| ২১ March ২০২৬ Saturday ৭:৪০:৫১ PM | |
নগর প্রতিনিধি:

ঈদ মানে আনন্দ, ভাগাভাগি আর মানুষের প্রতি মানুষের টান। সেই চিরচেনা উৎসবের আবহে বরিশালে একটু ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)। নিজেদের পরিসরে নয়, বরং সমাজের প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিতে তারা আয়োজন করেছে ‘মানবতার ঈদ উৎসব’, যেখানে উৎসবের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল শ্রমজীবী, ভাসমান ও ছিন্নমূল মানুষ।
বাসদ নেতারা বলেন, পাঁচ বছর ধরে তাঁরা এই মানবতার ঈদ উৎসবের আয়োজন করছেন। এবার এটি ষষ্ঠ আয়োজন। মূলত সবার মধ্যে ঈদের উৎসবকে ছড়িয়ে দিতেই এমন আয়োজন করা হচ্ছে।
ঈদের দিন সকালে নগরের ফকিরবাড়ি সড়কে জেলা বাসদ কার্যালয়ে শুরু হয় এই আয়োজন। সেখানে অনুষ্ঠিত হয় শুভেচ্ছা বিনিময় ও আপ্যায়ন অনুষ্ঠান, যেখানে শতাধিক শ্রমজীবী মানুষ অংশ নেন। দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আয়োজনও পায় বিস্তৃতি। বেলা একটা থেকে শুরু হয়ে সাড়ে তিনটা পর্যন্ত চলে রান্না করা খাবার বিতরণ।
শুধু একটি স্থানে সীমাবদ্ধ না থেকে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়া হয় এই মানবিক উদ্যোগ। নগরের কাউনিয়া এলাকায় একটি বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে শতাধিক বৃদ্ধ নারী-পুরুষের হাতে তুলে দেওয়া হয় খাবার। এরপর বাসদের নেতা-কর্মীরা ছড়িয়ে পড়েন শহরের নানা এলাকায়—নদীবন্দর, ভাটার খাল, সদর রোডসহ বিভিন্ন স্থানে। সেখানে দুই শতাধিক পথশিশু, ভবঘুরে এবং আরও দুই শতাধিক অসচ্ছল মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হয় রান্না করা খাবার।
খাবারের তালিকায় ছিল উৎসবের পরিচিত স্বাদ—পোলাও, রোস্ট, ডিম ও সেমাই। তবে এই খাবারের সঙ্গে ছিল আরও বড় কিছু—মানুষের পাশে থাকার এক নিঃশব্দ প্রতিশ্রুতি।
লঞ্চঘাট এলাকায় খাবার পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ভবঘুরে আলতাফ হোসেন। তাঁর কণ্ঠে ধরা পড়ে জীবনের কঠিন বাস্তবতা—
‘ঈদের দিন সবাই ভালোমন্দ খায়। আমাগো তো হেইয়্যা খাওনের সামর্থ্য নাই। তবু হ্যারা (বাসদ) মোগো কষ্টের কতা মনে কইর্যা ভালোমন্দ খাওন দিছে। না পাইলে ঈদের দিনও না খাইয়া থাহন লাগত।’
এই আয়োজনের পেছনে ছিল কয়েক দিনের প্রস্তুতি। গত শুক্রবার রাত থেকেই শুরু হয় রান্নার কাজ। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেও থেমে থাকেননি আয়োজকেরা। এতে স্বেচ্ছাশ্রম দেন ছাত্র ফ্রন্ট, শ্রমিক ফ্রন্ট, বাসদের বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীরা।
রান্নার কাজে স্বেচ্ছাশ্রমে নিয়োজিত বাবুর্চি কাওসার হোসেন বলেন, ‘ঈদের আগের দিন আমাদের পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ থাকলেও কয়েক বছর ধরে স্বেচ্ছায় এই কাজে যুক্ত হয়েছি। শ্রমজীবী আর দুস্থ মানুষের সঙ্গে একসঙ্গে ঈদ উদ্যাপন করতে পারায় সত্যিই অন্য রকম এক ভালো লাগা কাজ করে।’
ছাত্র ফ্রন্টের জেলা সদস্য মো. রাকিব বলেন, কয়েক বছর ধরে এই উদ্যোগে যুক্ত থেকে মানবতার জন্য কাজ করার একধরনের তৃপ্তি অনুভব করছেন তাঁরা।
দিনভর এ কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন বাসদ বরিশাল জেলা শাখার সমন্বয়ক মনীষা চক্রবর্তী, কেন্দ্রীয় বর্ধিত ফোরামের সদস্য ইমাম হোসেন, জেলা শাখার সদস্য শহিদুল শেখ, বেল্লাল গাজী, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট বরিশাল মহানগর শাখার আহ্বায়ক সুজন আহমেদ, সদস্যসচিব ফারজানা আক্তার প্রমুখ।
মনীষা চক্রবর্তী জানান, ছয় বছর ধরে ঈদের দিন তাঁরা এই মানবতার ঈদ উৎসবের আয়োজন করছেন। তবে বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে তিনি মনে করেন, এমন উদ্যোগ আরও বড় পরিসরে হওয়া প্রয়োজন। তাঁর মতে, ঈদসহ সব উৎসবে অসচ্ছল মানুষের জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ থাকা জরুরি এবং তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করা উচিত।
ভবিষ্যতেও এই আয়োজন চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে মনীষা বলেন, এর পরিধি আরও বাড়ানো হবে, যাতে সমাজের আরও বেশি মানুষের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেওয়া যায়। একই সঙ্গে যাঁরা স্বেচ্ছাশ্রম ও আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন, তাঁদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
বরিশালের এই ছোট্ট উদ্যোগ তাই শুধু একটি দিনের আয়োজন নয়, এটি হয়ে উঠেছে সহমর্মিতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা আর মানবিকতার এক জীবন্ত উদাহরণ।
সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক
| শেয়ার করতে ক্লিক করুন: | Tweet |


