চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা নিরসনে গৃহীত প্রকল্পের আওতায় নগরীর ৩৬টি খালের মধ্যে ৩৪টির কাজ শেষ হয়েছে। বাকি দুটি খালের কাজও দ্রুত শেষ করা হবে। প্রকল্পের আওতাধীন খালগুলোর কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হলে নগরবাসী জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবেন বলে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ইতোমধ্যে নগরীতে এই প্রকল্পের সুফল মিলতে শুরু করেছে।
নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএ ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ শীর্ষক একটি মেগা প্রকল্প গ্রহণ করে বছর কয়েক আগে। ২০১৭ সালের আগস্টে একনেকের অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পটির মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। পরবর্তীতে দফায় দফায় সময় ও খরচ বেড়ে প্রকল্প ব্যয় ইতোমধ্যে ৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। প্রকল্পটির আওতায় নগরীর ৩৬টি খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ এবং উন্নয়নের পাশাপাশি খালের পাড়ে রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ, খাল থেকে বালি ও মাটি উত্তোলন এবং নগরীর বিভিন্ন স্থানে নালা নির্মাণ করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সিডিএ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন শুরু করে।
২০১৯ সালে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু হয়। ২০২২ সালের জুন মাসে এটি শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা, প্রয়োজনীয় অর্থের যোগানসহ বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে প্রকল্পটির কাজ ব্যাহত হয়। খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়নকাজ সম্পন্ন করতে গিয়ে নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হয়। কিন্তু সেনাবাহিনীর ৩৪তম ব্রিগেডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দক্ষতার সাথে কার্যক্রম এগিয়ে নেয়।
জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পের আওতায় ৩৬টি খাল রয়েছে। এর মধ্যে আমরা ৩৪টি খালের কাজ পুরোপুরি শেষ করেছি। এসব খাল খনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার এবং দুই পাশের রিটার্নিং ওয়াল নির্মাণ করা হয়েছে।
প্রকল্পের খরচ বৃদ্ধি প্রসঙ্গে সিডিএর একজন প্রকৌশলী জানিয়েছেন, প্রকল্পটির আওতায় ৩৬টি খালের দুই পাশে ১৭৬ কিলোমিটার রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা। কিন্তু ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে ৪ হাজার ৮৩৯ কোটি টাকা। এই রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণের সময় খালপাড়ের বহুতল ভবন রক্ষা করতে শিট পাইল করতে হচ্ছে, যা প্রকল্পের শুরুতে ছিল না।এতেও ব্যয় বাড়ছে। এর বাইরে প্রকল্পে ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে মাত্র ১৫ কিলোমিটার নালা নির্মাণ করার ব্যয় ধরা হয়েছিল। মাঠ পর্যায়ে কাজে নেমে দেখা যায়, নালা নির্মাণ করতে হবে ৯০ কিলোমিটার। এতে ব্যয় হয় ৩৫৮ কোটি টাকা। রাস্তার পাশের নালা নির্মাণে খরচ বেড়ে গেছে ৩৫৪ কোটি টাকা।
তিনি বলেন, প্রকল্পের প্রাক্কলন ব্যয় নির্ধারণকালে ধরা হয়েছিল, ৩৬টি খাল থেকে ৪ লাখ ২০ হাজার ঘনফুট কাদা অপসারণ করতে হবে। এতে ব্যয় হবে ২৮ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। কিন্তু কাজ শুরু করার পর ক্রমান্বয়ে হিসাব পাল্টাতে শুরু করে। ৩৬টি খাল থেকে মোট ১৯ লাখ ৫৮ হাজার ঘনফুট কাদা সরানো হচ্ছে। খাল সম্প্রসারণে সর্বমোট ৫ লাখ ২৮ হাজার ঘনফুট মাটি কাটার কথা ছিল। যাতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৭ কোটি টাকা। কিন্তু পরবর্তীতে ২১ লাখ ঘনফুট মাটি কাটতে হয়। যাতে ব্যয় হয় ১৭০ কোটি টাকা। প্রতিটি জিনিসের দাম বেড়েছে। বেড়েছে লেবার কস্টও। পদে পদে, খাতে খাতে ব্যয় বৃদ্ধির ফলে প্রকল্প ব্যয় চার–পাঁচ হাজার কোটি টাকা বেড়ে গেছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ৮ হাজার ৬শ ২৬ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে উল্লেখ করে সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ নুরুল করিম বলেন, আগামী জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। তবে আমরা আরো মাস ছয়েক সময় বাড়ানোর আবেদন করব। প্রকল্পটি ২০২৬ সালের মধ্যে সম্পন্ন হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
প্রকল্পের আওতায় বর্তমানে কেবলমাত্র দুটি খালের কাজ বাকি রয়েছে। এর মধ্যে জামালখান খালের কাজ প্রায় ৮০ শতাংশ এবং হিজড়া খালের কাজ ৫০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। এই দুটি খালের কাজ দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান।
সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নুরুল করিম, সেনাবাহিনীর ৩৪তম ব্রিগেডের প্রকল্প পরিচালক লে. কর্নেল আহমেদ মঈনুদ্দিন সংশ্লিষ্টদের সাথে নিয়ে গতকাল দুটি খালের কার্যক্রম পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শনকালে আগামী বর্ষা মৌসুম শুরুর আগে চলমান কাজ শেষ করার পাশাপাশি খাল থেকে মাটি অপসারণ করে পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখার নির্দেশনা প্রদান করা হয়।
সিডিএ চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ নুরুল করিম আজাদীকে জানান, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করার তাগাদা দেওয়া হয়েছে। আমরা দ্রুত এই প্রকল্পটির কাজ শেষ করতে চাই। তিনি বলেন, ৩৬টি খালের মধ্যে ইতোমধ্যে ৩৪টি খালের কাজ শেষ হয়েছে। বাকি দুটি খালের কাজও শেষ করা হবে। ইতোমধ্যে নগরবাসী এই প্রকল্পের সুফল পেতে শুরু করেছেন। গত বর্ষায় নগরীর বহু এলাকায় পানি উঠেনি। বর্ষা থেকে এই প্রকল্পের দৃশ্যমান সুফল পাওয়া যাবে জানিয়ে তিনি বলেন, খালগুলো অনেক কষ্ট করে পুনঃখনন এবং মাটি তোলা হয়েছে। প্রচুর ময়লা খাল থেকে তোলা হয়েছে। খালগুলো যাতে আবার ভরাট হয়ে না যায় নগরবাসীকে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।
সংশ্লিষ্ট একজন প্রকৌশলী বলেন, খাল থেকে আমরা খাট–পালং থেকে শুরু করে সংসারে ব্যবহার্য অনেক পরিত্যক্ত জিনিস উদ্ধার করেছি। নগরবাসী যদি সচেতন না হন তাহলে খাল পরিষ্কার করেও বেশিদিন তা ধরে রাখতে পারব না।



