
ওয়াশিংটন, ২৩ মার্চ – ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধ যখন চতুর্থ সপ্তাহে পদার্পণ করেছে তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রণকৌশল চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। গত শুক্রবার তিনি যুদ্ধ গুটিয়ে আনার ইঙ্গিত দিলেও পরদিনই ইরানকে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে তা আগে থেকে আঁচ করতে না পারায় মার্কিন রণকৌশল এখন খেই হারিয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামনে আলোচনা, প্রস্থান, স্থিতাবস্থা বজায় রাখা এবং যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ানোর মতো চারটি পথ খোলা রয়েছে। তবে প্রতিটি পথই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
কূটনীতিকদের একটি অংশ যুদ্ধবিরতির আশা করলেও বাস্তব চিত্র বেশ ভিন্ন। আলোচনায় বসার আগেই ইরান দুবার আক্রান্ত হওয়ায় তারা এখন এই প্রস্তাব নিয়ে গভীরভাবে সন্দিহান। পাশাপাশি গত ৯ মার্চ ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতাবা খামেনি দায়িত্ব গ্রহণের পর তাকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। এটি দেশটির অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের বিশৃঙ্খলা নির্দেশ করে। এছাড়া মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ওমান বা কাতারকে যুক্ত করার বিষয়ে আরব দেশগুলোর মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
অন্যদিকে পরমাণু কর্মসূচি ও ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষই নিজ নিজ অবস্থানে অনড় থাকায় কেউ ছাড় দিতে রাজি নয়। ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে সহজ বিকল্প হতে পারে ইরানের নৌবাহিনী এবং ক্ষেপণাস্ত্র কারখানা ধ্বংসের দাবি তুলে বিজয় ঘোষণা করা। এতে আসন্ন মার্কিন নির্বাচনের আগে জ্বালানি তেলের দাম কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। কিন্তু এর বড় নেতিবাচক দিক হলো, ইরান তাদের ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে যেকোনো সময় পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারে।
হরমুজ প্রণালি ইরানের নিয়ন্ত্রণে থেকে গেলে তা হবে গত ৫০ বছরের মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির একটি বড় পরাজয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কট্টরপন্থিরা আরও কয়েক সপ্তাহ বিমান হামলা চালিয়ে ইরানকে দুর্বল করে দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।
তাদের ধারণা, এতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সক্ষমতা কমবে এবং বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন ঘটতে পারে। তবে এর কোনো নিশ্চয়তা নেই।
ইরান বিক্ষিপ্তভাবে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করলেও হরমুজ প্রণালি বন্ধই থাকবে। দীর্ঘস্থায়ী আক্রমণে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক শক্তি দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এই পরিস্থিতিকে শান্তির জন্য যুদ্ধ বাড়ানো বলে অভিহিত করেছেন। ট্রাম্প যদি তার হুমকি অনুযায়ী ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করেন বা তেল সমৃদ্ধ খার্গ দ্বীপ দখলের জন্য মেরিন সেনা পাঠান তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। এর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইরান যদি উপসাগরীয় দেশগুলোর পানি শোধনাগার বা প্রাকৃতিক গ্যাস কেন্দ্রে হামলা চালায় তবে বিশ্ব অর্থনীতি এক মহাবিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
ইতোমধ্যে কাতারের একটি এলএনজি প্ল্যান্টে ইরানি হামলায় বৈশ্বিক সরবরাহের তিন শতাংশ আগামী পাঁচ বছরের জন্য বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। যুদ্ধ শুরু করা যতটা সহজ ছিল তা শেষ করার কোনো সহজ পথ এখন ট্রাম্পের সামনে নেই।
ওয়াশিংটন এখন এমন এক গোলকধাঁধায় আটকা পড়েছে যেখান থেকে বের হওয়ার প্রতিটি রাস্তাই অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ।
এনএন/ ২৩ মার্চ ২০২৬



