
ঢাকা, ১৪ মার্চ – বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনা থাকলেও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। জলবায়ু ঝুঁকিকে এখনো মূলত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা হয় এবং এটি অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয় না।
তবে বাস্তবতা হলো, জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর কেবল ঘূর্ণিঝড়, বন্যা বা নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন উৎপাদনশীলতা, খাদ্যব্যবস্থা, শ্রমবাজার, নগরায়ণ, স্বাস্থ্যব্যয়, অবকাঠামো এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ কান্ট্রি ক্লাইমেট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের কৃষিখাতের জিডিপির প্রায় এক তৃতীয়াংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বার্ষিক অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় এক কোটি ৩৩ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে জলবায়ু অভিবাসী হয়ে পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ু ঝুঁকিকে কেবল ত্রাণ বা পুনর্বাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সামষ্টিক অর্থনীতি এবং উন্নয়ন পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গ্রহণ করা জরুরি। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন মূলধন বিনিয়োগের আয়ু কমাচ্ছে, কৃষিতে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে গ্রাম ও শহরের ভারসাম্য নষ্ট করছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।
১৯৭০ সালের ভোলা ঘূর্ণিঝড়ের তুলনায় বর্তমানে ঘূর্ণিঝড়জনিত মৃত্যুহার নাটকীয়ভাবে কমেছে। তবে প্রাণহানি কমার অর্থ এই নয় যে অর্থনৈতিক ঝুঁকি কমেছে। বর্তমান সময়ে বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে আয়ের ক্ষেত্রে এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মাধ্যমে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, শুধু ২০২৪ সালে তাপপ্রবাহজনিত স্বাস্থ্যসমস্যার কারণে বাংলাদেশে প্রায় ২৫০ মিলিয়ন কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে, যার অর্থনৈতিক মূল্য প্রায় এক দশমিক আটশ আটাত্তর বিলিয়ন ডলার।
এই পরিস্থিতিতে জলবায়ু ইস্যুকে কেবল পরিবেশ বা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ভাবা বড় ধরনের নীতিগত ভুল হতে পারে। এটি অর্থ, পরিকল্পনা, স্থানীয় সরকার, কৃষি, সড়ক, পানিসম্পদ ও স্বাস্থ্যসহ সকল খাতের যৌথ অর্থনৈতিক বিষয়। অবকাঠামো নির্মাণের সময় বন্যা, লবণাক্ততা, চরম তাপপ্রবাহ বা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো ঝুঁকিগুলো বিবেচনায় না নিলে বিনিয়োগের প্রকৃত সুফল পাওয়া সম্ভব নয়।
বিশেষ করে কৃষি খাতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। লবণাক্ততা, খরা ও আকস্মিক বন্যার কারণে ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতি এবং খাদ্য নিরাপত্তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাই জলবায়ু সহনশীল কৃষি নীতি গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
জলবায়ু অভিবাসনের কারণে নগর অবকাঠামো, আবাসন ও স্বাস্থ্যসেবার ওপর ব্যাপক চাপ পড়ছে। ঢাকার ওপর অতিনির্ভরশীল অর্থনীতি এই ঝুঁকির কারণে আরও ভঙ্গুর হয়ে পড়তে পারে। এজন্য জেলাভিত্তিক শিল্পায়ন এবং আঞ্চলিক শহরগুলোর উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি।
সরকার ইতোমধ্যে জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যেখানে বিপুল পরিমাণ অর্থায়নের প্রয়োজন হবে। তবে শুধু বাজেট বরাদ্দই যথেষ্ট নয়, বরং বরাদ্দের বিপরীতে কতটা কার্যকর ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনকে পরিবেশগত সমস্যার পাশাপাশি দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান এবং প্রবৃদ্ধির সমন্বিত সংকট হিসেবে বিবেচনা করে সব সরকারি বিনিয়োগে জলবায়ু ঝুঁকি যাচাই বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।
এ এম/ ১৪ মার্চ ২০২৬



