বরগুনায় খুরা রোগের প্রাদুর্ভাব: ওষুধ সংকটে মরছে গরু

বরগুনায় খুরা রোগের প্রাদুর্ভাব: ওষুধ সংকটে মরছে গরু

২৪ June ২০২৬ Wednesday ১:৫৫:১৭ PM

Print this E-mail this


বরগুনা প্রতিনিধি:

বরগুনায় খুরা রোগের প্রাদুর্ভাব: ওষুধ সংকটে মরছে গরু

বরগুনা সদর উপজেলার এম বালিয়াতলী ইউনিয়নের মনসাতলী গ্রামের মিলন চন্দ্রের ৬টি গরুর সবগুলোই খুরা রোগে আক্রান্ত হয়েছে। স্থানীয় পদ্ধতি এবং চিকিৎসকের পরামর্শে চলছে চিকিৎসা। ঝামেলাপূর্ণ এই খুরা রোগের চিকিৎসা করাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তার। এতে চরম বেকায়দায় পড়েছেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘আমি প্রায় ৪০ বছর ধরে গরু পালন করি। এ বছর প্রায় ১ মাস ধরে আমার গরুগুলো খুরা রোগে আক্রান্ত হয়েছে। শুধু আমার নয়, আশপাশের প্রায় সকলের গরুই একই রোগে আক্রান্ত। পশু হাসপাতাল থেকে চিকিৎসার জন্য কোনো ওষুধ পাচ্ছি না। বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করে ওষুধ কিনে চিকিৎসা করাতে হচ্ছে। গরুর পেছনে সময় দিতে গিয়ে এখন অন্য কোনো কাজও করতে পারছি না।’

মিলন চন্দ্র রায়ের স্ত্রী শিপু রানী বলেন, ‘গত একমাস ধরে খুরা রোগে আক্রান্ত হয়ে আমাদের ছয়টি গুরু অসুস্থ। আমরা গরিব মানুষ, গরুর চিকিৎসা করাতে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু সরকারিভাবে কোনো ধরনের সহযোগিতা পাইনি। বাজার থেকে বেশি দামে ওষুধ কিনতে হচ্ছে আমাদের।’

শুধু মিলন চন্দ্র নয়, বরগুনার অধিকাংশ গবাদিপশু এখন খুরা রোগে আক্রান্ত। গবাদি পশু লালন পালনকারীরা জানান, জেলাজুড়ে খুরারোগ মহামারী আকার ধারণ করেছে। আক্রান্ত গরুর মুখে ও পায়ে ঘা দেখা দেওয়ায় ঠিকমতো চলাফেরা করে পারছে না এবং খাবার খেতে পারছে না গরু। ইতোমধ্যেই জেলায় শতাধিক গরুর মৃত্যু হয়েছে। খুরা রোগের পাশাপাশি দেখা দিয়েছে লাম্পি স্ক্রিন ডিজেজও। সরকারি কোনো ওষুধ না পাওয়ার পাশাপাশি ওষুধ সরবরাহে ঘাটতি এবং অতিরিক্ত দামে ওষুধ কেনার অভিযোগ তাদের।

জেলায় কতগুলো গবাদিপশু খুরা রোগে আক্রান্ত হয়েছে এবং কতগুলোর মৃত্যু হয়েছে, এর সঠিক পরিসংখ্যান নেই প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে। 

তবে সংশ্লিষ্টরা জানান, কোরবানির পরপর এই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। তাই একমাস আগে খুরা রোগের ভ্যাকসিনের চাহিদা দেয়া হলেও এখনো সরবরাহ করা হয়নি। এছাড়া জনবল সংকটে এ রোগের চিকিৎসা দিতে হিমসিম অবস্থা তাদের। গত ২৪ মে খুরা রোগের ভ্যাকসিনের চাহিদা দিয়েছে জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। আগামী ১ জুলাই বরগুনায় এ ভ্যাকসিন সরবরাহ করার কথা রয়েছে।

মনসাতলী এলাকার আরেক বাসিন্দা মো. মাহমুদুল ইসলাম বলেন, ‘এ বছর আমাদের এলাকার অসংখ্য গরু খুরা রোগে আক্রান্ত হয়েছে। তবে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে বড় গরু মারা না গেলেও এলাকার বাসিন্দাদের ৩ থেকে ৪ টি ছোট গরুর মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়াও চিকিৎসকরা গ্রামে আসেন না। তাদের কাছে গেলে যে ওষুধ লিখে দেওয়া হয় তাও কিনতে হয় বাইরের দোকান থেকে। বর্তমান খুরা রোগের কোনো ভ্যাকসিনই পাওয়া যাচ্ছে না।’

মো. নাসির নামে আরেক পশু লালনপালনকারী বলেন, ‘প্রথমে আমার একটি গরু রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। একদিন পরে আমার পাঁচটি গরু আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। আক্রান্ত হওয়ার একদিনের মধ্যে ছোট একটি গরু মারা যায়। এরপর চিকিৎসক অন্য গরুগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ লিখে দিলেও সরবরাহ না থাকায় সরকারিভাবে গরুর জন্য কোনো ওষুধ পাইনি। সকল ওষুধ বাইরে থেকে কিনে চিকিৎসা করাতে হয়েছে।’

এ বিষয়ে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘খুরা রোগ সাধারণত বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। মানুষের সংস্পর্শের মাধ্যমেও এ রোগ সুস্থ পশুর মধ্যে ছড়াতে পারে। কোরবানির সময় এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পশু নিয়ে যাওয়া হয়। সাধারণত ওই সময়ের পরই খুরা রোগের বিস্তার ঘটে৷ আমাদের কাছে থাকা রিপোর্ট অনুযায়ী বর্তমানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অবস্থায় বিভিন্ন এলাকায় এ রোগ দেখা দিয়েছে। খামারিদের ভ্যাকসিনের পাশাপাশি আক্রান্ত পশুকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা এবং আক্রান্ত ওই পশুটিকে অন্য পশু থেকে আলাদা রাখার পরামর্শ দিচ্ছি। এ রোগে আক্রান্ত হলে বড় পশুর মৃত্যু হয় না। ছয় মাস থেকে এক বছর বয়সী কিছু পশুর মৃত্যু হতে পারে।’

ভ্যাকসিন সরবরাহ নেই এবং ওষুধ সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের এই মুহূর্তে কোনো ভ্যাকসিন মজুত নেই। কোরবানির আগে ভ্যাকসিনের চাহিদা পাঠানো হয়েছে। জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহেই আমরা ভ্যাকসিন পাবো এবং পাওয়ার সাথে সাথেই আমাদের ভ্যাকসিন কার্যক্রম শুরু করা হবে। এখন আমরা খামারিদের প্রয়োজনীয় ওষুধ খাওয়ানোসহ বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দিচ্ছি। তবে এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।’

সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক


শেয়ার করতে ক্লিক করুন:

Explore More Districts