আ.স.ম. জাকারিয়া: আজ থেকে নয় বছর আগে অর্থাৎ ২০১৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর গাজীপুর জেলার টঙ্গীস্থ বিসিক শিল্প এলাকায় ট্যাম্পাকো ফয়েল কারখানায় সংগঠিত হয় ভয়াবহ অগ্নিকান্ড।
ভয়াবহযেদিন আগুন লেগেছিল, তার দুদিন পরই ‘ঈদ’ । কেউ রাতের শিষ্টে কাজ করে, অপেক্ষামান বেতন ভাতায় জন্য, আর কেউ আসছে কর্মে নিয়োজিত হবে। মুহূর্তের মধ্যেই ঘটে গেল ঘটনা। লন্ডভন্ড হয়ে গেল সব, জীবন্ত মানুষ পরিণত হলো লাশে। স্বপ্ন হলো চুরমার ।
সে এক নিদারুন দৃশ্য। একজন মানুষ দেখলো কি ভাবে সে মরছে। নিজের মৃত্যু সে নিজে প্রত্যক্ষ করছে। বাঁচার জন্য আকুতি জানাচ্ছে। বাইরে অপেক্ষেমান জনতা শুনছে, আকুতি। কিন্তু পারছেনা তাকে বাঁচাতে। একদিকে আগুনের লেলিহান শিখা, অন্যদিকে মালিকের তৈরী বন্দী শালা নামক কারখানা। দরজা জানালা যেখানে রয়েছে জাল দ্বারা আটকানো। ফলে সাধ্য কার রক্ষা করে তাদের।
মালিক কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা। কারখানা অভ্যন্তরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বৈদ্যুতিক তার, ক্যামিক্যাল সামগ্রী। দুর্বল গ্যাস সংযোগ। কম মূল্যের মেয়াদ উত্তীর্ণ বয়লার। অরক্ষিত গ্যাসলাইন বৈদ্যুতিক সংযোগ।
সবদিকে বিবেচনায় কমদামে কেনা সামগ্রী। স্বল্প জায়গায় গাদাগাদি করে কাজ করা। মালিকদের অধিক মুনাফা প্রাপ্তির মানসিকতার ফল । মৃত্যু বরণ করে ৪০ জন শ্রমিক আহত হয় ৫০ জনের ও অধিক । নিখোঁজ হয় কয়েকজন। নষ্ট হয় কোটি কোটি টাকার সম্পদ। ক্ষতিগ্রস্থ হয় আশ পাশের বাড়ি, দোকান, প্রতিষ্ঠান। মারা যায় পথচারীও।
প্রায় ১০০ পরিবার সেদিনের ঈদ আনন্দ বঞ্চিত হয়। পাশা পাশি এক অনিশ্চিত জীবনের মধ্যে প্রবেশ করে।
কেউ হারিয়েছে সন্তান। কেউ বাবা, কেউ স্বামী, ইহ জনমে আর তাদের পাবে না। রাষ্ট্র, সরকার, মালিক, তথাকথিত শ্রমিক নেতা সবাই কিছুদিনের জন্য তাদের খোঁজ খবর নিয়েছে। দয়া দাক্ষিণ্য দেখিয়েছে।
এখন আর কেউ তাদের খবর রাখে না। সবাই যার-যার মত। অথচ ঘটনার দিন থেকে বেশ কিছুদিন যাবৎ কথার ফুলঝুরি ছড়িয়ে ছিল, আমরা তোমাদের পাশে আছি। মালিক বলেছে নিহত, আহত শ্রমিকদের পরিবার পরিজনদের দেখবে । তাদের সুখ, দুঃখের সাথী হবে।
সরকার মহোদয়, যারা রাষ্ট্র ক্ষমতা রয়েছে তারা জোরালো কন্ঠে বলেছিল, শ্রমিক হত্যাকারীদের বিচারহবে । দূর্ঘটনার যথাযথ তদন্ত সাপেক্ষ ব্যবস্থা নেয়া হবে ।
শ্রমিক নেতারা বলেছিল, যথাযথ ক্ষতিপূরণ আদায়করবে। দূর্ঘটনার সাথে জড়িতদের শাস্তি চাই। কিন্তু দুর্ভাগ্য কেউ কথা রাখেনি। সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ েিকন। শ্রমিক নেতারা শ্রেণি স্বার্থ রক্ষা করেনি।
ট্যাম্পাকো কারখানা এখন পূর্বের ন্যায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, উৎপাদন হচ্ছে। মালিকের লাভ লোকসানের হিসাব কষা হচ্ছে।
অথচ যারা অকালে জীবন দিল, যাদের পরিবার পরিজন নিঃস্ব হলো। যাদের সন্তান, স্ত্রী, পুত্র অনিশ্চিত জীবন যাপন করছে, তাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন হলো কি-না সে খবর এখন আর কেউ রাখে না।
ট্যাম্পাকো কারখানায় যে সকল কারণে দূর্ঘটনা ঘটলো যারা দায়ী তাদের কোন শাস্তি হলো না। কে অপরাধী তাও
জানা গেল না।
১০ সেপ্টেম্বর ট্যাম্পাকো দূর্ঘটনার দিন। কেউ খবর নে-নাই নিহত, আহত শ্রমিকদের পরিবার পরিজনের। যারা নিহত হয়েছে তাদের আত্মার শান্তি কামনা করা হয়নি। যারা আহত পঙ্গু হয়ে বেঁচে আছে তাদের জীবনের গল্প শুনা হয়নি। ‘‘কোন পত্রিকায় তাদের নিয়ে একটা কথা ও বলা হয়নি’’।
লেখক: শিক্ষক, শ্রমিকনেতা ও সাংস্কৃতিক কর্মী।



