এক সপ্তাহে কাটা হলো দুই শতাধিক মাদার ট্রি – দৈনিক আজাদী

এক সপ্তাহে কাটা হলো দুই শতাধিক মাদার ট্রি – দৈনিক আজাদী

লোহাগাড়ায় সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে ২ শতাধিক মাদার ট্রি আমগাছ কেটে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের আওতাধীন চুনতি রেঞ্জের সাতগড় বনবিটের রহমানিয়া পাড়া এলাকার পাহাড় থেকে এসব গাছ কাটা হয়েছে। গাছ কাটার ক্ষেত্রে অনুসরণ করা হয়নি কোনো নিয়মনীতি।

জানা যায়, বন বিভাগের নিয়োজিত কাঠ ব্যবসায়ীর মাধ্যমে গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে পাহাড়ের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে থাকা আমগাছগুলো কাটা হয়েছে। কাটা গাছগুলো দিনরাত বিভিন্ন যানবাহনে করে বনাঞ্চল থেকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। জনৈক কাঠ ব্যবসায়ী লেদুর নেতৃত্বে এসব গাছ কাটা হয়েছে।

স্থানীয়দের তথ্যমতে জানা যায়, ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে রহমানিয়া পাড়া এলাকার পাহাড়ে বিভিন্ন প্রজাতির বহু বড় গাছ ভেঙে পড়লে বনাঞ্চলের একটি বড় অংশ প্রায় বৃক্ষশূন্য হয়ে যায়। পরে ১৯৯২ সালে স্থানীয় আখতার কামাল নামে এক ব্যক্তি তার খতিয়ানভুক্ত জমি এবং সংলগ্ন পাহাড়ে দেশীয় প্রজাতির প্রায় ৫ শতাধিক আমগাছের চারা রোপণ করেন। তিন দশকের বেশি সময়ে এসব গাছ বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়। দেশীয় জাতের এসব আম মানুষের কাছে খুব একটা জনপ্রিয় না হলেও বন্যহাতি, বানর, পাখিসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর জন্য গাছগুলো ছিল গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যের উৎস। আমের মৌসুমে হাতির পাল নিয়মিত ওই বাগানে বিচরণ ও পাশের জলাশয়ে অবস্থান করত। বিভিন্ন সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগে কিছু গাছ নষ্ট হলেও টিকে ছিল প্রায় ২ শতাধিক আমগাছ। প্রায় ৩৪ বছর বয়সি পরিণত এসব ফলদ গাছ কেটে নতুন বাগান সৃজনের সিদ্ধান্ত কতটা পরিবেশবান্ধব ও বিধিসম্মত তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। এছাড়া বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং হাতির আবাসস্থল ও খাদ্যের উৎস রক্ষার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা উচিত। গতকাল সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, পাহাড়ের চূড়া ও ঢালে থাকা বিপুলসংখ্যক আমগাছ কেটে ফেলা হয়েছে। কাটা গাছের বড় অংশ সরিয়ে নেওয়া হলেও অনেক গাছের ডালপালা এখনো পড়ে রয়েছে। কাটা গাছের মোথাগুলো (গোড়া) এখনো দৃশ্যমান। এ সময় কাটা গাছের ডালপালা পরিবহনের জন্য একটি জিপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, একদিকে খাদ্যের সংকটে বন্যহাতি প্রায় সময় লোকালয়ে হানা দিচ্ছে। অন্যদিকে হাতির খাদ্যের অন্যতম উৎস ফলদ গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। এতে বন্যপ্রাণীর খাদ্য সংকট আরো বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। গাছ কাটার বিষয়ে বন বিভাগের নিয়োজিত কাঠ ব্যবসায়ী লেদু বলেন, বন বিভাগের মৌখিক অনুমতিতে আমগাছগুলো কাটা হয়েছে। গাছ কাটার আগে ছবি তুলে বনবিভাগের লোকজন তাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।

চুনতি রেঞ্জের রেঞ্জে কর্মকর্তা আবির হাসান বলেন, জবরদখল উচ্ছেদের অংশ হিসেবে আমগাছগুলো কাটা হয়েছে। সেখানে নতুন বাগান সৃজন করা হবে। তবে গাছ কাটার ক্ষেত্রে সরকারি নিয়মনীতি বা গাছগুলো নিলাম দেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে এ ব্যাপারে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও হাতি বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ আবদুল আজিজ বলেন, জবরদখল উচ্ছেদের প্রয়োজন থাকলেও পরিবেশে ও বন্যপ্রাণীর ক্ষতি এড়াতে গাছ কাটা ছাড়া বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত ছিল। যেহেতু একটি পূর্ণবয়স্ক আমগাছ শুধু কাঠের উৎস নয়, এটি পাখি, প্রাণী ও বিভিন্ন জীবের আবাসস্থল। একসাথে শত শত গাছ কেটে ফেললে বনাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হয়, বন্যপ্রাণীর খাদ্য ও আশ্রয়ের সংকট তৈরি হয়। এছাড়া মানুষবন্যপ্রাণী সংঘাত বাড়ার আশঙ্কা থাকে।

Explore More Districts