ইসলাম মোল্লা পেয়েছেন ১ লাখ ৩৬ হাজার ১৪৫ ভোট। মাত্র ৪ হাজার ১৪৬ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন বিএনপি প্রার্থী।
আসনের ভোটাররা বলছেন, বরগুনার এ আসনটিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জনপ্রিয়তা পূর্বে থেকেই রয়েছে। কেননা আগেও এই আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী সংসদ সদস্য ছিলেন। মূলত ওই এলাকায় কেওড়াবুনিয়ার পীরের পরিবারের আধিপত্য এবং সুনাম কাজে লাগিয়ে একটি আসন পেয়েছে ইসলামী আন্দোলন।
অন্যদিকে বরগুনা-২ (বামনা, বেতাগী ও পাথরঘাটা) আসনে আগে থেকেই আলোচনায় ছিলেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম মণি। এমনকি বিজয়ের শেষ হাসিও হেসেছেন তিনি।
তিনি ৮৯ হাজার ৪২৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. সুলতান আহমেদ পেয়েছেন ৮৩ হাজার ১৫ ভোট।
পটুয়াখালী জেলা: অন্যদিকে পটুয়াখালী জেলার চারটি আসনের মধ্যে একটি হারাতে হয়েছে বিএনপিকে। একটি আসনে বিজয়ী হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী। বিএনপির তিনটির একটিতে বিজয়ী হয়েছেন জোটের প্রার্থী গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর।
পটুয়াখালী-১ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আলতাফ হোসেন চৌধুরী ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ১ লাখ ৫২ হাজার ৮৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. ফিরোজ আলম ‘হাতপাখা’ প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৫৮ হাজার ১৬১ ভোট।
পটুয়াখালী-২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. শফিকুল ইসলাম মাসুদ ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীক নিয়ে ১ লাখ ৭৫০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থী মো. সহিদুল আলম তালুকদার ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৭২ হাজার ৬৭৬ ভোট।
স্থানীয় সচেতন ভোটাররা জানিয়েছেন, বরিশাল বিভাগে বিএনপি থেকে যারা মনোনয়ন পেয়েছেন তাদের মধ্যে সর্ব জ্যেষ্ঠ প্রার্থী সহিদুল আলম তালুকদার। আসনটিতে বিএনপির পরাজয়ের এটা অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন ভোটাররা। তা ছাড়া শুরু থেকেই আসনটিতে আলোচনায় ছিলেন জামায়াতের প্রার্থী ডা. শফিকুল ইসলাম মাসুদ। আসনটি ছিল আওয়ামী লীগের ঘাঁটি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ না থাকলেও তাদের অনুসারী ভোটারদের নীরব সমর্থন পেয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী। এ কারণে জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছতে বেগ পেতে হয়নি ডা. শফিকুল ইসলাম মাসুদকে।
পটুয়াখালী-৩ আসনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরকে নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন তার দলের নেতাকর্মীরা। কেননা, আসনটিতে নুরের বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন হাসান মামুন। এ কারণে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য পদ থেকে তিনি বহিষ্কারও হয়েছেন। এরপরও স্থানীয় বিএনপি দুইভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। যে কারণে নুরের বিজয় নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন স্থানীয় ভোটাররা। তবে সব শঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে ৯৭ হাজার ৩২৩ ভোট পেয়ে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন নুরুল হক নুর।
তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. হাসান মামুন পেয়েছেন ৮১ হাজার ৩৬১ ভোট। সেই হিসেবে ১৫ হাজার ৯৬২ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন গণঅধিকারের নুর। এই আসনে প্রদত্ত ভোটের হার ৬৩ দশমিক ১৫ শতাংশ।
পটুয়াখালী-৪ আসনে বিএনপি প্রার্থী এ বি এম মোশাররফ হোসেন ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ১ লাখ ১৪ হাজার ১৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মোস্তাফিজুর রহমান পেয়েছেন ৭০ হাজার ১২৭ ভোট। হিসাব অনুযায়ী, ৫৮ হাজার ৭১৪ ভোটে বিজয়ী হয়েছেন এবিএম মোশাররফ। এ আসনে ভোটের হার ছিল সর্বোচ্চ ৬৮ দশমিক ০১ শতাংশ।
পিরোজপুর জেলা:
পিরোজপুর জেলার সংসদীয় তিনটি আসনের মধ্যে একটি হারতে হয়েছে বিএনপিকে। ওই আসনে বিজয়ী হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাসুদ সাঈদী। এ জেলায় মোট ১০ লাখ ৩১ হাজার ৩৩ জন ভোটারের মধ্যে ৬ লাখ ৬ হাজার ৯৮৯ জন ভোট দিয়েছেন।
জানা গেছে, পিরোজপুর-১ (সদর-নাজিরপুর-ইন্দুরকানী) আসনের নির্ধারিত ১৬৮টি কেন্দ্রে ২৫ হাজার ৫৫৪ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন সাবেক এমপি প্রয়াত মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর জ্যেষ্ঠপুত্র মাসুদ সাঈদী। এই আসনে তিনি ১ লাখ ৩২ হাজার ৬৫৯ ভোট পেয়েছেন। তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আলমগীর হোসেন পেয়েছেন ১ লাখ ৭ হাজার ১০৫ ভোট।
স্থানীয়রা বলছেন, পিরোজপুর-১ আসনে আগে থেকেই জামায়াতে ইসলামীর আধিপত্য রয়েছে। এ কারণে ওই আসনে প্রার্থী দেয়নি ইসলামী আন্দোলন। আসনটিতে জামায়াতের হয়ে এক সময় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। এ ছাড়া উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন মাসুদ সাঈদী নিজে। যে কারণে স্থানীয় সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও জনপ্রিয়তা রয়েছে সাঈদী পুত্র মাসুদের।
অন্যদিকে, পিরোজপুর-২ (ভাণ্ডারিয়া-কাউখালী-নেছারাবাদ) আসনে নির্ধারিত ১৬৭টি কেন্দ্রে ১ লাখ ৫ হাজার ১৮৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও ভাণ্ডারিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি আহম্মদ সোহেল মঞ্জুর সুমন। তার নিকটতম প্রার্থী জামায়াতে ইসলামীর শামীম সাঈদী পেয়েছেন ৯৬ হাজার ৮৯৭ ভোট। মাত্র ৮ হাজার ২৮৮ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন আহম্মদ সোহেল মঞ্জুর।
পিরোজপুর-৩ (মঠবাড়িয়া) আসনে নির্ধারিত ৮৬টি কেন্দ্রে ধানের শীষ প্রতীকে ৬৩ হাজার ৭৯১ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক রুহুল আমিন দুলাল। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় জোট সমর্থীত এনসিপির (শাপলা কলি) প্রার্থী ড. শামীম হামিদী পেয়েছেন ৩৬ হাজার ৬১৬ ভোট। এ ছাড়া আসনটির সাবেক সংসদ সদস্য রুস্তুম আলী ফরাজী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৩৫ হাজার ৯৬৮ ভোট। সেই হিসাবে ২৭ হাজার ১০৫ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির রুহুল আমিন দুলাল।
ঝালকাঠি জেলা:
ঝালকাঠি জেলার দুটি আসনে প্রদত্ত ভোটের হার ৫৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। জেলার দুটি আসনেই বিজয়ী হয়েছে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা। নির্বাচনের পুরোটা সময়জুড়ে আলোচনায় থাকা জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. ফয়জুল হক পরাজিত হয়েছেন ৬ হাজার ৮৯০ ভোটের ব্যবধানে।
জানা গেছে, ঝালকাঠি-১ (রাজাপুর -কাঁঠালিয়া) আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ৬২ হাজার ১০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী রফিকুল ইসলাম জামাল। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ড. ফয়জুল হক ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৫৫ হাজার ১২০ ভোট। পরাজিত হয়েছেন ৬ হাজার ৮৯০ ভোটের ব্যবধানে। ব্যবধানটা কম হলেও ধর্ম নিয়ে বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য আলোচিত এই প্রার্থীর পরাজয়ের কারণ হিসেবে দেখছেন ভোটাররা।
অপরদিকে ঝালকাঠি-২ (সদর-নলছিটি) আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন সাবেক এমপি ইসরাত সুলতানা এলেন ভুট্টো। তিনি বিভাগের ২১ আসনের মধ্যে বিএনপি মনোনীত একমাত্র নারী প্রার্থী ছিলেন। তিনি ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ১৩ হাজার ৪১৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী শেখ নেয়ামুল করিম ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকে পেয়েছেন ৭০ হাজার ৫৫৬ ভোট। ৪২ হাজার ৮৬৩ ভোটের বিশাল ব্যবধানে ধানের শীষের কাছে হেরেছেন তিনি।
ভোলা জেলা:
বরিশাল জেলার মতো দ্বীপজেলা ভোলাতেও নিরঙ্কুশ বিজয় পেয়েছে বিএনপি। জেলার সংসদীয় চারটি আসনেই ধানের শীষ এবং জোটের প্রতীক গরুর গাড়ি বিজয়ী হয়েছে।
এর মধ্যে ভোলা-(সদর) আসনে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপি সমর্থিত বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ। তিনি গরুর গাড়ি প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ৩ হাজার ২৭০ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম পেয়েছেন ৭২ হাজার ৪৭১ ভোট। ৩০ হাজার ৭৯৯ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ।
ভোলা-২ (দৌলতখান-বোরহানউদ্দিন) আসনে বিএনপির মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী হাফিজ ইব্রাহিম পেয়েছেন ১ লাখ ২১ হাজার ৫ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মুফতি মাওলানা ফজলুল করীম দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছেন ৯৩ হাজার ৪৯৮ ভোট। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী আলহাজ্ব হাফিজ ইব্রাহিম ২৭ হাজার ৫০৭ ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত হয়েছেন।
ভোলা-৩ (লালমোহন-তজুমদ্দিন) আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ৫১ হাজার ৭৭৪ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় জোট (পিডিএফ) প্রার্থী নিজামুল হক নাঈম ফুলকপি প্রতীকে পেয়েছে ৫৫ হাজার ৬৬০ ভোট। ৯৬ হাজার ১১৪ ভোটের বিশাল ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির হাফিজ উদ্দিন আহমেদ।
ভোলা-৪ (চরফ্যাসন-মনপুরা) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও যুবদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৯০ হাজার ৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যক্ষ মোস্তফা কামাল দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছেন ৮২ হাজার ৩৯৮ ভোট। ১ লাখ ৮ হাজার ৭ ভোটের বিশাল ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী নুরুল ইসলাম নয়ন।
এদিকে- ভোটাররা বলছেন, ভোটের ফলাফলে বরিশাল বিভাগের প্রতিটি আসনেই ইসলামী আন্দোলন এবং জামায়াতে ইসলামীর বিপর্যায় ঘটেছে। যেই তিনটি আসনে বিজয়ী হয়েছে সেখানে জয়-পরাজয়ে ভোটের ব্যবধানও অনেক কম।
ভোটারদের মতে বরিশাল অঞ্চল বিএনপির পুরোনো ঘাঁটি। এখানে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী বা ইসলামী আন্দোলনের এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অবস্থান সৃষ্টি করতে পারেনি কোনো দল। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসলামিক দুটি দল জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করলে বিজয়ের পরিসংখ্যানটা আরও কিছুটা দীর্ঘ হতে পারত বলে মনে করেন ভোটাররা।
সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক
| শেয়ার করতে ক্লিক করুন: | Tweet |

