
ঢাকা, ২৬ জানুয়ারি – প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। এই সংবেদনশীল সময়ে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর নির্বাচন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সোমবার (২৬ জানুয়ারি) সেনাসদরে সশস্ত্র বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. ইউনূস বলেন, জনগণের আস্থার প্রতীক হিসেবে সশস্ত্র বাহিনী অতীতের মতো এবারও পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করবে—এ বিষয়ে সরকার আশাবাদী।
সভার শুরুতে প্রধান উপদেষ্টা মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। একই সঙ্গে দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীর অবদান কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন তিনি।
ড. ইউনূস বলেন, ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা জাতির ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি সন্ধিক্ষণ। দীর্ঘদিন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত একটি জাতি ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশের দায়িত্ব নেওয়ার যে আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে, এই নির্বাচনে ভোট দেওয়া হবে তার চূড়ান্ত প্রকাশ।
তিনি বলেন, গণভোটের মাধ্যমে মানুষ ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনে নিজেদের মতামত জানাবে এবং সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সেই মতামত বাস্তবায়নের জন্য যোগ্য জনপ্রতিনিধি বেছে নেবে। তাই এই নির্বাচনের গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি।
ড. ইউনূস বলেন, এই নির্বাচন আয়োজনের সময় আমাদের মনে রাখতে হবে যে তরুণদের বড় একটি অংশ এবারই প্রথম ভোট দেবে। আবার অনেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষও দীর্ঘদিন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে ভোটারদের জন্য ভয়মুক্ত ও উৎসবমুখর পরিবেশ নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব। দেশের সামগ্রিক বাস্তবতায় এই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনে সশস্ত্র বাহিনী একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার বলে তিনি মনে করেন।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, সক্ষম, পেশাদার, নিরপেক্ষ ও জনমুখী বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী এই গুরুদায়িত্ব সফলভাবে পালন করে জাতিকে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর নির্বাচন উপহার দিতে সর্বোচ্চ সহায়তা করবে।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি। প্রতিটি নাগরিক যেন কোনো ভয় বা চাপ ছাড়াই নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনকে সর্বোচ্চ সহায়তা দিতে হবে।
নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বকে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে বলেন, মাঠপর্যায়ে সব সিদ্ধান্ত হতে হবে আইনসম্মত, সংযত ও দায়িত্বশীল। সামান্য কোনো বিচ্যুতিও যেন জনগণের আস্থায় আঘাত না করে, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, তরুণ এবং দীর্ঘদিন ভোটাধিকার বঞ্চিত নাগরিকদের অংশগ্রহণের কারণে এবারের নির্বাচন বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। তাই ভয়মুক্ত পরিবেশে প্রত্যেক নাগরিকের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব।
ড. ইউনূস শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের পথে সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দীর্ঘ ফ্যাসিস্ট শাসনামলে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা উপেক্ষিত ছিল। দায়িত্ব গ্রহণের পর অল্প সময়ের মধ্যেই এই অবস্থার পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং যেকোনো আগ্রাসন মোকাবিলায় বাহিনীকে যুগোপযোগী করে গড়ে তোলাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
তিনি জানান, সশস্ত্র বাহিনীর স্বনির্ভরতা ও সক্ষমতা বাড়াতে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সামরিক অস্ত্র ও সরঞ্জাম উৎপাদনের কারখানা স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে।
ড. ইউনূস আরও বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে নেদারল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে ইতোমধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা স্মারক সই হয়েছে। একই ধরনের স্মারক ইতালি, জাপান, থাইল্যান্ডসহ আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া চলছে। এসব স্মারক বাস্তবায়িত হলে সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা ও আভিযানিক দক্ষতা অনেকটাই বাড়বে।
সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নেওয়া এসব উদ্যোগ ভবিষ্যতের নির্বাচিত সরকারও এগিয়ে নেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সেনাসদরের হেলমেট অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভার স্থানে পৌঁছালে প্রধান উপদেষ্টাকে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম কামরুল হাসান অভ্যর্থনা জানান।
এই মতবিনিময় সভায় সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং সংশ্লিষ্ট আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।
এনএন/ ২৬ জানুয়ারি ২০২৬



