
ঢাকা, ২১ জানুয়ারি – নির্ধারিত সময়ের তিন সপ্তাহ আগে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে নবম জাতীয় বেতন কমিশন নতুন পে-স্কেল সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনে বেতনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুবিধা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) বিকেলে ২৩ সদস্যবিশিষ্ট কমিশন, জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে, রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার হাতে উপস্থাপন করে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
গত ২৭ জুলাই সরকার ২৩ সদস্য বিশিষ্ট নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে এবং ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা নির্ধারণ করে। ২০১৩ সালে অষ্টম বেতন কমিশন গঠনের পর ১২ বছর পর এই কমিশন গঠিত হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের আগে কমিশন তাদের জন্য নির্ধারিত বাজেটের মাত্র ১৮ শতাংশ ব্যয়ে প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “এটি একটি মস্ত বড় কাজ। মানুষ বহুদিন ধরে এর জন্য অপেক্ষা করছে। আউটলাইন দেখে বোঝা গেল, খুবই সৃজনশীল কাজ হয়েছে।”
কমিশনপ্রধান জাকির আহমেদ খান বলেন, “গত এক দশকে বৈশ্বিক ও জাতীয় অর্থনীতির প্রায় সব সূচকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বহুগুণ বেড়েছে। সময়োপযোগী বেতন কাঠামো না থাকায় সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে। এজন্য কমিশন বিদ্যমান বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করেছে।”
কমিশন কাজের অংশ হিসেবে অনলাইন ও অফলাইনে ১৮৪টি সভা করেছে এবং ২৫৫২ জনের মতামত ও প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। বিভিন্ন সমিতি ও অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা সভাও আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সংস্থান নির্ধারণ এবং বাস্তবায়নযোগ্যতা পর্যালোচনা করা হয়েছে।
কমিশনপ্রধান জানান, প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের জন্য এক লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের ব্যয় এক লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।
নতুন পে-স্কেলে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব আছে। সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডে বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকার সুপারিশ করা হয়েছে এবং সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০ হাজার টাকার প্রস্তাব আছে।
পেনশনভোগীদের জন্যও বড় সুবিধার প্রস্তাব এসেছে। যারা মাসে ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পান, তাদের পেনশন দ্বিগুণ করা হতে পারে। ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকার মধ্যে ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি, ৪০ হাজার টাকার বেশি হলে ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। ৭৫ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য চিকিৎসা ভাতা ১০ হাজার টাকা এবং ৫৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য ৫ হাজার টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রধান বেতন ছাড়াও, বৈশাখী ভাতা বর্তমান ২০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ করার প্রস্তাব এসেছে। অর্থাৎ উৎসবের সময় ভাতার পরিমাণ আড়াই গুণ বাড়বে।
অর্থ উপদেষ্টা জানিয়েছেন, এখন প্রতিবেদন বাস্তবায়নই পরবর্তী কাজ। এজন্য একটি কমিটি গঠন করা হবে, যা বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করবে।
প্রতিবেদন আরও সুপারিশ করেছে— সরকারি কর্মচারীদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা প্রবর্তন, পেনশন ব্যবস্থার সংস্কার, সরকারি কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড পুনর্গঠন, সার্ভিস কমিশন গঠন, বেতন গ্রেড ও স্কেলের যৌক্তিক পুনর্বিন্যাস, ভাতার পর্যালোচনা এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে মানবসম্পদ উন্নয়ন।
প্রতিবন্ধী সন্তানের ক্ষেত্রে মাসিক ২ হাজার টাকা ভাতা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে, সর্বোচ্চ দুই সন্তান পর্যন্ত। টিফিন ভাতা বর্তমান ২০০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকার সুপারিশ এসেছে।
প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরী, অর্থ সচিব খায়রুজ্জামান মজুমদার এবং কমিশনের সব পূর্ণকালীন ও খণ্ডকালীন সদস্যবৃন্দ।
এনএন/ ২১ জানুয়ারি ২০২৬



