রাত যত গাঢ় হয়, ততই ফসলি জমির নীরবতা চিরে হানা দেয় একঝাঁক বুনো শূকর। অন্ধকারে হঠাৎই শুরু হয় তাদের তাণ্ডব। মূহূর্তেই গুঁড়িয়ে দেয় কৃষকদের পাকা ধান, নষ্ট করে সবজি খেত। আর তখনই নিঃশব্দ কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা। ভেঙ্গে যায় স্বপ্ন, ঘুম হারান কৃষকেরা।
গত একমাস ধরে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার অন্তত চার-পাঁচটি গ্রামে ফসলি জমিতে হানা দিচ্ছে বনের একঝাঁক বুনো শূকর। আর এই তাণ্ডবে ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা। কেউ পাকা ধান তুলতে পারছেন না, কেউবা সবজি জমিতে গিয়ে দেখছেন মাটিতে লুটিয়ে আছে ফসল। ক্ষতির শঙ্কায় অনেকেই এখন রাতে ঘুম ছেড়ে জমিতে পাহারা দিচ্ছেন। তারা দ্রুত প্রশাসনিক সহায়তা ও বন বিভাগের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
স্থানীয় কৃষকেরা অভিযোগ করে জানান, কমলগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়নের লংগুরপার, দক্ষিণ বালিগাঁও, বাঘমারা, সরইবাড়ি, ভেড়াছড়া, ছাতকছড়া এলাকার ফসলি জমিতে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের বুনো শূকর প্রতি রাতে হানা দেয়। পাকা আমন ধান ও শীতকালীন শাকসবজির খেতে শূকরের দল এসে তা নষ্ট করে। ধান, আলু, মুলা এমনকি কলাগাছসহ বিভিন্ন গাছ উপড়ে ফেলে।
তারা আরও জানান, বুনো শূকর তাড়ানোর চেষ্টা করলে উল্টো মানুষকে ধাওয়া করে। সারাদিন কাজ করে আবার রাত জেগে ফসল পাহারা দিতে হয়। কৃষকেরা শূকরের হানায় ফসল মাঠে রাখতে পারছেন না। শীতের মধ্যে পাকা ধান রক্ষায় মাঠে বাঁশ দিয়ে মাচা তৈরি করে পাহারা দেন কৃষকেরা। সঙ্গে রাখেন প্লাস্টিক ও টিনের তৈরি ড্রাম। কিছুক্ষণ পর শব্দ করে চিৎকার করেন, যাতে শূকর চলে যায়।
ফসল রক্ষা করতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন স্থানীয় কৃষক মফিজ মিয়া। তিনি বলেন, বুনো শূকর আমাদের সব ফসল নষ্ট করে ফেলছে। এ অবস্থায় প্লাস্টিক ও টিনের ড্রামের শব্দ করে রাত জেগে ফসল পাহারা দিতে হয়। এসব শূকর মানুষকেও আক্রমণ করে। এ কারণে ৬ ফুট উঁচুতে বাঁশের মাচা তৈরি করেছি, যাতে শূকর আক্রমণ করতে না পারে।
কৃষক কনাই মিয়া বলে, বন্যপ্রাণীর দল রাতের অন্ধকারে হানা দিয়ে পাকা ধান বা সবজির ক্ষেত নষ্ট করে দেয়। এতে কৃষকদের বছরের পরিশ্রম মুহূর্তেই পণ্ড হয়ে যায়। এই ক্ষতি এড়াতে, অনেক কৃষক দলবদ্ধভাবে বাঁশ, টিনের শব্দ এবং লাঠিসোঁটা হাতে সারারাত জমিতে পাহারা দিচ্ছেন।
মফিজ মিয়ার মতো বাঁশের মাচা তৈরি করে রাতভর পাহারা দিচ্ছেন কৃষক আবুল মিয়া ও আশিক মিয়া। তারা জানিয়েছেন, ফসল কাটার আগ পর্যন্ত চলবে তাদের পাহারা দেওয়ার কাজ। তবে বুনো শূকরের আক্রমণ ঠেকাতে এখন পর্যন্ত সরকার কোনো উদ্যোগ নেয়নি বলে দাবি করেন তারা।
বুনো শূকরের হাত থেকে ফসলকে রক্ষা করতে শীতের রাতে জমিতে রাত্রীযাপন করেন কৃষক সুফি মিয়া। তিনি বলেন, আমার সব ফসল নষ্ট করে দিচ্ছে। তাই নিজেই ধানগুলো রক্ষার জন্য পাহারা দেই। একটি-দুটি নয়, একসাথে ১০ থেকে ১৫টির দল নামে। দেখে ভয় লাগে তখন। টর্চ মেরে জোরে জোরে শব্দ করলে তারা পালিয়ে যায়। সন্ধ্যা ৭টা-৮টার দিকে তারা নামে। আবার আসে মাঝরাতে। পুরো রাত জেগে ধান পাহারা না দিলে জমির সব ধান নষ্ট হয়ে যাবে।
পরিবেশবাদী সংগঠন জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটি কমলগঞ্জের সহ-সাধারন সম্পাদক মো. সালাহউদ্দিন শুভ বলেন, বন উজাড় ও বনভূমি বেদখল হওয়ার কারণে এখন বন্যপ্রাণীরা লোকালয়ে হানা দিচ্ছে। আগে বন্যপ্রাণীরা লোকালয়ে হানা দেয়নি, মানুষের কোনো ক্ষতি করেনি। লাউয়াছড়ার বেদখল বনভূমি উদ্ধার করে বন্যপ্রাণীদের জন্য বনজ গাছ লাগানোর দাবি জানান তিনি।
এ বিষয়ে মৌলভীবাজার বন্যপ্রাণী রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক জামিল মোহাম্মদ খান বলেন, বন্যপ্রাণীর নির্দিষ্ট কোনো এলাকা নেই। বন্যপ্রাণীরা খাবারের জন্য লোকালয়ে যেতে পারে। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে বুনো শূকরের বংশবিস্তার আগের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে। শূকরের দলের বনের পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে বিচরণ করা স্বাভাবিক বিষয় হলেও ফসল নষ্ট হওয়ায় ঘটনা দুঃখজনক।
তিনি আরও জানান, বন্যপ্রাণী হত্যা একটা দন্ডনীয় অপরাধ। কেউ যেন প্রাণী মারার জন্য মরন ফাঁদ ব্যবহার না করে। যদি সেটা করে তাহলে আইনের আওতায় আনা হবে।

