| ২ May ২০২৬ Saturday ৭:৪২:১৫ PM | |
পাথরঘাটা ((বরগুনা) প্রতিনিধি:

সাগরে মাছ ধরায় ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা, মা ইলিশ সংরক্ষণে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞাসহ বছরের বিভিন্ন সময় আরোপিত বিধিনিষেধে নির্ধারিত সময় সাগরে যেতে পারেন না জেলেরা। অন্য সময় রয়েছে বৈরী আবহাওয়া। জারি করা হয় সতর্কতা সংকেত। ফলে তখন নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে হয়।
তবে এর বাইরে জেলেদের রয়েছে অন্য আতঙ্ক। নিষেধাজ্ঞা চলাকালে বেশিরভাগ জেলেকে ধার-দেনা করতে হয়। মাছ শিকার করে তা শোধ করার তাগিদ থাকে। তাই কাঙ্ক্ষিত মাছ না পেলে সবই ব্যর্থ হয়।ঋণের জালে আটকা পড়েন আষ্টেপৃষ্ঠে। ফলে নদীতে মাছ পাওয়া যাবে কিনা, তা নিয়ে থাকে শঙ্কা।
এদিকে, নদী-সাগরে মাছ শিকার করতে যাওয়া জেলেদের রয়েছে জলদস্যু আতঙ্ক। মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারে প্রায়ই দস্যুদের উৎপাত হয়।মারধরে মৃত্যুও হয়। মুক্তিপণের দাবিতে অপহরণের মতো ঘটনা ঘটে। এসব কারণে জেলেদের এখন চলছে চরম দুর্দশা। বিভিন্ন স্থানের মতো বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার জেলেদেরও এ দুর্দশা প্রকট হচ্ছে ক্রমশ।
জেলেরা জানান, সাগরে যাওয়ার সুযোগ পেলেও কাঙ্ক্ষিত মাছ পাওয়া যাচ্ছে না।বারবার শূন্য হাতে ফিরে আসায় লোকসানের মুখে পড়ছেন তারা। অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, ট্রলারের ইঞ্জিন, যন্ত্রপাতি ও মেরামত খরচ বেড়ে যাওয়ায় ব্যয় এখন কয়েকগুণ বেড়েছে। জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যও তাদের জন্য বড় আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে।
পাথরঘাটা উপজেলার সদর ইউনিয়নের পদ্মা গ্রামের জেলে মো. নাসির মাঝি বলেন, ‘আগের মতো মাছ আর পাওয়া যায় না। গত কিছুদিনে ছয়বার গভীর সাগরে গেছি, মাত্র একবার মাছ পেয়েছি। এতে খরচ উঠানোই দায় হয়ে গেছে। এখন সাধারণ মাঝিদের পাওনা দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।’ তিনি বলেন, প্রতিবার সাগরে মাছ শিকারে যেতে জ্বালানি ও খাদ্য, পানি, বরফসহ দুই থেকে তিন লাখ টাকা খরচ হয়। একবার মাছ পেয়ে প্রায় ৯ লাখ টাকার বিক্রি করলেও বাকি পাঁচবারে মোট বিক্রি হয়েছে মাত্র ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এতে লাভ তো দূরের কথা, ঋণের বোঝাই বেড়েছে শুধু।
একটি ট্রলারে ১০ থেকে ১৫ জন শ্রমিক নিয়োগ দিতে হয়, যাদের বলা হয় শূন্যভাগী পার্টনার। মাছ আহরণের পর খরচ বাদ দিয়ে তাদের মধ্যে লভ্যাংশ বণ্টন করা হয় কিন্তু সাগরে গিয়ে মাছ সংকট ও উচ্চ ব্যয় পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে বলে জানান বরগুনা জেলা ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী। তার মতে, অনেক শ্রমিক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এখন আর সাগরে যেতে আগ্রহী নয়। কারণ মালিকের লাভ না হলে শ্রমিকের পকেটেও টাকা পড়ে না।
পাথরঘাটা সদর ইউনিয়নের জীনতলা গ্রামের জেলে পল্লীর শ্রমিক কালাম সরদারের অভিযোগ, মাঝেমধ্যে জলদস্যুদের হামলার শিকার হতে হয় তাদের। হঠাৎ করে সশস্ত্র জলদস্যুরা ট্রলারে উঠে মারধর করতে থাকে এবং জেলেদের অপহরণ করে সুন্দরবনের গভীরে নিয়ে যায়। পরে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। মুক্তিপণ না দেওয়া পর্যন্ত জেলেদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালিয়ে মোবাইল ফোনে স্বজনদের শোনানো হয়।
মৎস্য শ্রমিক আনোয়ার হোসেন বলেন, একেকজন জেলেকে জলদস্যুর হাত থেকে ছাড়িয়ে আনতে দুই থেকে তিন লাখ টাকা, কখনো তারও বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। অনেক সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে জেলের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। ট্রলার মালিকরা তাদের মুক্ত করতে সব সময় আগ্রহী হন না।
একই আক্ষেপ শোনা যায় অন্য জেলে ও ট্রলার মালিকদের কণ্ঠেও। তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বাধ্য হয়ে অনেকে জেলেই পেশা পরিবর্তন করবেন। স্থানীয় জেলে নেতারা জেলেদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, জ্বালানিতে ভর্তুকি এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের দাবি জানান। পাশাপাশি সমুদ্রে নিরাপত্তা জোরদার করে জলদস্যু দমনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।
জেলে ও জেলে শ্রমিক নেতারা বলছেন, জেলেদের জীবন-জীবিকা টিকিয়ে রাখতে হলে টেকসই মৎস্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি তাদের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে দেশের উপক‚লীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক
| শেয়ার করতে ক্লিক করুন: | Tweet |

