পিরোজপুরের ভোটের মাঠ: সাঈদী ফরাজী মাহমুদে চ্যালেঞ্জে ধানের শীষ

পিরোজপুরের ভোটের মাঠ: সাঈদী ফরাজী মাহমুদে চ্যালেঞ্জে ধানের শীষ

৮ February ২০২৬ Sunday ৫:০৩:২০ PM

Print this E-mail this


বিশেষ প্রতিনিধি:

পিরোজপুরের ভোটের মাঠ: সাঈদী ফরাজী মাহমুদে চ্যালেঞ্জে ধানের শীষ

ভোটযুদ্ধে বরিশাল অঞ্চলে বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ পিরোজপুর জেলা। নব্বই পরবর্তী কোনো নির্বাচনেই এখানে জয় পায়নি ধানের শীষ। এবারও জেলায় থাকা ৩টি নির্বাচনি এলাকার সবকটিতেই রয়েছে বিএনপির শক্ত প্রতিপক্ষ। পিরোজপুর-১ (ইন্দুরকানী-সদর-নাজিরপুর) আসনে ধানের শীষের বিরুদ্ধে লড়ছেন মরহুম মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে জামায়াতে ইসলামীর মাসুদ সাঈদী। জীবদ্দশায় এই আসনে দুবার এমপি হয়েছিলেন সাঈদী। পিরোজপুর-২ (ভাণ্ডারিয়া-কাউখালী-নেসারাবাদ) আসনে সাঈদীর আরেক ছেলে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী শামিম সাঈদী ছাড়াও আছেন বিএনপির বিদ্রোহী ঘোড়া প্রতীকের মাহমুদ হোসাইন (ভিপি মাহমুদ)। এছাড়া পিরোজপুর-৩ (মঠবাড়িয়া) আসনে লড়ছেন ৪ বারের সাবেক এমপি হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ডা. রুস্তুম আলী ফরাজী। শক্তিশালী এই ৪ প্রার্থীর কারণে অনেকটাই অমসৃণ এখন বিএনপির জয়। তারপরও জয়ের আশা যেমন ধানের শীষের তেমনি অন্যরাও আশা করছেন বিজয়ী হওয়ার। পাশাপাশি ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো আর ভোটকেন্দ্রে যেতে নিষেধ করার অভিযোগ করেছেন তারা।

পিরোজপুর-১ : ১৯৯৬ আর ২০০১-এর নির্বাচনে এখানে জামায়াতের প্রার্থী হয়ে জয়ী হয়েছিলেন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। ৯৬-এর ভোটে এককভাবে নির্বাচন করে সাঈদী জেতেন ২৬০ ভোটের ব্যবধানে। সেবার বিএনপির মরহুম গাজী নুরুজ্জামান বাবুল পান ৫ হাজার ৯১২ ভোট। ২০০১-এ বিএনপির সমর্থনে ভোটে নেমে ৩৪ হাজার ভোটের ব্যবধানে জেতেন সাঈদী। ২০০৮-এর নির্বাচনে বিএনপির সমর্থন থাকা সত্ত্বেও অবশ্য তিনি আওয়ামী লীগের কাছে হারেন ৭ হাজার ভোটে। ৯০ পরবর্তী নির্বাচনগুলোর হিসাব ধরলে এখানে তখন খুব একটা শক্তিশালী ছিল না বিএনপি। প্রার্থী নির্বাচন প্রশ্নেও ছিল সাংগঠনিক দুর্বলতা। এবার অবশ্য জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক অধ্যক্ষ আলমগীর হোসেনকে মনোনয়ন দিয়েছে দল। ছাত্রদল থেকে উঠে আসা আলমগীর সাংগঠনিকভাবে যথেষ্ট শক্তিশালী। নির্বাচনি এলাকার তিন উপজেলাতেই রয়েছে তার একনিষ্ঠ কর্মী বাহিনী। দ্বন্দ্ব-বিভেদ ভুলে নেতাকর্মীরাও ঐক্যবদ্ধভাবে নেমেছেন তার পক্ষে। তারপরও জয়ের পথে বাধা মাসুদ সাঈদী। আওয়ামী শাসনামলে ইন্দুরকানীতে নির্বাচন করে উপজেলা চেয়ারম্যান হয়েছিলেন তিনি। পাচ্ছেন কারাবন্দি অবস্থায় মাওলানা সাঈদীর মৃত্যুজনিত সমবেদনা। জেলা বিএনপির সদস্য সচিব সাইদুল ইসলাম কিসমত বলেন, ২০০৮ আর ২০২৬ এক নয়। বিএনপি এখন সাংগঠনিকভাবে অনেক শক্তিশালী। মরহুম মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে আমরাও সম্মান করি। কিন্তু তিনি আর তার ছেলেকে মেলালে তো হবে না। তার নিজের উপজেলা ইন্দুরকানীতেই সব ইউপি চেয়ারম্যান আর মেম্বাররা নেমেছেন ধানের শীষের পক্ষে। অন্য দুটি উপজেলাতেও ব্যাপক সমর্থন আমাদের। ইনশাআল্লাহ ১২ তারিখের ভোটে জিতব আমরা।’ দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী মাসুদ সাঈদী বলেন, ‘দাঁড়িপাল্লার পক্ষে যে গণজোয়ার তা ঠেকাতে সাধারণ এবং সংখ্যালঘু ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। ভোটকেন্দ্রে যেতে পর্যন্ত নিষেধ করা হচ্ছে। বিষয়টি বারবার প্রশাসনকে জানানোর পরও কোনো প্রতিকার পাচ্ছি না। তারপরও ইনশাআল্লাহ আমাদেরই জয় হবে বলে আশাবাদী আমরা।’

পিরোজপুর-২ : সদর আসনের মতো এখানেও ৯০ পরবর্তী কোনো নির্বাচনে জয় পায়নি বিএনপি। আসনটি জেপি (মঞ্জু) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নির্বাচনি এলাকা। বিভিন্ন সময়ে এখানে ৬ বার এমপি হয়েছেন মঞ্জু। এবার অবশ্য নির্বাচন করছেন না তিনি। তার পরিবারের হয়ে লড়ছেন বিএনপির বিদ্রোহী ভাণ্ডারিয়া সরকারি কলেজের সাবেক ভিপি মাহমুদ হোসাইন। সম্পর্কে তিনি মঞ্জুর চাচাতো ভাই। বিএনপির প্রার্থী ভাণ্ডারিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি আহম্মেদ সোহেল সুমন মঞ্জুর। এই দুজন ছাড়াও জামায়াতের প্রার্থী হয়ে লড়ছেন মরহুম সাঈদীর অরেক ছেলে শামিম সাঈদী। 

কিংবদন্তি সাংবাদিক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ভাতিজা ও আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর ছোট ভাই হিসাবে শুরু থেকেই বেশ শক্ত অবস্থান ভিপি মাহমুদের। তার ওপর বিএনপির একটা বড় অংশ রয়েছে তার সঙ্গে। নির্বাচনি এলাকা থেকে পাওয়া খবরানুযায়ী, মঞ্জুর সমর্থক ভোটারদের সমর্থন পাচ্ছেন মাহমুদ। জেপির (মঞ্জু) ভোটব্যাংকের সুবিধাও পাচ্ছেন তিনি। বিপরীতে বাবা মরহুম নুরুল ইসলাম মঞ্জুরের উত্তরাধিকার হিসাবে রাজনীতির মাঠে অবস্থান সুমন মঞ্জুরের। বিভিন্ন সময়ে এই আসনে নুরুল ইসলামকে ৩ বার মনোনয়ন দিয়েছিল বিএনপি। প্রতিবারই বিপুল ভোটের ব্যবধানে হেরে যান। ৯৬-এর নির্বাচনে তার অবস্থান ছিল তৃতীয়। ভিপি মাহমুদ ও সুমন মঞ্জুর, দুজনেরই বাড়ি ভাণ্ডারিয়া উপজেলায়। এখানে সব সময়ই কম ভোট পেতেন নুরুল ইসলাম। এবারও ভোটের পাল্লা ভারী ভিপি মাহমুদের। ধানের শীষ আর ঘোড়ায় ভাগ হবে এই উপজেলার ভোট। বাকি দুই উপজেলাতেও শক্ত অবস্থান বিদ্রোহীর। তার ওপর রয়েছেন জামায়াতের শামিম সাঈদী। ২০০১-এর নির্বাচনে এখানে সাড়ে ৪ হাজারের কিছু বেশি ভোট পায় দাঁড়িপাল্লা। বাকি নির্বাচনগুলোতে প্রার্থী দেয়নি তারা। মাঠের খবরানুযায়ী, ভাসমান ভোটারদের পাশাপাশি বিএনপি সমর্থক ভোটারদের একটি বড় অংশ ঝুঁকেছে দাঁড়িপাল্লার দিকে। আওয়ামী লীগের কিছু নেতাও প্রকাশ্যে ভোট চাইছেন শামিম সাঈদীর পক্ষে। ভোটযুদ্ধের এই জটিল সমীকরণে লড়াই শেষ পর্যন্ত দাঁড়িপাল্লা আর ঘোড়ায় আটকে যেতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। যদিও এই সমীকরণ মানতে নারাজ সুমন মঞ্জুর। যুগান্তরকে তিনি বলেন, ‘কাউকেই থ্রেট বলে মনে করছি না। ধানের শীষের পক্ষে যে গণজোয়ার তাতে সহজেই জিতে যাব।’ বিএনপির বিদ্রোহী ভিপি মাহমুদ বলেন, ‘তিন উপজেলায় কান পেতে শুনুন, বিপুল ভোটে জিতব আমরা। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে যে আমাদের ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। আমার নির্বাচনি ক্যাম্পে হামলা পর্যন্ত হয়েছে। তারপরও ঘোড়ার পক্ষে জোয়ার উঠেছে। সাধারণ মানুষ এমন কাউকে এমপি হিসাবে চায় যিনি পকেট ভরতে নয়, জনগণের জন্য কাজ করতে এসেছেন।’

পিরোজপুর-৩ : বিএনপি থেকে স্বতন্ত্র হয়ে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসাবে ৪ বার এমপি হওয়া ডা. রুস্তুম আলী ফরাজী এবার হাতপাখা নিয়ে নেমেছেন ভোটে। ফুটবলারদের মতো বারবার জার্সি বদল করা এই নেতা যে কিভাবে ভোটে জেতেন সেটা একটা রহস্য সবার কাছে। তবে মঠবাড়িয়ার ভেতরে ঢুকলে দেখা মেলে তার শক্তিশালী ভোটব্যাংকের। প্রথম জীবন থেকে এখন পর্যন্ত, ফরাজীর ভোটের মাঠের সবচেয়ে বড় শক্তি বিনামূল্যের চিকিৎসা। যা তিনি দিয়ে এসেছেন এলাকার মানুষকে। যে ভোটব্যাংক এবারও ভয়ের কারণ ধানের শীষের জন্য। অবশ্য এবার যে খুব সহজে পার পাবেন ফরাজী তা নয়। বিএনপি যাকে প্রার্থী করেছে সেই রুহুল আমিন দুলালেরও রয়েছে এলাকায় শক্ত অবস্থান। আজন্ম মঠবাড়িয়ায় থাকা দুলাল চেনেন মঠবাড়িয়ার প্রতিটি ঘর আর ঘরের মানুষকে। এখানে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনে মাঠে আছেন এনসিপির প্রার্থী ড. শামিম হামিদি। সর্বশক্তি নিয়ে তার পক্ষে কাজ করছে জামায়াত। স্থানীয় ভোটারদের মতে, জামায়াতের ভোট এখানে খুব বেশি না থাকলেও ব্যক্তি ইমেজ আর ইসলামী আন্দোলনের ভোট মিলিয়ে বেশ শক্ত অবস্থান রুস্তুম আলী ফরাজীর। এখন পর্যন্ত যা পরিস্থিতি তাতে শেষ লড়াইটা হাতপাখার সঙ্গেই হবে ধানের শীষের। বিএনপির প্রার্থী রুহুল আমিন দুলাল বলেন, ‘বারবার আদর্শ পালটানোর বিষয়টি খুব একটা ভালো চোখে দেখছেন না নির্বাচনি এলাকার মানুষ। যে কোনো মূল্যে, তা নীতি বিসর্জন দিয়ে হলেও এমপি হতে চাওয়া কাউকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করছি না। আল্লাহর রহমতে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জিতবে ধানের শীষ।’ এ বিষয়ে কথা বলার জন্য রুস্তুম আলী ফরাজীর মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও ধরেননি তিনি।

সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক


শেয়ার করতে ক্লিক করুন:

Explore More Districts