ঈদ সামনে রেখে ঝালকাঠিতে সেমাই উৎপাদন বাড়লেও মানা হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধি

ঈদ সামনে রেখে ঝালকাঠিতে সেমাই উৎপাদন বাড়লেও মানা হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধি

৬ March ২০২৬ Friday ২:৩২:০৮ PM

Print this E-mail this


ঝালকাঠি প্রতিনিধি:

ঈদ সামনে রেখে ঝালকাঠিতে সেমাই উৎপাদন বাড়লেও মানা হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধি

ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে ঝালকাঠি শহর ও জেলাজুড়ে সেমাই উৎপাদনে ব্যস্ততা বেড়েছে। জেলার পাঁচটি সেমাই কারখানার মধ্যে বর্তমানে তিনটিতে উৎপাদন কার্যক্রম চলছে। তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, চালু থাকা এসব কারখানার কোনোটি স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে মানছে না। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, শিশুশ্রম ও নিরাপত্তাহীন অবস্থায় সেমাই উৎপাদন জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

শহরের পশ্চিম ঝালকাঠি টিএনটি এলাকায় অবস্থিত মক্কা ফুডস কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে লাচ্ছা ও শলা সেমাই উৎপাদন করা হচ্ছে। দিনের পর দিন ব্যবহৃত পোড়া তেলে সেমাই ভাজা হচ্ছে। উৎপাদন কক্ষে তেলাপোকার উপস্থিতি দেখা গেছে। স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে খোলা অবস্থায় আটা-ময়দা রাখা রয়েছে। শ্রমিকেরা কোনো ধরনের গ্লাভস বা মাথায় ক্যাপ ছাড়াই কাজ করছেন। সেখানে বাতাস চলাচল ও পরিচ্ছন্নতারও ঘাটতি রয়েছে। এ ছাড়া কারখানায় শিশুদের দিয়েও বিভিন্ন কাজ করানো হচ্ছে।

বুধবার দুপুরে ওই কারখানায় সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে প্রতিষ্ঠানটির মালিক আইয়ুব আলীর ছেলে আরিফ সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহে বাধা দেন এবং অশোভন আচরণ করেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তিনি নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তারেরও চেষ্টা করেন।

অন্যদিকে শহরের কাঠপট্টি এলাকার মেসার্স মদিনা ফুড প্রোডাক্টস কারখানায় বুধবার বিকেলে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সেমাই উৎপাদনের দায়ে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ২০ হাজার টাকা জরিমানা করে, যা নগদ আদায় করা হয়। কারখানাটির মালিক মো. নান্না মিয়া বলেন, তাঁরা সাধ্যমতো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নভাবে কাজ করার চেষ্টা করেন। কিছু শ্রমিকের ভুলের কারণে জরিমানা দিতে হয়েছে। একই তেলে বারবার সেমাই ভাজার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তেল বারবার ব্যবহার না করলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন।’

সরেজমিনে সেখানে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সেমাই উৎপাদনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। শ্রমিকদের কারখানায় বসেই সিগারেট টানতে দেখা যায়।

এদিকে কুসুম ফুড প্রোডাক্টস কারখানায় গিয়েও একই চিত্র দেখা গেছে। নোংরা জায়গায় খোলা অবস্থায় প্রস্তুতকৃত সেমাই রাখা হয়েছে, যার ওপর মাছি উড়ছে। যে পাত্রে সেমাই ভাজা হচ্ছে, তার তেল পুড়ে কালো হয়ে গেছে। সেখানে ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদের কাজ করতে দেখা গেছে।

প্রতিষ্ঠানটির মালিক মো. শাখাওয়াত হোসেন জানান, চার-পাঁচ বছর ধরে তিনি এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। আগে প্রায় ১০ জন শ্রমিক কাজ করলেও বর্তমানে চাহিদা কমে যাওয়ায় ৫ জনের বেতন দিতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। শিশুশ্রমের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মূল উৎপাদনকাজে শিশুদের যুক্ত করা হয় না, তারা শুধু টুকটাক কাজ করে।’

জেলা ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, মক্কা ফুডসসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতিবছরই জরিমানা করা হয়। এরপরও তারা একই ধরনের অস্বাস্থ্যকর কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

জেলা নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ফয়েজ জালাল উদ্দিন বলেন, সেমাই কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগ পাওয়া গেছে এবং সরেজমিনে অনেক অভিযোগের সত্যতাও মিলেছে। তাদের বারবার সতর্ক করা হচ্ছে।

ঝালকাঠি ভোক্তা-অধিকারের সহকারী পরিচালক সাফিয়া সুলতান বলেন, ‘সেমাই কারখানাগুলো নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। কিন্তু বারবার জরিমানা করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে সংশোধন হচ্ছে না।’

বিএসটিআই বরিশাল অঞ্চলের ঝালকাঠির দায়িত্বে থাকা ফিল্ড অফিসার (সিএম) এইচ এম তানজীল জানান, সেমাই কারখানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে অনুমোদনের জন্য পরীক্ষার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার তিনটি কারখানায় প্রতিদিন আনুমানিক হাজার কেজি লাচ্ছা ও শলা সেমাই উৎপাদন করা হচ্ছে। এসব সেমাই ঝালকাঠি শহরসহ জেলার বিভিন্ন বাজারে বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি পিরোজপুরের কাউখালী ও ভান্ডারিয়া, বরগুনার বামনা, বরিশালের উজিরপুর ও বানারীপাড়া এবং ভোলার বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে।

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) ঝালকাঠির সভাপতি সত্যবান সেন গুপ্ত বলেন, ঈদের আগে একশ্রেণির ব্যবসায়ী সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে ব্যবসা করছেন। শুধু জরিমানা নয়, নিয়মিত তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন।

ঝালকাঠি পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা কবির হোসেন বলেন, ‘মক্কা ফুডসের সেমাই মানহীন। অনেক সময় পোড়া তেলে সেমাই ভাজতে দেখেছি। আবার শিশুদের দিয়েও কাজ করানো হয়, যা উদ্বেগজনক।’

ঝালকাঠি সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা টি এম মেহেদী হাসান (সানি) বলেন, বারবার ব্যবহৃত পোড়া তেলে তৈরি খাবার দীর্ঘ মেয়াদে লিভার ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে এবং ক্যানসারের সম্ভাবনাও তৈরি করতে পারে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি খাবার ডায়রিয়া ও খাদ্যে বিষক্রিয়ার কারণ হতে পারে।

সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক


শেয়ার করতে ক্লিক করুন:

Explore More Districts