
খুলনা, ৬ ফেব্রুয়ারি – ‘আমাদের এই মিলে ১১ হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করত। মিল বন্ধের পর অনেকেই গ্রামে চলে গেছে। আমি যাইনি। দুই ছেলে লেখাপড়া করে, যাব কই? এখন ইজিবাইক চালাই। আগে মানুষের ভিড়ে রাস্তায় হাঁটা যেত না, এখন শিল্পাঞ্চলে সেই মানুষ নেই। তারপরও যে শ্রমিকরা আছে, তাদের ওপরই নির্ভর করছে ভোটে জেতার জয়-পরাজয়।’ খুলনার খালিশপুরের বন্ধ ক্রিসেন্ট জুটমিলের সাবেক শ্রমিক ও বর্তমান ইজিবাইকচালক শাহজাহান এভাবেই নিজের বর্তমান পরিস্থিতি ও নির্বাচনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন।
শুধু শাহজাহান নন, শিল্পাঞ্চলের কলকারখানাগুলো বন্ধ হওয়ায় হাজারো শ্রমিক আজ বেকার। অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করছেন, কেউ কেউ দিনমজুরের কাজ করে টিকে থাকার সংগ্রাম চালাচ্ছেন। অথচ এক সময় দেশের সবচেয়ে বেশি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল ছিল খুলনা মহানগরীর খালিশপুর, দৌলতপুর ও খানজাহান আলী এলাকায়। ছিল এশিয়ার সবচেয়ে বড় নিউজপ্রিন্ট মিল ও হার্ডবোর্ড মিল। এসব কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রমিকদের আগের সেই দাপট না থাকলেও নির্বাচনের মাঠে তারা এখনো বড় ফ্যাক্টর। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, খুলনা-৩ আসনে বিশাল এই শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর ভোট যেদিকে যাবে, জয়ের পাল্লা সেদিকেই ভারী হবে।
শ্রমিকরা জানান, লোকসানের অজুহাতে ২০২০ সালের ২ জুলাই বিজেএমসি খুলনার রাষ্ট্রায়ত্ত সাতটি পাটকল বন্ধ করে দেয়। এতে ক্রিসেন্ট, প্লাটিনাম, খালিশপুর ও দৌলতপুরসহ বেশ কয়েকটি মিলের প্রায় ২৬ হাজার স্থায়ী ও অস্থায়ী শ্রমিক চাকরি হারান। তৎকালীন সরকার মিলগুলো আধুনিকায়ন করে তিন মাসের মধ্যে চালুর ঘোষণা দিলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। তাই এবারের নির্বাচনে প্রার্থীরা সেই বন্ধ পাটকল চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েই শ্রমিকদের মন জয়ের চেষ্টা করছেন।
বেসরকারি পাট, সুতা, বস্ত্রকল শ্রমিক-কর্মচারী ফেডারেশনের সাবেক সভাপতি আমজাদ হোসেন বলেন, ‘কলকারখানা বন্ধ হলেও অনেক শ্রমিক এখনো এলাকায় আছেন। তারা যাকে ভোট দেবেন, তিনিই এ আসনের এমপি হবেন।’
খুলনা-৩ আসনে এবার ১০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাদের মধ্যে বিএনপির রকিবুল ইসলাম বকুল, জামায়াতের মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান, ও ইসলামী আন্দোলনের মো. আ. আউয়াল জোরালো প্রচারণায় আছেন। এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম আরিফুর রহমান মিঠুও শ্রমিকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, এই আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে।
প্রার্থীরাও শিল্পাঞ্চল পুনরুদ্ধারে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। বিএনপি প্রার্থী রকিবুল ইসলাম বকুল জানান, নির্বাচিত হলে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে বন্ধ মিলগুলো পুনরায় চালু করা হবে। জামায়াত প্রার্থী মাহফুজুর রহমান শ্রমিকদের ভাগ্য উন্নয়নের ওয়াদা করেছেন। অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মো. আব্দুল আউয়াল বকেয়া বেতন পরিশোধ ও মিল চালুর আশ্বাস দিচ্ছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম আরিফুর রহমান মিঠুও এলাকার সোনালি অতীত ফিরিয়ে আনার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
উল্লেখ্য, খালিশপুর, দৌলতপুর ও খানজাহান আলী থানার একাংশ নিয়ে গঠিত এই আসনে মোট ভোটার ২ লাখ ৫৪ হাজার ৪০৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ২৭ হাজার ৬৩৬ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ২৬ হাজার ৭৬৫ জন।
এসএএস/ ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬




