চট্টগ্রামের জিরো পয়েন্ট : যে ইতিহাস জানে না অনেকে – দৈনিক আজাদী

চট্টগ্রামের জিরো পয়েন্ট : যে ইতিহাস জানে না অনেকে – দৈনিক আজাদী





নগরীর কোতোয়ালি পাথরঘাটা এলাকা। এই এলাকায় দুই যুগ ধরে বসবাস করে আসছেন ষাটোর্ধ্ব ইসলাম মিয়া। খাতুনগঞ্জে রয়েছে তার ব্যবসা। চট্টগ্রামের ইতিহাস নিয়ে তার মোটামুটি একটা ধারণা থাকবে–সেটিই তো স্বাভাবিক। কিন্তু ইসলাম মিয়া জানেনই না যে, চট্টগ্রামের একটি ‘জিরো পয়েন্ট’ রয়েছে! যার অবস্থান কোতোয়ালি থানার কাছের কোর্টহিলেই। কেন বিষয়টি তার অজানা–সে বিষয়ে অনার্স–মাস্টার্স পাস ইসলাম মিয়া নিজেও কিছুটা অবাক। অপরদিকে নগরীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে ব্যাংক কর্মকর্তা হওয়া জালাল উদ্দিনের কাছে চট্টগ্রামের জিরো পয়েন্টের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘চট্টগ্রামে কি জিরো পয়েন্ট রয়েছে?’ ঢাকার জিরো পয়েন্ট বললেই গাড়িচালক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ–একবাক্যেই চিনে ফেলেন। রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র গুলিস্তানের ঠিক মাঝে এর অবস্থান হওয়ায় সবাই এ বিষয়ে বেশ ভালোই অবগত। কিন্তু বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে চিত্রটা একেবারেই ভিন্ন। নগরীর প্রাণকেন্দ্র হিসেবে কোতোয়ালি কিংবা নিউমার্কেট এলাকা পরিচিত হলেও, সেখানকার কোর্টহিলে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘জিরো পয়েন্ট’ নিয়ে সাধারণ মানুষের জানাশোনা বেশ সীমিত। হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া এ বিষয়ে বেশিরভাগ মানুষেরই পরিষ্কার কোনো ধারণা নেই। স্থানীয় অনেকের সাথে কথা বললেও দেখা যায়, চট্টগ্রামের জিরো পয়েন্টের কথা উঠলে তারা খানিকটা দ্বিধায় পড়ে যান। অথচ ঢাকার মতো চট্টগ্রামের এই ঐতিহাসিক জিরো পয়েন্টও সবার কাছে সমান পরিচিতি পাক–এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।স্বস্তির বিষয় হলো, জেলা প্রশাসনের সামপ্রতিক এক উদ্যোগের সুবাদে মানুষ এখন নতুন করে এই স্থাপনা ও এর পেছনের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারছে। ইতিহাস বলছে, চট্টগ্রাম এক দিনে বন্দরনগরী বা বাণিজ্যিক রাজধানী হয়ে ওঠেনি। ১৮৬০ সালে কর্ণফুলী নদীর মোহনায় দুটি জেটি নির্মাণের মাধ্যমে আধুনিক চট্টগ্রাম বন্দরের যাত্রা শুরু হয়। এর হাত ধরেই এই জনপদে দ্রুত প্রসার লাভ করে বাণিজ্যিক কার্যক্রম। সে সময় ব্যবসা–বাণিজ্যের সুব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন অঞ্চলের দূরত্ব ও পরিমাপের একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণের প্রয়োজন অনুভব করে ব্রিটিশ প্রশাসন। সেই প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক তাগিদেই ঐতিহাসিক কোর্ট হিল এলাকায় স্থাপন করা হয় মূল কেন্দ্রবিন্দুটি, যা পরবর্তীতে পরিচিতি পায় ‘জিরো পয়েন্ট’ নামে। মূলত এই শহর থেকে দূর–দূরান্তের পথ পরিমাপের আদি ভিত্তি ছিল এটি।

জানা গেছে, নব্বইয়ের দশকে জিরো পয়েন্টের বর্তমান কাঠামোটি প্রথম নির্মিত হয়। এরপর ২০০১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বিচ্ছিন্নভাবে কিছু সংস্কার কাজ হলেও, এর ঐতিহাসিক মর্যাদা ও নান্দনিকতা ফুটিয়ে তুলতে বড় কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন এটি অযত্ন–অবহেলায় প্রায় আড়ালেই পড়েছিল। তবে সমপ্রতি সেই অচলায়তন ভেঙে স্থাপনাটি ফিরে পেয়েছে তার পুরোনো গৌরব। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা গত মার্চে আনুষ্ঠানিকভাবে সংস্কারকৃত এই জিরো পয়েন্টের উদ্বোধন করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিদর্শনে গিয়ে জিরো পয়েন্টের জীর্ণ দশা তার নজরে আসে। এরপর তারই প্রত্যক্ষ দিকনির্দেশনায় এটিকে এক নান্দনিক ও পরিচ্ছন্ন রূপ দেওয়া হয়, যা এখন পথচারী ও দর্শনার্থীদেরও নজর কাড়ছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেছিলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। একটি জাতির ইতিহাস ও ঐতিহ্যই মূলত তার সংস্কৃতির শেকড়কে নির্ধারণ করে। আমাদের সংস্কৃতির ইতিহাস কেমন, আমাদের সংস্কৃতি কতটা প্রাচীণ–এসবই এই ইতিহাস ও ঐতিহ্যের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। একই সঙ্গে এটি আগামী প্রজন্মের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেয়।’ সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রাচীণ এই নিদর্শন রক্ষা এবং নগরের সৌন্দর্যবর্ধনে জেলা প্রশাসকের এই উদ্যোগ এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কোর্ট হিলের জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনের এই জিরো পয়েন্ট কেবল একটি পরিমাপের জায়গা নয়, বরং এটি বন্দরনগরীর দীর্ঘ পথচলার এক নীরব সাক্ষী।

অ্যাডভোকেট নুসরাত জাহান পিংকি দৈনিক আজাদীকে বলেন, জিরো পয়েন্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিন্দু। চট্টগ্রামের প্রত্যেক নাগরিকের একবার হলেও চোখ বুলিয়ে নেওয়া উচিৎ ব্রিটিশ আমলের সেই শেকড়টি।




Explore More Districts