চট্টগ্রামের প্রতি আবেগের সম্পর্ক আছে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পরিবারের। চট্টগ্রামের সঙ্গে নানা স্মৃতি পরিবারটির। ২০ বছর পর চট্টগ্রাম এসে সেই আবেগ ও ভালোবাসার কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন এই পরিবারের সন্তান ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। কেবল চট্টগ্রামের সঙ্গে বাবা জিয়াউর রহমান ও মা বেগম খালেদা জিয়ার আত্মার সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরে সীমাবদ্ধ থাকেননি তিনি। আগামীতে বিএনপি সরকার গঠন করলে চট্টগ্রামকে ঘিরে নানা উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এ প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নতুন করে ইপিজেডের সংখ্যা বৃদ্ধি করা। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা সমস্যা নিরসনে খাল খনন কর্মসূচিতেও গুরুত্ব দেন তিনি।
তারেক রহমান গতকাল রোববার নগরের পলোগ্রাউন্ড মাঠে অনুষ্ঠিত বিএনপির নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন। তার ২৮ মিনিট দীর্ঘ বক্তব্যে তুলে ধরা নিজের নানা পরিকল্পনায় স্থান পেয়েছে চট্টগ্রামও। সভায় বিএনপির চট্টগ্রামের নেতারাও ক্ষমতায় গেলে চট্টগ্রামকে ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাসহ এখানকার উন্নয়নে তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ প্রত্যাশা করেন।
জনসভা শুরু হয় সকাল সাড়ে ১০টায়। ১২টা ২৪ মিনিটে মঞ্চে আসেন তারেক রহমান। এ সময় লক্ষাধিক নেতাকর্মী করতালি ও স্লোগানে স্লোগানে তাকে স্বাগত জানান। তিনি বক্তব্য শুরু করেন ১২টা ৫২ মিনিটে। এর আগে ১২টা ২০ মিনিটে সভাস্থলে আসেন। তবে সরাসরি মঞ্চে না উঠে মাঠে থাকা উপস্থিত নেতাকর্মীর সঙ্গে হাত মেলান।
তারেক রহমান তার বক্তব্য শেষে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম, কঙবাজার ও তিন পার্বত্য জেলার বিএনপি প্রার্থীদের ‘ধানের শীষের প্রতিনিধি’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে তাদের জন্য ভোট চান উপস্থিত জনতার কাছে।
বাণিজ্যিক রাজধানী নিয়ে যা বললেন : তারেক রহমান বলেন, এই অঞ্চলের মানুষের একটি বড় দাবি আছে। যে দাবিটির ব্যাপারে বিগত বিএনপি সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল, কিন্তু সম্পূর্ণ করে যেতে পারেনি। দেশনেত্রী খালেদা জিয়া উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু সময়ের অভাবে সম্পূর্ণ করে যেতে পারেননি। আমরা দেখেছি, বিগত ১৫ বছরে এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ কেউ গ্রহণ করেনি। এই উদ্যোগ যদি গ্রহণ করা হয়, তাহলে শুধু এই চট্টগ্রামের মানুষ নয়, সমগ্র চট্টগ্রামসহ সারা দেশে বহু মানুষের কর্মসংস্থান হবে। সারা দেশে ব্যবসা–বাণিজ্য অনেক চাঙ্গা হবে, মানুষের কর্মসংস্থান হবে। মানুষ চাকরি ও ব্যবসা–বাণিজ্য করে খেতে পারবে। কী সেটি? বাণিজ্যিক রাজধানী।
তিনি বলেন, ইনশাআল্লাহ। আগামী ১২ তারিখের নির্বাচনে আপনাদের সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠনে সক্ষম হলে, খালেদা জিয়ার সেই উদ্যোগ যত দ্রুত সম্ভব আগামী বিএনপি সরকার সেটিকে বাস্তবায়ন করবে। যাতে এই এলাকার মানুষ ব্যাংকিং সুবিধাসহ সকল কিছু এখানে বসেই সেরে নিতে পারে।
নতুন ইপিজেড করার প্রতিশ্রুতি : তারেক রহমান কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে নগরে নতুন করে ইপিজেড করার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, চট্টগ্রামে ইপিজেড আছে এবং চট্টগ্রামের বহু মানুষ এই ইপিজেডে চাকরি করার মাধ্যমে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। এখানে কেইপিজেড আছে। কেএইপিজেড এবং বাকি যে ইপিজেডগুলো আছে এই সবগুলো কোন সময় হয়েছিল আপনাদের নিশ্চয়ই ধারণা আছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার সময় হয়েছিল। ইনশাআল্লাহ বিএনপি সরকার গঠনে সক্ষম হলে আমরা এই ইপিজেডের সংখ্যা বৃদ্ধি করব। কেইপিজেডের মতন আরো ইপিজেড আমরা তৈরি করব, যাতে আরো লক্ষ লক্ষ তরুণের কর্মসংস্থান হয়।
জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল খনন : জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল খননের উপর গুরুত্বারোপ করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, চট্টগ্রামসহ সারা বাংলাদেশের একটি বড় সমস্যা হচ্ছে জলাবদ্ধতা। এই চট্টগ্রাম শহর, চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন উপজেলাসহ সারা বাংলাদেশে খাল–বিল, নদীনালাগুলো বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আপনাদের ভোটের মাধ্যমে ১২ তারিখে বিএনপি সরকার গঠনে সক্ষম হলে আমরা সমগ্র বাংলাদেশে খাল কাটা কর্মসূচি চালু করতে চাই।
এ সময় তারেক রহমান উপস্থিত জনতাকে প্রশ্ন করেন, আপনারা কি খাল কাটবেন আমাদের সাথে? কারা কারা খাল কাটবেন? হাত তুলেন তো দেখি কারা কারা? তখন লক্ষাধিক জনতা হাত তুলে খাল কাটা কর্মসূচিতে একাত্মতা প্রকাশ করেন। এরপর তারেক রহমান বলেন, ইনশাআল্লাহ আমরা সকলে দুই হাতে কোদাল দিয়ে খাল খনন শুরু করব। খাল খনন কর্মসূচি; যাতে এই দেশ থেকে জলাবদ্ধতা ও বন্যার সমস্যা আমরা দূর করতে পারি।
চট্টগ্রামের সাথে আবেগের সম্পর্ক : তারেক রহমান বলেন, চট্টগ্রামের পুণ্যভূমি যেখান থেকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এই সেই চট্টগ্রামের পুণ্যভূমি, যেখানে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শহীদ হয়েছিলেন। এই সেই চট্টগ্রামের পুণ্যভূমি, যেখান থেকে দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে ‘দেশনেত্রী’ উপাধি দেওয়া হয়েছিল। এই চট্টগ্রামের পুণ্যভূমির সাথে আমি এবং আমার পরিবারের একটি আবেগের সম্পর্ক রয়েছে।
প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে যা বললেন : বক্তব্য শেষ করে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বৃহত্তর চট্টগ্রামের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন তারেক রহমান। তারেক রহমানসহ সব প্রার্থীর হাতে ছিল ধানের শীষ। এ সময় তারেক বলেন, আপনারা এই মানুষগুলোকে চেনেন। তারপরও যে মানুষগুলো আগামী দিনে এই এলাকার মানুষের উন্নয়নের রাজনীতির সূচনা করবে, সেই মানুষগুলোর সাথে আপনাদেরকে আমি পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। এখানে চট্টগ্রাম জেলার সকল প্রার্থী উপস্থিত আছেন, কঙবাজার জেলার সকল প্রার্থী আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন।
তারেক রহমান বলেন, আপনাদের এলাকার উন্নয়নের দায়িত্ব এই মানুষগুলোর উপরে থাকবে। আপনাদের এলাকায় উন্নয়ন হচ্ছে কি হচ্ছে না, আপনারা নির্বাচিত করার পরে এই মানুষগুলোর কাছে গিয়ে আপনার অভাব অভিযোগ জানাতে পারবেন। তারেক বলেন, এদেরকে যদি নির্বাচিত করেন তাহলে এরা আপনাদের কাছে জবাবদিহি করতে দায়বদ্ধ থাকবে। সকল মা–বোনসহ সকল ভাইদের প্রতি আমার অনুরোধ, ১২ তারিখে যাতে কেউ কোনোভাবে আপনাদের ভোটের অধিকার কেড়ে নিতে না পারে সে ব্যাপারে সদা সতর্ক দৃষ্টি রাখবেন।
জনতার উদ্দেশে তিনি বলেন, প্রিয় ভাই–বোনেরা, এই আমার হাতের ডান এবং বাম পাশে যে মানুষগুলো দাঁড়িয়ে আছেন এরা হচ্ছেন ধানের শীষের প্রতিনিধি। ইনশাআল্লাহ ১২ তারিখে এদেরকে জয়যুক্ত করবেন। যাতে আপনার জীবনকে আপনি নিরাপদ করতে পারেন এবং আপনার এলাকার উন্নয়নকে আপনি নিশ্চিত করতে পারেন।


