তৃণমূলে এতো সমর্থন সত্ত্বেও হাসান মামুনের পরাজয় যে কারণে

তৃণমূলে এতো সমর্থন সত্ত্বেও হাসান মামুনের পরাজয় যে কারণে

২৩ February ২০২৬ Monday ১০:২২:৫৪ PM

Print this E-mail this


গলাচিপা ((পটুয়াখালী) প্রতিনিধি:

তৃণমূলে এতো সমর্থন সত্ত্বেও হাসান মামুনের পরাজয় যে কারণে

হাসান মামুন ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য। দীর্ঘদিন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় রাজনীতি করেছেন। ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি। এরপর নিজ এলাকা গলাচিপায় দীর্ঘদিন রাজনীতি করেন। মাঠ তৈরি করেন। তৃণমূল পর্যায়ে তার রয়েছে বিপুল জনসমর্থন। তা হওয়া সত্ত্বেও দল পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা ও দশমিনা) আসনে তাকে মনোনয়ন না দিয়ে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে সমর্থন দেয়। ফলে বিএনপি জোটের ভোট ব্যাংক মূলত নুরের পক্ষে চলে যায়।

আর এটাই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসনে হাসান মামুনের পরাজয়ের প্রধান কারণ।

মূলত জোটের রাজনীতি ও দলীয় সিদ্ধান্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট থেকে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে মনোনয়ন দেওয়া হয়।

দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে হাসান মামুন স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় তাকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়, এরপর গলাচিপা-দশমিনা আসনের সব বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়; যা তার রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

হাসান মামুনকে স্থানীয় বিএনপির একটি বড় অংশ সমর্থন দিলেও জোটের প্রার্থীর (নুরুল হক নুর) পক্ষেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোট ছিল। এই ভোট বিভাজন জয়ের ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

‘বিদ্রোহী’ বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ফলে তিনি মূল দলীয় প্রতীকের (ধানের শীষ) পরিবর্তে স্বতন্ত্র প্রতীক (ঘোড়া) নিয়ে লড়েন, যা অনেক সাধারণ ভোটারের কাছে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে।

নির্বাচনে প্রচার চলাকালে হাসান মামুনের নির্বাচনি কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে এবং তার নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করার অভিযোগও পাওয়া যায়, যা তার প্রচারণাকে বাধাগ্রস্ত করেছিল।

গলাচিপায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে পুরোনো মামলা ও নতুন করে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের বেশ কিছু ঘটনা ঘটে; এতে করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটারেরা ক্ষিপ্ত হয়ে ভিপি নুরুল হক নুরের দিকে ডাইভার্ট হয়ে যায়। গত ৫ আগস্ট এর পরে তৃণমূল-বিএনপির চাঁদাবাজির কারণে সাধারণ লোকজন তাদের উপর আস্থা হারিয় ফেলে।

আওয়ামী লীগ ভোটারদের প্রভাব দীর্ঘ ৪৬ বছর পর পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসনে আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থী না থাকায় তাদের অনুসারীদের একটি বড় অংশ জয়ের নির্ধারক হয়ে ওঠে, যা শেষ পর্যন্ত বিজয়ী প্রার্থীর অনুকূলে গিয়ে দাঁড়ায়।

পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসনের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুধু একটি ভোটের ফলাফল নয়, বরং এটি দুই উপজেলার রাজনীতিতে সৃষ্টি করেছে নতুন বাস্তবতা, বিভাজন এবং সাংগঠনিক সংকটের নতুন অধ্যায়।

এদিকে নির্বাচনের আগেই স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেওয়াকে কেন্দ্র করে গলাচিপা ও দশমিনায় বিএনপির একাধিক কমিটি বিলুপ্ত করা হয় এবং বহু নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়। এতে দুই উপজেলার রাজনৈতিক অঙ্গনে চাপা উত্তেজনা ও বিভক্তি তৈরি হয়।

বিলুপ্ত কমিটিগুলোর জায়গায় নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে।

নতুন কমিটির নেতারা দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ভিপি নুরুল হক নুরের সঙ্গে দাঁড়িয়েছেন।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারা বহিষ্কৃত নেতাদের বিষয় নিয়ে সম্পূর্ণ সমর্থক নাও হতে পারেন। এ কারণে দলে এক ধরনের গভীর অস্বস্তি এবং সম্ভাব্য সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

দুই উপজেলার বহুদিনের ত্যাগী নেতাকর্মীদের বড় অংশ স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসান মামুনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। যারা বছরের পর বছর হামলা-মামলা, জেল-জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাদের অনেকের জন্য এ নির্বাচন ছিল মূল্যায়নের পরীক্ষা। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপে তারা দিশেহারা ও ক্ষুব্ধ।

শেষপর্যন্ত এ আসনে জয়ী হন বিএনপি সমর্থিত গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ভিপি নুরুল হক নুর। স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসান মামুনের পরাজয়ের পর বহিষ্কৃত কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। নতুন কমিটি ও বিজয়ী প্রার্থীর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখলেও দলের অভ্যন্তরে অশান্তি এখনো থেকে গেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পটুয়াখালী-৩ আসনের এই নির্বাচন বিএনপির জন্য একটি বড় সতর্ক সংকেত। তৃণমূলের ক্ষোভ প্রশমন, গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং অভ্যন্তরীণ সমন্বয় ছাড়া দলীয় ঐক্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসনের এ নির্বাচন বিএনপির সামনে তাই একটি রাজনৈতিক পরীক্ষা, যেখানে বিজয়, বিভাজন ও দল পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে দেখা দিয়েছে। দল কি ঐক্যের পথে ফিরবে, নাকি এই বিভাজন দীর্ঘমেয়াদে আরও গভীর সংকটের দিকে নিয়ে যাবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন মানুষের কাছে। 

নির্বাচনের অনেক আগেই পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) মানুষের পাশে ছিলেন হাসান মামুন। সাবেক ছাত্রনেতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি এবং  বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে তিনি রাজনীতিতে স্থায়ী অবস্থান তৈরি করেছেন। এখন তিনি বহিষ্কৃত সাবেক নেতা; কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে মানুষের কাছে তার প্রকৃত পরিচয় সেবামুখী সমাজসেবক, দানবীর ও ন্যায়নিষ্ঠ নেতা।

২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব আন্দোলনে নিহত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো থেকে শুরু করে করোনা মহামারীর সময় নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা প্রদান, সব ক্ষেত্রেই তিনি মানবিক ভূমিকা রেখেছেন। প্রতি শীতে অসহায় মানুষদের কম্বল বিতরণ এবং পথশিশুদের সহায়তাও তার মানবিকতার অনন্য উদাহরণ।

তরুণ সমাজকে সুশৃঙ্খল ও সুস্থধর্মী বিনোদনের পথে রাখতে ফুটবল ও ক্রিকেটের বিভিন্ন আয়োজন করেছেন তিনি। পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় নিয়মিত উপকূলীয় অঞ্চলে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পরিচালনা করে আগামী প্রজন্মের জন্য সবুজ পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) গড়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে আর্থিক সহযোগিতা দিয়ে তিনি সম্প্রীতির উদাহরণ স্থাপন করেছেন।

সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক


শেয়ার করতে ক্লিক করুন:

Explore More Districts