চট্টগ্রামের দ্বিতীয় আউটার রিং রোড প্রকল্পের কাজ একেবারে শেষ পর্যায়ে। নগরীর বিস্তৃত এলাকার জীবনমান এবং আবাসনসহ সার্বিক ক্ষেত্রে উন্নয়নের পাশাপাশি শহর রক্ষা বাঁধ এবং জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যেই বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটিতে পর্যটন এবং নগরবাসীর প্রাত্যহিক বিনোদনের জন্যও ব্যাপক আয়োজন রয়েছে। সাত কিলোমিটারের ওয়াকওয়েসহ নদীর পাড়ে মানুষের ‘শ্বাস ফেলার’ জায়গা করা হচ্ছে। কালুরঘাট থেকে শাহ আমানত সেতু পর্যন্ত ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটির মাত্র ৬শ’ মিটার রাস্তার কাজ বাকি রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ সমাপ্ত না হওয়ায় নতুন করে ছয় মাস সময় চাওয়া হচ্ছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কালুরঘাট থেকে মাত্র ১০ মিনিটে নগরীর কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতুসহ সন্নিহিত এলাকায় পৌঁছে যাওয়ার লক্ষ্যে বাস্তবায়নাধীন সড়কটি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে।
সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রাম মহানগরীর যান চলাচলে গতিশীলতা এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার লক্ষ্যে নগরীর কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতু (চাক্তাই খালের মুখ) থেকে কালুরঘাট ব্রিজ পর্যন্ত ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি বাঁধ কাম আউটার রিং রোড নির্মাণ করা হচ্ছে। ২ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকা ব্যয়ে গৃহীত প্রকল্পটি সিডিএর বিশেষ মেগা প্রকল্প হিসেবে বাস্তবায়ন করা হয়। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পটিতে সড়কের পাশাপাশি রেগুলেটরসহ ১২টি স্লুইচ গেট নির্মাণ করা হয়েছে। এরমধ্যে চাক্তাই এবং রাজাখালী খালের মুখের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুইটি স্লুইচ গেটও রয়েছে। প্রকল্পটির কাজ শুরু হওয়ার পর থেকে নানা ধরনের সংকটের মাঝে পড়ে। এরমধ্যে কোভিড পরিস্থিতিতে দুই বছর প্রকল্পের কাজ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের নানামুখী সংকটের মোকাবেলা করতে হয়। ইতোমধ্যে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে। দুই দফায় প্রকল্পের মেয়াদ দুই বছর বাড়ানো হয়েছে। আগামী জুনের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ সম্পন্ন করার কথা ছিল। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের নানা সীমাবদ্ধতায় প্রকল্পটির কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করা সম্ভব হয়নি। ইতোমধ্যে ৯ কিলোমিটার ৪ লেন সড়কের প্রায় সাড়ে ৮ কিলোমিটারের নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হয়েছে। বর্তমানে কালুরঘাট অংশে আধা কিলোমিটার এবং কর্ণফুলী সেতু এলাকায় ১শ’ মিটারের মতো সড়কের নির্মাণ কাজ চলছে।
প্রকল্পটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে বোটপাসসহ ১২টি স্লুইচগেট নির্মাণ করা হচ্ছে। ১২টি স্লুইচ গেটের মধ্যে ইতোমধ্যে ১১টি নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। এগুলো পুরোদমে চালু করা হয়েছে। এসব স্লুইচগেটে নেদারল্যান্ডস থেকে আনা গেট স্থাপন করা হয়েছে। বসানো হয়েছে পাম্প। বৃষ্টির সময় পাম্পের মাধ্যমে পানি নদীতে ফেলা হয়। চালু হওয়া ১১টি স্লুইচগেটের সুফল গত বর্ষায় নগরবাসী পেয়েছে বলে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা বলেছেন, এতে নগরীর বিস্তৃত এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনের ক্ষেত্রে বড় ধরণের ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। নগরীর বহু এলাকা অসহনীয় জলাবদ্ধতা থেকে নিস্তার পেয়েছে। বৃষ্টির সময় জোয়ারে গেটগুলো বন্ধ করে পাম্প করে পানি নদীতে ফেলা হয়। ভাটির সময় গেট খুলে দেয়া হয়। এতে পানিগুলো সহজে নদীতে গিয়ে পড়ে। আগে বৃষ্টির সময় জোয়ার হলে যেভাবে নদীর পানি নগরীতে প্রবেশ করতো উপরোক্ত স্লুইচগেটগুলো চালু হওয়ায় সেই অসহনীয় অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া গেছে বলেও প্রকৌশলীরা উল্লেখ করেন।
‘চিটাগাং আউটার রিং রোড দ্বিতীয় পর্যায়’ নামের প্রকল্পটি শহরের যান চলাচলের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে গৃহিত প্রকল্পটি শহরের আউটার রিং রোড হিসেবেও অসাধারণ ভূমিকা রাখবে। পতেঙ্গা থেকে ফৌজদার পর্যন্ত প্রথম আউটার রিং রোড ফৌজদারহাট বায়েজিদ রিং রোড হয়ে অনন্য আবাসিক এলাকার ভিতর দিয়ে যাওয়া সড়ক ধরে কাপ্তাই রাস্তার মাথা এবং সেখান থেকে কালুরঘাট হয়ে শাহ আমানত ব্রিজ পার হয়ে চাক্তাই খালের মুখ পর্যন্ত বিস্তৃত এই আউটার রিং রোড। এই রিং রোডেও পতেঙ্গার আদলে ওয়াকওয়ে এবং মানুষের বসবাসের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। প্রায় ৭ কিলোমিটার ওয়াকওয়েসহ নানা ধরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার রাজীব দাশ গতকাল দৈনিক আজাদীকে বলেন, ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনের রাস্তার প্রায় পুরো কাজই শেষ হয়েছে। শুধু কালুরঘাট অংশে আধা কিলোমিটার এবং কর্ণফুলী সেতু প্রান্তে একশ’ মিটার রাস্তার কাজ বাকি রয়েছে। এই অংশের কাজও শেষ পর্যায়ে। অচিরেই আমরা সড়কের এই অংশের কাজও সম্পন্ন করবো। ইঞ্জিনিয়ার রাজীব দাশ বলেন, বাঁধ নির্মাণ এবং স্লুইচ গেট নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ। একটি মাত্র ছোট্ট স্লুইচগেটের কাজ বাকি রয়েছে। সেটির কাজও শেষ পর্যায়ে। এটিতে কোন রেগুলেটর বা পাম্প নেই। ছোট্ট স্লুইচগেট, মাস দুয়েকের মধ্যে এই স্লুইচগেট নির্মাণের কাজ শেষ হবে।
তিনি বলেন, শহরের দ্বিতীয় আউটার রিং রোড হিসেবে এই সড়কটি আগামী ডিসেম্বরে পুরোদমে যান চলাচল করবে। রাস্তা, বাঁধ এবং ওয়াকওয়েসহ বিনোদনমূলক বিভিন্ন অবকাঠামো নগরীর পর্যটন খাতে একটি নয়া মাত্রা যোগ করবে বলেও ইঞ্জিনিয়ার রাজীব দাশ মন্তব্য করেন।




