কিন্তু লাখ আলোকবর্ষ ব্যাসার্ধ নিয়ে গড়া আমাদের আবাস ‘মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি’। প্রায় ৪০ হাজার কোটি নক্ষত্র এই গ্যালাক্সি ধারণ করে। সত্যিই যদি ড্রেক সমীকরণের মাধ্যমে পাওয়া এই গ্যালাক্সির ভিন্ন নক্ষত্রের গ্রহগুলোতে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে, এক কোটি উন্নত সভ্যতা টিকে থাকে, আগে বর্ণিত এসব ভয়াবহ আত্মধ্বংসের প্রবণতা কাটিয়ে ওঠে, তাহলে তারা আসেনি কেন এই শ্যামল পৃথিবীতে?
ড্রেক সমীকরণের হিসাব মতো এই কোটিখানেক সভ্যতা আমাদের এক লাখ ব্যাসার্ধের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির সর্বত্র ছড়িয়ে থাকে, তাহলে নিকটতম সভ্যতার দূরত্ব হবে ২০০ আলোকবর্ষ। কার্ল সাগান ও সহকর্মী উইলিয়াম নিউম্যান একটা হিসাব দেখালেন। তাঁরা বললেন, ১০ লাখ বছর আগে এবং দুই শ আলোকবর্ষ দূরে অল্প জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারসম্পন্ন নক্ষত্র থেকে নক্ষত্রে ঘুরে বেড়ানো কোনো উন্নত সভ্যতার বিকাশ ঘটতে পারত।
তাদের যাত্রাপথ বরাবর দুই লাখ সূর্যের অনুকূল গ্রহগুলোতে উপনিবেশ স্থাপন করে বিস্তার ঘটাত। তাদের অনুসন্ধানী নক্ষত্রযান আমাদের সৌরজগতে প্রায় হঠাৎ করে প্রবেশ করত। অতএব তাদের পৌঁছানোর সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি।
১০ লাখ বছরের পুরোনো সভ্যতা বলতে আসলে কী বোঝায়? মাত্র ৫–৬ দশক হলো আমরা বেতার, দূরবীক্ষণ যন্ত্র ও মহাকাশযান তৈরি করতে পেরেছি। আমাদের যান্ত্রিক সভ্যতা মাত্র কয়েক শ বছরের প্রাচীন। আধুনিক ধাঁচের বৈজ্ঞানিক ধারণাগুলোর বিকাশ শুরু হয়েছে মাত্র দেড়-দুই হাজার বছর আগে। সাধারণভাবে সভ্যতার বয়স হলো ৩০-৪০ হাজার বছরের। আর এই গ্রহে মানুষের উদ্ভব ঘটেছে মাত্র ২৫ থেকে ৩০ লাখ বছর আগে।
নিকোলাই কার্দাশেভের স্কেলটি ব্যবহার করে কার্ল সাগান মানবসভ্যতার একটা অবস্থান তৈরি করেছেন। তাঁর মতে, মানবসভ্যতা টাইপ ওয়ানের পথে ৭৩ ভাগ অতিক্রম করেছে। এই সভ্যতা নিজের গ্রহে সহজে লভ্য প্রাকৃতিক উত্স থেকে প্রাপ্ত শক্তিকে ব্যবহার করে তত্ক্ষণাৎ প্রয়োজন মেটায় শুধু।
ভবিষ্যতে ভয়াবহ বিপর্যয়ের কথা জানলেও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করে না। অথচ মাত্র ২৭ ভাগ পথ অতিক্রম করতে পারলে টাইপ ওয়ান সভ্যতায় পৌঁছাতে পারে। তখন তার ওপর সূর্যের বিকিরত সব শক্তি ব্যবহারে সক্ষম হবে। সেই প্রাপ্তিযোগ্য শক্তি হবে ১.৭৪×১০১৭ ওয়াট। উল্লেখ্য, ওয়াট হলো ক্ষমতার একক। এই হিসাবে বর্তমান যদিও মানবসভ্যতা ৭৩ ভাগ পথ অতিক্রম করেছে ঠিকই। কিন্তু বিপদটা হচ্ছে বেশির ভাগ জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে।
টাইপ ওয়ানের পরের ধাপ হলো টাইপ টু সভ্যতা। এই সভ্যতা তাদের নিজস্ব নক্ষত্রব্যস্থা বা সূর্যের বিকিরত সব শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কাজে লাগাতে পারবে। নিজের নক্ষত্রের জ্বালানিও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। ফলে টাইপ ওয়ান সভ্যতার চেয়ে শতকোটি গুণ বেশি মাত্রায় জ্বালানি ব্যবহারের যোগ্যতা রাখে তারা।
যেমন ডাইসন গোলক নির্মাণের সক্ষম সভ্যতা। সেখানে আমাদের গ্রহে, সূর্য বিকিরণের যে ক্ষুদ্র অংশ পড়ে, সেই ক্ষুদ্র অংশেরও ক্ষুদ্র অংশ আমরা ব্যবহার করতে পারি না। টাইপ টু সভ্যতা নক্ষত্রের বাইরেও সৌর প্যানেল, উপগ্রহ এবং স্টেশন থেকেও শক্তি সংগ্রহ করতে পারবে। সূর্যকে বিবেচনায় রাখলে পরিমাণটা দাঁড়ায় ৩.৮৬×১০২৬ ওয়াট। এই সভ্যতার অধিবাসীদের কাছে আন্তনাক্ষত্রিক ভ্রমণ তাদের কাছে সোজা হয়ে যাবে। তারা দূরের গ্রহে গিয়েও কলোনি বানাতে পারবে।
কার্দাশেভ স্কেলে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা সভ্যতা হলো টাইপ থ্রি সভ্যতা। এরা নিজস্ব গ্যালাক্সির সম্পূর্ণ শক্তি নিজেদের প্রয়োজনমতো ব্যবহারে সামর্থ্য রাখে। এরা আত্মধ্বংসের প্রবণতা থেকে কাটিয়ে ওঠা এক নাক্ষত্রিক সভ্যতা। আমরা জানি, গ্যালাক্সিগুলো আকার অকল্পনীয় বিশাল। কার্দাশেভের বর্ণনায় আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির প্রাপ্তযোগ্য ক্ষমতার পরিমাণের কাছাকাছি— প্রায় ৪×১০৩৭ ওয়াট।

