অব্যবস্থাপনায় পর্যটনে ভাটা: কুয়াকাটায় পর্যটকদের টার্গেট করে গলাকাটা বাণিজ্য

অব্যবস্থাপনায় পর্যটনে ভাটা: কুয়াকাটায় পর্যটকদের টার্গেট করে গলাকাটা বাণিজ্য

৩১ March ২০২৬ Tuesday ১০:০৬:৩৬ PM

Print this E-mail this


কলাপাড়া ((পটুয়াখালী) প্রতিনিধি:

অব্যবস্থাপনায় পর্যটনে ভাটা: কুয়াকাটায় পর্যটকদের টার্গেট করে গলাকাটা বাণিজ্য

অব্যবস্থাপনা, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, যানবাহনের বেপরোয়া চলাচল ও দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে পর্যটননগরী কুয়াকাটায় সৃষ্টি হয়েছে চরম সংকট। পর্যটকদের টার্গেট করে চলছে গলাকাটা বাণিজ্য। এতে পর্যটকদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে এবং ধীরে ধীরে কমছে আগ্রহ।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে স্থানীয় প্রশাসন ও বিভিন্ন সংগঠন নিয়মিত মনিটরিং ও অভিযান চালালেও টেকসই শৃঙ্খলা ফিরছে না।

ঈদের দুই দিন পর সোমবার পরিবারের চার সদস্য নিয়ে কুয়াকাটায় ঘুরতে আসা আশরাফুল হক খাবারের অতিরিক্ত দামের অভিজ্ঞতায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, চারটি ছোট টেংরা মাছের দাম নেওয়া হয়েছে দেড়শ টাকা, শুঁটকির অল্প ভর্তা দেড়শ টাকা, আর চারটি ছোট চিংড়ি দুইশ টাকা। প্রতিজনের খরচ পড়ে ৫৫০ টাকা।

তার অভিযোগ, পর্যটকদের টার্গেট করে এখানে গলাকাটা বাণিজ্য চলছে, যা প্রতারণার পর্যায়ে পৌঁছেছে।

শুধু খাবারের মূল্য নয়, কুয়াকাটার প্রায় সব পর্যটন স্পটেই অভিযোগের শেষ নেই। অধিকাংশ রেস্তোরাঁয় নেই রেট চার্ট, নোংরা পরিবেশ এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ নিয়মিত। পর্যটক ও স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে পুরো বাণিজ্য ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

সৈকতের জিরো পয়েন্ট এলাকায় মোটরসাইকেলের বেপরোয়া চলাচল সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পরিবারের সঙ্গে আসা পর্যটক জমির উদ্দিন জানান, শিশুদের নিয়ে সৈকতে স্বস্তিতে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তার ভাষায়, ‘প্রায় প্রতি মুহূর্তে শিশুকে মোটরসাইকেলের সামনে থেকে সরাতে হয়েছে।’ বেপরোয়া বাইকারদের হর্ন ও দ্রুতগতির কারণে সৈকতে অনেক পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।

জিরো পয়েন্ট পূর্ব অংশে দোলনা ব্যবহারে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। মাত্র ১০ মিনিটের বিনোদনের জন্য ৩০ টাকা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান পর্যটকরা। পাশাপাশি সৈকত ও আশপাশের যানবাহন ভাড়াও নিয়ন্ত্রণহীন বলে অভিযোগ উঠেছে।

পর্যটকদের অভিযোগ, কুয়াকাটায় সেবার মান উন্নয়নের বদলে অর্থ উপার্জনই প্রধান উদ্দেশ্যে পরিণত হয়েছে অধিকাংশ ব্যবসায়ীর। এতে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের মধ্যে।

সৈকতের পরিচ্ছন্নতা পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। পৌরসভার পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা দিনে দুইবার কাজ করলেও পর্যাপ্ত বর্জ্য অপসারণ সম্ভব হচ্ছে না। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের অসচেতনতা পরিস্থিতি আরও জটিল করছে।

সৈকতের পশ্চিম অংশে কংক্রিটের ভাঙা অংশ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পর্যটকদের জন্য প্রাণঘাতী ঝুঁকি তৈরি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এক বছর আগে একই এলাকায় এক কিশোর পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। পর্যটকরা সেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার অথবা গোসলে নিষেধাজ্ঞার দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে কুয়াকাটা চৌরাস্তা ও আশপাশের বেড়িবাঁধ এলাকায় অস্থায়ী দোকানপাট বেড়ে যাওয়ায় সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে এবং যানজট নিয়মিত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কুয়াকাটা পৌর প্রশাসক ইয়াসীন সাদেক বলেন, সৈকতে মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে সাইনবোর্ড স্থাপন এবং নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে ফলোআপ মনিটরিং দুর্বল হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ধরে রাখা যাচ্ছে না।

পর্যটন উদ্যোক্তা ও স্থানীয় সংগঠকরা বলছেন, সমন্বিত ব্যবস্থাপনার অভাব এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে এ সমস্যা চলছে।

কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা মনে করেন, পর্যটননির্ভর অর্থনীতির এই এলাকায় শৃঙ্খলা না থাকলে ব্যবসা-বাণিজ্য আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

অন্যদিকে কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কাউছার হামিদ বলেন, পর্যটকদের সেবা নিশ্চিত ও শৃঙ্খলা ফেরাতে অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।

সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক


শেয়ার করতে ক্লিক করুন:

Explore More Districts