রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণের মাত্র এক মাসের ভেতর প্রতিশ্রুত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণ শুরু করছে বিএনপি সরকার। পাইলট প্রকল্প হিসেবে প্রথম ধাপে চট্টগ্রামসহ সারা দেশের ৩৭ হাজার ৫৬৭ পরিবারকে দেয়া হবে এ ফ্যামিলি কার্ড। এর মধ্যে রয়েছে নগরের ৪১ নং দক্ষিণ পতেঙ্গা ওয়ার্ডের ৫ হাজার ৫৭৫ পরিবারও। পরিবারের নারী প্রধানের নামে দেয়া হবে এ কার্ড।
জানা গেছে, আজ সকাল ১০ টায় রাজধানীর বনানী টিএন্ডটি খেলার মাঠে (কড়াইল বস্তি সংলগ্ন) ফ্যামিালি কার্ড–এর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এদিকে একইসময়ে নগরের বিমানবন্দর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ প্রাঙ্গণে চট্টগ্রামের ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করা হবে। এ অনুষ্ঠানে প্রথম ধাপের জন্য চট্টগ্রাম থেকে চূড়ান্ত হওয়াদের মধ্য থেকে ৬৮০ জনের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেয়া হবে। বাকিদের মাঝে আগামীকাল চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) ওয়ার্ড কার্যালয় থেকে বিতরণ করা হবে।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ফ্যামিলি কার্ড প্রদানের জন্য গত ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২ মার্চ পর্যন্ত দক্ষিণ পতেঙ্গা ওয়ার্ডের ১১ হাজার ৬০৩ খানা’য় জরিপ করা হয়। জরিপকারীরা প্রতিটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবারের আর্থ–সামাজিক অবস্থা, সদস্য সংখ্যা, শিক্ষা, বাসস্থান, পরিবারে ব্যবহৃত আসবাব ও গৃহস্থালী সামগ্রী (টিভি, ফ্রিজ, কম্পিউটার, মোবাইল ইত্যাদি), রেমিট্যান্স প্রবাহ ইত্যাদি তথ্য সংগ্রহ করেছে। সংগৃহীত তথ্যগুলো সরকারের কমিটি কর্তৃক যাচাই–বাছাই করা হয়েছে।
এর মধ্যে এন্ট্রি করা হয় ১০ হাজার ১২৪ পরিবার। জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকা, জন্মনিবন্ধন দিয়ে আবেদন করা এবং স্বামী বা স্ত্রী উভয়ের এনআইডি ৪১ নং ওয়ার্ডের বাইরের ঠিকানার হওয়ায় ১ হাজার ৪৭৯ পরিবার ডাটা এন্ট্রি থেকে বাতিল হয়ে যায়। এরপর এন্ট্রিকৃত ১০ হাজার ১২৪ পরিবারের মধ্যে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে সফটওয়ারের মাধ্যমে ‘প্রঙি মিনস টেস্ট (পিএমটি)’ বা দারিদ্র সূচক মান নির্ণয়ের মাধ্যমে স্কোর করে ৫ হাজার ৫৭৫ পরিবার নির্বাচন করা হয়। দক্ষিণ পতেঙ্গা ওয়ার্ডে জরিপ কার্যক্রমে অংশ নেন ৯৬২ জন জরিপকারী। ছিলেন ৩০ জন সুপারভাইজারও।
সংশ্লিষ্টরা জানান, পিএমটি স্কোর করে অতিদরিদ্র, দরিদ্র এবং ঝুঁকিপূর্ণ মধ্যবিত্ত পরিবার বাছাই করা হয়। সমগ্র প্রক্রিয়াটি সফটওয়ারের মাধ্যমে করার ফলে উপকারভোগী নির্বাচনে কোনো দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ম্যানুয়েল হস্তক্ষেপেরও সুযোগ ছিল না। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় যোগ্য উপকারভোগীগণ পাইলটিং পর্যায়ে মাসিক আড়াই হাজার টাকা হারে ভাতা প্রাপ্ত হবেন এবং পরবর্তীতে সমমূল্যের খাদ্যপণ্য সহায়তা প্রদানের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। পাইলটিং পর্যায়ে ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আগামী চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সময়ের জন্য ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। যার মধ্যে ২৫ কোটি ১৫ লণাখ টাকা সরাসরি নগদ সহায়তা প্রদান এবং ১২ কোটি ৯২ লাখ টাকা কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তথ্য সংগ্রহ, অনলাইন সিস্টেম প্রণয়ন, কার্ড প্রস্তুতি ইত্যাদিতে ব্যবহার করা হবে।
জানা গেছে, বৈষম্যহীন আর্থ–সামাজিক উন্নয়ন ও টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে বিএনপি’র নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল সামাজিক সুরক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়ন। সামাজিক সুরক্ষায় দেশের প্রতিটি পরিবারকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেয়ার বিষয়টি অর্ন্তভুক্ত ছিল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে। পরিবারের নারী প্রধানের নামে এ ফ্যামিলি কার্ড দেয়ার কথা বলা হয় বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে। পরবর্তীতে সরকার গঠনের দ্বিতীয় দিন গত ১৯ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে প্রধান করে ১৫ সদস্যের একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ বিষয়ে জারি করা প্রজ্ঞাপন বলা হয়, রোজার ঈদের আগেই ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।
ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা প্রসঙ্গে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, প্রথমে আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে পরা হতদরিদ্র পরিবারের নারী প্রধানকে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় আনা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে প্রত্যেক মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের নারী প্রধানের কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে। তিনি বলেন, নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর অধিকার, মর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায় অর্জনের বিষয়টি সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার। তাই প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সুফল দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে পরিবারের নারী প্রধানের নামে ফ্যামিলি কার্ড প্রদানের যুগান্তকারী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছেন।
এদিকে গতকাল সোমবার অর্থমন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলন করে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ ও বাস্তবায়ন কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
ফ্যামিলি কার্ড বিষয়ে জানতে চাইলে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন আজাদীকে বলেন, বিএনপি’র যে ৩১ দফা প্রশ্রিুতি ছিল তার মধ্যে অগ্রাধিকার দিয়ে ৮টি বের করা হয়। এই ৮টার মধ্যে অন্যতম ছিল খাল খনন কর্মসূচি, ফ্যামিলি হেলথ কার্ড, কৃষক কার্ড এবং বৃক্ষ রোপণ।
তিনি বলেন, আমরা সবেচেয়ে বেশি প্রায়োরিটি দিচ্ছি নারীদেরকে। কারণ আমাদের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। আমরা চাচ্ছি, ফরমাল বা ইনফরমাল ইকোনমির বাইরে যারা আছেন তাদেরকে আমাদের অর্থনৈতিক কর্র্মকাণ্ডে সনম্পৃক্ত করতে এবং ওনাদেও ক্ষমতায়ন করতে। সেটার উদ্যোগ হিসেবেই ফ্যামিলি কার্ড এর যাত্রাটা শুরু। প্রধানমন্ত্রীও এটাকে খুবই গুরুত্ব সহকারে দেখছেন। আমরা বিশ্বাস করি, আগামী ৫ বছরে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে নারীদের সামাজিকভাবে এবং অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপক উন্নতি সাধন হবে।
ক্ষমতাগ্রহণের দ্রুত সময়ের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড এর প্রতিশ্রুতি বাস্বতবায়ন করা কীভাবে সম্ভব হচ্ছে? এমন প্রশ্নে মীর হেলাল বলেন, প্রধানমন্ত্রী ৯টার মধ্যে অফিসে আসেন এবং সারা দিন কাজ করেন। মন্ত্রিপরিষদ সদস্য এবং সংসদ সদস্যদের কার্যক্রম সার্বক্ষণিক তদারকি করছেন। কাজেই এখানে অগ্রগতি হওয়া ছাড়া উপায় নেই।
এ দিকে ফ্যামিলি কার্ড দেয়ার নগরের দক্ষিণ পতেঙ্গা ওয়ার্ডে জরিপ কার্যক্রম মনিটিরং করেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা প্রণয় চাকমা। তিনি আজাদীকে বলেন, খানা জরিপ করে ৪১ নম্বর ওয়ার্ডে আমরা ১০ হাজার ১২৪ জনের তালিকা করেছি। এর মধ্যে পিএমটি স্কোরিং অনুযায়ি ৫ হাজার ৫৭৫ জনকে চূড়ান্ত করা হয়; প্রথম ধাপে তাদেরকে ফ্যামিলি কার্ড দেয়া হবে।
তিনি বলেন, এলাকায় মাইকিং করা হয়েছে এবং মসজিদে রিফলেট বিতরণ করা হয়; যাতে জরিপের সময় সবাই বাড়িতে থেকে তথ্য দেন। আমরা প্রত্যেককে কাভারেজের ভিতরে নিয়ে আসছি। আমরা প্রত্যেকটা জায়গায়, প্রত্যেকটা ঘরে গেছি। ২০২২ সালের যে জনশুমারি হয়েছে ওই সমীক্ষার সঙ্গেও কিন্তু আমাদের মিলে গেছে।
এদিকে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রথম ধাপে সারা দেশের দেশের ১৩টি জেলার ১৩ সিটি কর্পোরেশন অথবা ইউনিয়ন এর ১৫টি ওয়ার্ডে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রথম ধাপে পাইলটিং পর্যায়ে সারা দেশে মোট ৬৭ হাজার ৮৫৪ টি নারী প্রধান পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
জানা গেছে, ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় প্রতিটি নারী প্রধান পরিবার একটি করে আধুনিক ফ্যামিলি কার্ড পাবেন। স্পর্শবিহীন চিপ সম্বলিত এই কার্ডে বার কোডের তথ্যসহ এনএফপি (নিয়ার ফিল্ড কমিউনিকেশন) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে কার্ডটি নিরাপদ, দীর্ঘস্থায়ী ও সহজে ব্যবহারযোগ্য হবে। কোন একটি পরিবারের ৫ জন সদস্যের জন্য একটি ফ্যামিলি কার্ড প্রদান করা হবে। তবে যৌথ একান্নবর্তী পরিবারগুলোর সদস্য সংখ্যা পাঁচের অধিক হলে আনুপাতিক হারে একাধিক কার্ড প্রদান করার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। ফ্যামিলি কার্ডের জন্য নির্বাচিত নারী গৃহ প্রধান যদি অন্য কোন সরকারি ভাতা বা সহায়তা পান সেক্ষেত্রে সেই সকল বিদ্যমান সুবিধা বাতিল হিসেবে গণ্য হবে। তবে পরিবারের অন্যান্য সদসাদের অন্যান্য ভাতা গ্রহণ অব্যহত থাকবে।
পতেঙ্গায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান :
আজ সকাল ১০ টায় অনুষ্ঠেয় বিমানবন্দর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ প্রাঙ্গণে চট্টগ্রামে ফ্যামিলি কার্ড উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি থাকবেন চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, এরশাদ উল্লাহ এমপি, মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান এমপি, সাঈদ আল নোমান এমপি, বিভাগীয় কমিশনার ড. মোঃ জিয়াউদ্দিন, সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজ ও পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খান। স্বাগত বক্তব্য রাখবেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।


