চট্টগ্রাম নগরীর পরিধি বাড়ছে, বাড়ছে জনসংখ্যা ও কর্মব্যস্ততা। প্রতিদিন কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসাকেন্দ্র ও বিভিন্ন গন্তব্যে ছুটছেন লাখো মানুষ। কিন্তু নগরীর মানুষের চলাচলের প্রধান অবলম্বন গণপরিবহনের সংখ্যা সেই অনুপাতে বাড়ছে না। বছরের পর বছর নতুন যানবাহনের নিবন্ধন ও রুট অনুমোদনের সুযোগ সীমিত থাকায় সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ স্টপেজগুলোতে সকাল-বিকেল বাসের অপেক্ষায় দীর্ঘ সারি এখন নগরজীবনের পরিচিত দৃশ্য।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রাম নগরীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নতুন সিএনজিচালিত অটোরিকশার নিবন্ধন বন্ধ। প্রায় সাত বছর ধরে অটোটেম্পোসহ বিভিন্ন যানবাহনের নিবন্ধন ও রুট অনুমোদনও কার্যত বন্ধ রয়েছে। ফলে নগরীর যাত্রীসংখ্যা বাড়লেও গণপরিবহনের বহরে যুক্ত হচ্ছে না প্রয়োজনীয় নতুন যানবাহন।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাবে, চট্টগ্রাম নগরীতে বাস-মিনিবাস চলাচলের জন্য নির্ধারিত রুট রয়েছে ১৭টি। এসব রুটে প্রায় ২ হাজার ৯০০টি বাস-মিনিবাসের রুট অনুমোদন রয়েছে। এর মধ্যে ৮০৩টি বাসের ফিটনেস নেই। ফলে কাগজে-কলমে অনুমোদিত যানবাহনের সংখ্যা আর বাস্তবে সড়কে চলাচলকারী যানবাহনের সংখ্যার মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। পরিবহন সংশ্লিষ্টদের দাবি, অনুপযোগী ও অনুমোদনহীন যানবাহন ধরলে বাস্তব চিত্র আরও ভয়াবহ ।
নগরীতে অনুমোদিত বাস-মিনিবাস রয়েছে প্রায় ১ হাজার ১৩০টি। এর পাশাপাশি ২ হাজার ১৫৮টি টেম্পো, ৯৬৯টি হিউম্যান হলার এবং প্রায় ১৩ হাজার সিএনজি অটোরিকশা রয়েছে। চট্টগ্রামের মতো দেশের অন্যতম বৃহৎ ও ব্যস্ত মহানগরের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার বিপরীতে এই পরিবহন ব্যবস্থা অপ্রতুল বলে সংশ্লিষ্টরা মন্তব্য করেছেন।
গণপরিবহনের ঘাটতি পূরণ করতে গিয়ে নগরীর সড়কে বেড়েছে ছোট যানবাহনের আধিপত্য। বিভিন্ন এলাকায় বিপুলসংখ্যক রিকশা ও ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করছে। রয়েছে অনুমোদনহীন সিএনজি অটোরিকশাও। যাত্রীদের জন্য এসব যানবাহন তাৎক্ষণিক বিকল্প তৈরি করলেও একই সঙ্গে বাড়াচ্ছে যানজট, সড়কে বিশৃঙ্খলা এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি। একটি কার্যকর ও সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা না থাকায় নগরীর বিপুল সংখ্যক মানুষ অনেকটা ছোট ছোট যানবাহনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
সংকট আরও বাড়ছে বিদ্যমান বাসগুলোর একটি অংশ সাধারণ যাত্রী পরিবহনে না থাকায়। নগরীর শিল্পকারখানাগুলোর শ্রমিক পরিবহন কিংবা রিজার্ভ ভাড়ায় অনেক বাস ব্যবহৃত হয়। ফলে অফিস-আদালত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের ব্যস্ত সময়ে সাধারণ যাত্রীদের জন্য সড়কে থাকা বাসের সংখ্যা আরও কমে যায়। স্টপেজে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত বাস না পাওয়ায় যাত্রীরা বাধ্য হচ্ছেন বেশি ভাড়া দিয়ে সিএনজি অটোরিকশা, টেম্পো কিংবা অন্যান্য ছোট যানবাহনে উঠতে।
পরিবহন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নতুন যানবাহন যুক্ত করার বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মহল থেকে দাবি জানানো হলেও কার্যকর সমাধান হয়নি। তাদের মতে, শুধু বিদ্যমান যানবাহনের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে নগরীর ক্রমবর্ধমান পরিবহন চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। যাত্রীসংখ্যা ও নগরীর সম্প্রসারণ বিবেচনায় নিয়ে রুটভিত্তিক যানবাহনের সংখ্যা নতুন করে নির্ধারণ করা জরুরি।
পরিবহন নেতা সিদ্দিক আহমেদ বলেন, নগরীর মানুষের চাহিদার তুলনায় সড়কে প্রয়োজনীয় যানবাহন নেই। ফলে যাত্রীদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।
বিআরটিএ চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক মো. মাসুদ আলম বলছেন, কোন রুটে কতটি যানবাহন চলাচল করবে, সেটি একটি নির্ধারিত কাঠামোর মধ্যেই করতে হয়। নির্ধারিত সীমার বাইরে বিআরটিএ এককভাবে নতুন নিবন্ধন বা রুট অনুমোদন দিতে পারে না।
অন্যদিকে যানজট ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ নিয়মিত কার্যক্রম চালাচ্ছে। পরিবহন ব্যবস্থাপনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠকও করা হচ্ছে। কিন্তু ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নগরীর পরিবহন সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি সমান গুরুত্ব না পেলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, জনসংখ্যা, নগরীর বিস্তার, কর্মসংস্থানের নতুন কেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পাঞ্চল-সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিবহন পরিকল্পনা প্রয়োজন। সেই পরিকল্পনায় রুটভিত্তিক যানবাহনের সংখ্যা পুনর্নির্ধারণের পাশাপাশি আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট বাসস্টপেজ, রুটভিত্তিক শৃঙ্খলা, যাত্রী ওঠানামার সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা এবং অবৈধ যানবাহন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
তারা বলেন, শহর ক্রমে বড় হচ্ছে, মানুষের চলাচল বাড়ছে, একই কাঠামোর গণপরিবহন দিয়ে এই চাপ সামলানো কঠিন। প্রতিদিন কর্মস্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার পথে দীর্ঘ অপেক্ষা, অতিরিক্ত ভাড়া এবং ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনের ওপর নির্ভরতা থেকে নগরবাসীকে রক্ষা করতে পরিকল্পিত একটি পন্থা খুঁজে বের করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

