
ঢাকা, ১৯ জানুয়ারি – রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে আপিল করে মোট ৪১৬ জন প্রার্থী আবার তাদের প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। এর মধ্যে শেষদিনের শুনানিতে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন ২০ জন। তবে একই দিনে চট্টগ্রাম-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী সারোয়ার আলমগীর এবং কুমিল্লা-১০ আসনে বিএনপির প্রার্থী আবদুল গফুর ভূঁইয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। শুনানি শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন দাবি করেন, পুরো শুনানিতে কোনো পক্ষপাত করা হয়নি।
গতকাল রবিবার নির্বাচন ভবনে টানা ৯ দিনের আপিল শুনানি শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, রিটার্নিং কর্মকর্তাদের দেওয়া সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যেসব আপিল করা হয়েছিল, সেগুলোর শুনানিতে তারা কোনো পক্ষপাত করেননি। তিনি বলেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনের বিষয়টিও তারা ছাড় দিয়েছেন, কারণ সবাইকে নিয়ে অংশগ্রহণমূলক একটি সুন্দর নির্বাচন করতে চান তারা। সিইসি বলেন, মানুষ তাদের সমালোচনা করতে পারে, কিন্তু সহযোগিতা ছাড়া কাজ এগোনো সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, তার টিমের পক্ষ থেকে কোনো পক্ষপাতমূলক রায় দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, আপনারা প্রশ্ন করেছেন, প্রশ্নের জবাব পেয়েছেন, আমি এতে সন্তুষ্ট। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে তিনি সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান এবং ভবিষ্যতেও এ ধরনের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন। এ সময় নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, যাদের ঋণখেলাপি হয়েও ছাড় দেওয়া হয়েছে, সেটা তারা মনে কষ্ট নিয়েই করেছেন, কারণ আইন তাদের সেই সুযোগ দিয়েছে।
এর আগে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি, জাতীয় পার্টি জাপা, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামিসহ মোট ৫১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ২ হাজার ৯১টি মনোনয়নপত্র জমা দেয়। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পক্ষ থেকে জমা পড়ে আরও ৪৭৮টি মনোনয়নপত্র। পরে ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত রিটার্নিং কর্মকর্তারা মনোনয়নপত্র বাছাই করে রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে ৭২৩টি মনোনয়নপত্র বাতিল করেন। সে সময় বৈধ ঘোষণা করা হয় ১ হাজার ৮৪২ জনের মনোনয়নপত্র। বাতিল হওয়া ৭২৩টির মধ্যে প্রায় ৩৫০ জনই ছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী, বাকি মনোনয়নপত্রগুলো ছিল ৫১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের।
দলভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, বিএনপির ২৭ জন, জামায়াতে ইসলামীর ৯ জন, জাতীয় পার্টির ৫৭ জন এবং ইসলামী আন্দোলনের ৪১ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। বিএনপির যেসব ২৭ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছিল, তাদের বেশির ভাগই দলীয় পরিচয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিলেও দলীয় প্রার্থী হওয়ার প্রত্যয়নপত্র দাখিল করেননি। বিএনপির পরিচয়ে মোট ৩৩১ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ২৭৬ জন মনোনয়নপত্র জমা পড়লেও তাদের ৯ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ২৬৮ জন প্রার্থীর মধ্যে ৪১ জন বাদ পড়েন এবং বৈধতা পান ২২৭ জন। দলগতভাবে সবচেয়ে বেশি প্রার্থিতা বাতিল হয় জাতীয় পার্টির। দলটির ২২৪ জন প্রার্থীর মধ্যে ৫৭ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয় এবং ১৬৭ জন বৈধতা পান।
নির্বাচনের তপশিল অনুযায়ী, গতকাল রবিবার নির্বাচন কমিশনের আপিল শুনানি শেষ হয়েছে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত। এরপর চূড়ান্ত প্রার্থীর সংখ্যা জানা যাবে। রিটার্নিং কর্মকর্তারা ২১ জানুয়ারি চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করে প্রতীক বরাদ্দ দেবেন। নির্বাচনি প্রচারণা শুরু হবে ২২ জানুয়ারি থেকে এবং তা চলবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার, সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত।
আপিল শুনানিতে বিএনপির দুই প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে। তারা হলেন চট্টগ্রাম-২ আসনের বিএনপি প্রার্থী সারোয়ার আলমগীর এবং কুমিল্লা-১০ আসনের বিএনপি প্রার্থী আবদুল গফুর ভূঁইয়া। গতকাল রবিবার আলাদা আলাদা আপিল শুনানি শেষে নির্বাচন কমিশন এই সিদ্ধান্ত দেয়। এর আগে রিটার্নিং কর্মকর্তার বাছাইয়ে এই দুই প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ছিল। ইসি সূত্র জানায়, ঋণখেলাপি হওয়ায় সারোয়ার আলমগীরের মনোনয়নপত্রের বৈধতার বিরুদ্ধে করা আপিল মঞ্জুর করা হয় এবং তার প্রার্থিতা বাতিল হয়। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বহাল রাখা হয়েছে। কুমিল্লা-১০ আসনে বিএনপির প্রার্থী আবদুল গফুর ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগে আপিল করা হয়। তিনি আপিল শুনানিতে উপস্থিত না থাকায় নির্বাচন কমিশন তার মনোনয়নপত্র বাতিল করে।
এদিকে ফেনী-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী আব্দুল আউয়াল মিন্টুর প্রার্থিতা বহাল রেখেছে নির্বাচন কমিশন। গতকাল রবিবার শুনানি শেষে ইসি এই সিদ্ধান্ত দেয়। এর আগে রিটার্নিং কর্মকর্তা তার মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করলেও দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকার অভিযোগ তুলে তার প্রার্থিতা বাতিলের জন্য আপিল করা হয়েছিল। তবে মিন্টু মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষদিন ২৯ ডিসেম্বরের মধ্যেই নাগরিকত্ব বাতিলের আবেদন করেন এবং নির্ধারিত টাকা জমা দেন। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচন কমিশন আপিল নামঞ্জুর করে তার প্রার্থিতা বহাল রাখে। ফলে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির এই প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আর কোনো বাধা রইল না।
এনএন/ ১৯ জানুয়ারি ২০২৬



