
রিয়াদ, ২৬ মে – ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’—লাখো কণ্ঠের এই গগনবিদারী তাওহীদি ধ্বনিতে আজ মুখরিত ঐতিহাসিক আরাফাতের ময়দান। ভাষা, বর্ণ ও দেশের সীমানা ভুলে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ১৫ লাখেরও বেশি ধর্মপ্রাণ মুসলমান আজ সমবেত হয়েছেন ইসলামের সবচেয়ে মহাসম্মেলনে। আর বিদায় হজের স্মৃতিবিজড়িত এই পুণ্যভূমি থেকে আজ বিশ্ব মুসলিমের উদ্দেশে দেওয়া হয়েছে হজের পবিত্র খুতবা। এবারের খুতবার মূল সুরজুড়ে ছিল—ইতিহাসের জালিম শাসকদের নির্মম পরিণতি থেকে শিক্ষা নেওয়া, আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা এবং মুসলিম উম্মাহর অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও সম্প্রীতি রক্ষা।
মঙ্গলবার (২৬ মে, ২০২৬) আরাফাতের ময়দানে অবস্থিত মসজিদে নামিরাহ থেকে হজের এই মূল খুতবা প্রদান করেন মসজিদে নববীর সম্মানিত ইমাম ও খতিব শায়খ আলী বিন আবদুর রহমান আল-হুজাইফি।
খুতবার শুরুতেই শায়খ আলী বিন আবদুর রহমান আল-হুজাইফি মানবজাতিকে আল্লাহর চিরন্তন কিছু বিধানের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি জালিম ও অত্যাচারী শাসকদের পরিণতি নিয়ে পবিত্র কোরআনের সূরা আল-হজের আয়াত উদ্ধৃত করে এক কঠোর বার্তা দেন।
খুতবায় বলা হয়, “আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি কত জনপদকে অবকাশ দিয়েছি যখন তারা ছিল জালিম। অতঃপর তাদের শাস্তি দিয়েছি এবং প্রত্যাবর্তন আমারই কাছে।’ নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের রক্ষা করেন এবং কোনো বিশ্বাসঘাতক অকৃতজ্ঞকে পছন্দ করেন না।”
খতিব স্পষ্ট ভাষায় বলেন, সৃষ্টিজগতে আল্লাহর কিছু অপরিবর্তনীয় নিয়ম রয়েছে। কোনো জালিম বা অত্যাচারী গোষ্ঠী সাময়িকভাবে পার পেয়ে গেলেও আল্লাহর কঠোর আজাব থেকে তাদের নিস্তার নেই। তাই অতীত ইতিহাসের ধ্বংস হয়ে যাওয়া অহংকারী ও জালিমদের পরিণতি দেখে বর্তমান বিশ্বকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তিনি বলেন, “আল্লাহ অবশ্যই তাকে সাহায্য করবেন, যে তার দ্বীনকে সাহায্য করে। নিশ্চয় আল্লাহ শক্তিমান, পরাক্রমশালী।”
বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের বর্তমান অস্থির ও সংকটময় পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে খুতবায় মুসলিম উম্মাহর ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হয়েছে। সত্যের পথে সবাই এক না হলে বিপর্যয় কাটানো সম্ভব নয় বলে উল্লেখ করেন খতিব।
তিনি অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে সৃষ্টিকর্তার দরবারে প্রার্থনা করে বলেন, “হে আল্লাহ, মুসলমানদের অবস্থা সংশোধন করুন। তাদের সত্যের ওপর ঐক্যবদ্ধ করুন। তাদের সব বিষয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করুন এবং তাদের দ্বীনি ও দুনিয়াবি অবস্থা সুন্দর করে দিন।” একই সঙ্গে খুতবায় হাজিদের হজ কবুল, গুনাহ মাফ এবং নিরাপদ ও সফলভাবে নিজ নিজ দেশে ফেরার আকুল আবেদন জানানো হয়।
ঐতিহ্য অনুযায়ী খুতবায় সৌদি আরবের বর্তমান বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজিজ এবং যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের দীর্ঘায়ু ও কল্যাণ কামনা করে বিশেষ দোয়া করা হয়। দুই পবিত্র মসজিদের খেদমত এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লাখ লাখ হাজিদের ইবাদত-বন্দেগি সহজ করতে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও উদারভাবে ব্যয় করার জন্য তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ইমাম।
খতিব শায়খ আলী বিন আবদুর রহমান আল-হুজাইফি মনে করিয়ে দেন, পরকালে মুক্তির একমাত্র উপায় হলো ‘তাকওয়া’ বা আল্লাহভীতি অর্জন করা। আর এই তাকওয়ার সবচেয়ে বড় প্রকাশ হলো কিয়ামতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া এবং সব ধরনের পাপ ও অসৎকর্ম বর্জন করা।
হজের সামাজিক গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, “ভাষা, বর্ণ ও দেশের ভিন্নতা সত্ত্বেও হাজিরা এখানে ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসায় একত্র হয়ে ইবাদত পালন করে। এখানে অবস্থানকারী ও বহিরাগত সব মুসলমান সমান। হজে মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক পরিচয়, সম্প্রীতি, সহযোগিতা ও সহমর্মিতার এক অপূর্ব দৃশ্য প্রকাশ পায়।” হজের এই পবিত্র দিনগুলোতে, বিশেষ করে দোয়া কবুলের এই উর্বর স্থানগুলোতে সবাইকে বেশি বেশি কান্নাকাটি করে আল্লাহর কাছে দোয়া করার পরামর্শ দেন তিনি।
ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো এই হজ। শারীরিক ও আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান প্রতিটি মুসলিমের ওপর জীবনে একবার হজ করা ফরজ। মক্কায় কাবা শরিফ তাওয়াফ, সাফা-মারওয়া পাহাড় সাঈ করার পর আজ ৯ জিলহজ সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করেন হাজিরা। মূলত এই মাঠে অবস্থান করাই হজের মূল রোকন বা আনুষ্ঠানিকতা। এরপর হাজিরা রওনা হবেন মুজদালিফার উদ্দেশ্যে। সেখান থেকে মিনায় গিয়ে জামারায় শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ, আল্লাহর উদ্দেশ্যে পশু কোরবানি এবং মাথা মুণ্ডনের মাধ্যমে হজের বাকি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করবেন আল্লাহর মেহমানরা।
এনএন/ ২৬ মে ২০২৬




