বরফ কলে ভয়ঙ্কর অ্যামোনিয়া গ্যাস, ঝুঁকিপূর্ণ ঘনবসতি আতঙ্কে বসবাস

বরফ কলে ভয়ঙ্কর অ্যামোনিয়া গ্যাস, ঝুঁকিপূর্ণ ঘনবসতি আতঙ্কে বসবাস

২৫ November ২০২৫ Tuesday ৫:২৫:৩১ PM

Print this E-mail this


পটুয়াখালী প্রতিনিধি:

বরফ কলে ভয়ঙ্কর অ্যামোনিয়া গ্যাস, ঝুঁকিপূর্ণ ঘনবসতি আতঙ্কে বসবাস

পটুয়াখালীতে অনুমোদন ও নিরাপত্তাহীনভাবে গড়ে উঠেছে শত শত বরফ কল। এর বেশির ভাগই চালানো হচ্ছে ঘনবসতি, বাজার, স্কুল-কলেজ এবং মৎস্য ঘাটের পাশেই। নাইট্রোজেন এবং হাইড্রোজেনের সমন্বয়ে গঠিত ভয়ঙ্কর অ্যামোনিয়া গ্যাস ভিত্তিক এসব বরফ কলের কোনো পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই, এমনকি নেই ন্যূনতম নিরাপত্তা ব্যবস্থাও।

সম্প্রতি এক বিস্ফোরণের ঘটনায় অন্তত ২০ জন আহত হওয়ার পর পুরো এলাকায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

বরফ কল যেন গজিয়ে ওঠা শিল্প

পটুয়াখালীর মহিপুর–আলিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ঘিরেই রয়েছে প্রায় শতাধিক বরফ কল। প্রতিদিন হাজার হাজার টন মাছ পরিবহনের কারণে বরফের চাহিদা থাকলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই গড়ে উঠেছে পরিকল্পনা ও সরকারি তদারকি ছাড়াই। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, দিনরাত শোনা যায় যন্ত্রের বিকট শব্দ। অ্যামোনিয়ার তীব্র গন্ধে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কায় মানুষজন আতঙ্কে থাকেন। 

বরফ কল শ্রমিকদেরও অভিযোগ, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ সঠিকভাবে না হওয়ায় ঝুঁকি বাড়ছে প্রতিদিন। এখনকার মালিকরা শুধু উৎপাদন বাড়াতে চায়। নিরাপত্তা নিয়ে ভাবেন না।’

সাম্প্রতিক বিস্ফোরণে ২০ জন আহত

গত ২৩ অক্টোবর মহিপুরের গাজী আইস প্ল্যান্টে কন্ডেনসার লাইনে হঠাৎ লিকেজ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে তীব্র অ্যামোনিয়া গ্যাস। রাতে বরফ কলের বাইরের একটি কন্ডেনসার পাইপ হঠাৎ লিকেজ হয়ে গেলে মুহূর্তেই চারপাশে তীব্র দুর্গন্ধ ও গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে। এতে বরফ কলের আশপাশে থাকা শ্রমিক ও এলাকাবাসীর শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। খবর পেয়ে কলাপাড়া ফায়ার সার্ভিসের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে বরফ কলের ভেতরে আটকে পড়াদের উদ্ধার করে। এতে ২০ জন আহত হন। এর ভেতর গুরুতর আহত পাঁচ জেলেকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

গ্যাস ছড়ানোর পর পুরো এলাকা ফাঁকা হয়ে যায়। আতঙ্কিত মানুষ ঘর ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। স্থানীয়দের দাবি, বৈধ অনুমোদন নেই এমন বরফ কলে এমন দুর্ঘটনা প্রায়ই ঘটে।

পরিবেশকর্মীদের উদ্বেগ

উপকূলীয় পরিবেশকর্মীরা বলছেন, জনবসতিতে অনুমোদনহীন অ্যামোনিয়া ভিত্তিক বরফ কল শুধু পরিবেশ দূষণের উৎসই নয়, এটি পুরো এলাকাকে এক ধরনের ‘টাইম বোম্ব’-এর ওপর দাঁড় করিয়ে রেখেছে।

উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের (উপরা) আহ্বায়ক কে.এম. বাচ্চু বলেন, ‘অ্যামোনিয়া একটি উচ্চমাত্রার বিষাক্ত ও দাহ্য গ্যাস। গ্যাস লিক বা পাইপ ফেটে গেলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। এতে শ্বাসকষ্ট, চোখ জ্বালা, ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, এমনকি অজ্ঞান হয়ে মৃত্যুঝুঁকিও তৈরি হয়। অথচ এসব বরফ কলের ভেতরে সুরক্ষা ব্যবস্থা বলতে কিছু নেই। সিস্টেম লিক ডিটেকশন নেই, নেই ইমার্জেন্সি কন্ট্রোল রুম। যন্ত্রপাতিগুলোও পুরনো ও অদক্ষ টেকনিশিয়ানের হাতে পরিচালিত।’

তিনি আরও বলেন, ‘জনবসতিতে এসব বরফ কল স্থাপন করা পরিবেশ আইন–১৯৯৫ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা–১৯৯৭ এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আইন অনুযায়ী অ্যামোনিয়া গ্যাসভিত্তিক প্ল্যান্টকে ‘রেড ক্যাটাগরি’ শিল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যার ছায়াতেই অনুমোদন ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান চালুর সুযোগ নেই। কিন্তু এ অঞ্চলে যেভাবে নির্বিচারে বরফ কল গড়ে উঠেছে, তা প্রশাসনিক ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

একই সংগঠনের যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল হোসেন রাজু বলেন, মহিপুর–আলিপুরের মতো ঘনবসতি এলাকায় দুর্ঘটনা ঘটলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কয়েকগুণ বেশি হবে। কারণ অ্যামোনিয়া গ্যাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়ার সময় তীব্র বিষাক্ততা তৈরি করে। ২০০–৩০০ মিটার এলাকার মানুষ সরাসরি ঝুঁকিতে পড়ে এবং কয়েক মিনিটের মধ্যে শ্বাস নিতে না পেরে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। এই ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ করতে স্থানীয় ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা পর্যাপ্ত নয়।

তিনি আরও বলেন, ‘অধিকাংশ বরফ কলেই নেই নিরাপদ বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থা। অ্যামোনিয়ার অবশিষ্ট পানি ও রাসায়নিক মিশ্রিত বর্জ্য প্লান্টের পাশেই খালে ফেলায় পার্শ্ববর্তী পানি দূষিত হচ্ছে। এতে মাছের জীবনচক্র ও স্থানীয় পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।’

পটুয়াখালী পরিবেশ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক লোভানা জামিল বলেন, ‘আইন অনুযায়ী বিপজ্জনক রাসায়নিক ব্যবহারের যেকোনো শিল্প স্থাপনে পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক। কিন্তু পটুয়াখালীর বরফ কলগুলোর অধিকাংশই কোনো অনুমোদন ছাড়াই চলছে। জনবসতি এলাকায় অ্যামোনিয়া গ্যাসভিত্তিক বরফ কলে কোনোভাবেই ছাড়পত্র দেয়া হয় না। অনুমোদন ছাড়া এসব প্রতিষ্ঠান চালানো আইনবিরোধী। আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব।’

কলাপাড়া ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের সাব–অফিসার মো. আবুল হোসেন বলেন,  অ্যামোনিয়া সিলিন্ডারের নিরাপত্তা মানছে না বেশির ভাগ বরফ কল। যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে পদক্ষেপ নেব।’

যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা

বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যামোনিয়া গ্যাস লিক হলে কয়েক মিনিটের মধ্যে ২০০–৩০০ মিটার এলাকার মানুষ শ্বাসকষ্ট, চোখ জ্বালা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে পড়ে। এসব ঝুঁকি জেনেও বরফ কল মালিকেরা এখনও জনবসতি এলাকাতেই স্থাপন চালিয়ে যাচ্ছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ- প্রশাসন, পরিবেশ অধিদফতর ও ফায়ার সার্ভিসের সমন্বিত নজরদারি না থাকায় বরফ কল মালিকরা নির্বিঘ্নে আইন ভঙ্গ করছেন।

সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক


শেয়ার করতে ক্লিক করুন:

Explore More Districts