অনুদানের ‘বীর নিবাস’ পেতে মুক্তিযোদ্ধাদের দ্বন্দ্ব!

অনুদানের ‘বীর নিবাস’ পেতে মুক্তিযোদ্ধাদের দ্বন্দ্ব!

সাইফুল ইসলাম : অসচ্ছল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পাকা আবাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বাস্তবায়িত হচ্ছে ‘বীর নিবাস’ প্রকল্প। ১৪ লাখ ১০ হাজার ২৮২ টাকা ব্যয়ে নির্মিত প্রতিটি বীর নিবাস ৭৩২ বর্গফুট আয়তনের। এতে রয়েছে দুটি শয়নকক্ষ, একটি ড্রয়িংরুম, রান্নাঘর, দুটি আধুনিক স্যানিটারি ল্যাট্রিন, সুপেয় পানির ব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ সংযোগ।

Bir nibash
প্রতীকী ছবি। কোলাজ: জুমবাংলা

নীতিমালা অনুযায়ী অসচ্ছল বীর মুক্তিযোদ্ধা, বীরাঙ্গনা, শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধার অসচ্ছল স্ত্রী ও সন্তানরা এ সুবিধা পাওয়ার যোগ্য। তবে মানিকগঞ্জে বীর নিবাস বরাদ্দকে কেন্দ্র করে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, অনেক সচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাও সরকারি অনুদানের এ ঘর পাওয়ার জন্য আবেদন করেছেন। একই সঙ্গে কমিটি গঠন নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের আওতায় প্রকৃত অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের তালিকা প্রস্তুতের জন্য গত ২১ মে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা শাখা উপজেলা পর্যায়ে চিঠি পাঠায়। চিঠিতে ১০ দিনের মধ্যে তালিকা প্রেরণের নির্দেশ দেওয়া হয়।

কিন্তু স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের মতবিরোধের কারণে তালিকা প্রস্তুত প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়েছে। বীর নিবাস প্রকল্পের জন্য গঠিত কমিটি সংশোধনের দাবিতে গত ৮ জুন জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আ. মান্নান সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে চিঠি দিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা শরফুদ্দিন আহমেদ নুরু ও কাজী আবুল হোসেনকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধ জানান।

অপরদিকে, গত ১৭ জুন জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের প্যাডে আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. হযরত আলী সেলিম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পৃথক চিঠি দিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আজাহার হোসেনকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নিজ নিজ বলয়ের মুক্তিযোদ্ধাদের বীর নিবাস পাইয়ে দেওয়ার লক্ষ্য থেকেই কমিটি গঠন নিয়ে এ বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, বীর নিবাসের জন্য আবেদনকারীদের মধ্যে অনেকেই আর্থিকভাবে সচ্ছল।

জানা যায়, বীর মুক্তিযোদ্ধা শরফুদ্দিন আহমেদ নুরু নিজেই বীর নিবাসের জন্য আবেদন করেছেন। তিনি ২০২৩ সালেও এ প্রকল্পের আওতায় আবেদন করেছিলেন। এছাড়া বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. সাহাজ উদ্দিনের রয়েছে ১৪ শতক বসতভিটা ও ১৭২ শতক কৃষিজমি। তিনিও বীর নিবাসের জন্য আবেদন করেছেন। সদর উপজেলার বারাহির চর এলাকার বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুল হামিদ খানের রয়েছে ৯ শতক বসতভিটা ও ১২০ শতক কৃষিজমি। তিনিও আবেদনকারীদের তালিকায় রয়েছেন।

একইভাবে গড়পাড়া ঠাটাঙ্গা এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আতাউর রহমানের নামে রয়েছে ১১ দশমিক ৩৩ শতক বসতভিটা ও ৩০ শতক কৃষিজমি। তিনি শ্বশুরবাড়িতে বসবাসের কথা উল্লেখ করে বীর নিবাসের আবেদন করেছেন। নয় বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার দাবি করা নীপেন কুমার সরকারও আবেদন করেছেন। তবে তাঁর আবেদনের সঙ্গে আর্থিক সচ্ছলতা বা অসচ্ছলতার কোনো প্রমাণপত্র জমা দেওয়া হয়নি।

একইভাবে সাড়ে ১০ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া দাবি করা মো. রফিক উদ্দিনও আবেদন করেছেন। বীর নিবাসের জন্য জমা দেওয়া আবেদনপত্রে তিনি উল্লেখ করেছেন, তাঁর নামে প্রায় ৫০ শতক বসতভিটা, ৪৫ শতক কৃষিজমি এবং একটি টিনের ঘর রয়েছে।

তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও রফিক উদ্দিনের পরিবারের এক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের দাবি, পরিবারের বসতভিটার পরিমাণ প্রায় ৭৫ শতক এবং কৃষিজমি রয়েছে প্রায় ৪৫ শতক। বাড়িতে দুটি টিনের ঘর ও একটি টিনশেড ঘর রয়েছে। এছাড়া রফিক উদ্দিন ঢাকার একটি এমপিওভুক্ত বিদ্যালয়ে ক্লার্ক হিসেবে চাকরি করতেন। অবসর গ্রহণের পর তিনি প্রায় ১৫ লাখ টাকা পেনশন সুবিধা পেয়েছেন।

রফিক উদ্দিনের চার ছেলের মধ্যে একজন সরকারি হাসপাতালে চাকরি করতেন। তিনি মারা গেছেন। জীবিত তিন ছেলের একজন তিতাস গ্যাসে কর্মরত, আরেকজন গাজীপুরে মোবাইল ফোনের ব্যবসা করেন এবং ছোট ছেলে লেখাপড়া করছেন। তাঁদের একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়েছে বেশ কয়েক বছর আগে।

এ ধরনের আরও অনেক সচ্ছল মুক্তিযোদ্ধার আবেদন পাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। ফলে প্রকৃত অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবর্তে অন্যদের সুবিধা পাইয়ে দিতে কমিটি গঠন নিয়ে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে কি না—তা নিয়ে স্থানীয়ভাবে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা শরফুদ্দিন আহমেদ নুরু বলেন, বাইরে থেকে আমাকে সচ্ছল মনে হলেও বাস্তবে আমি আর্থিকভাবে অসচ্ছল অবস্থায় রয়েছি। অনেক আবেদনকারীর তুলনায়ও আমার আর্থিক অবস্থা খারাপ। বিভিন্ন প্রয়োজনে অধিকাংশ জায়গা-জমি বিক্রি করে দিতে হয়েছে; বর্তমানে সামান্য কিছু সম্পত্তি ছাড়া আর তেমন কিছু অবশিষ্ট নেই। তাই বীর নিবাসের জন্য নিজেকে যোগ্য দাবিদার মনে করি।

এ বিষয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. হযরত আলী সেলিম বলেন, “আমরা চাই স্বচ্ছতার সঙ্গে যথাযথ প্রক্রিয়ায় আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করা হোক এবং প্রকৃত অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধারাই বীর নিবাস পান। এর বাইরে আমাদের কোনো দাবি নেই।”

জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আ. মান্নান বলেন, “বীর নিবাস প্রকল্পটি মুক্তিযোদ্ধা সংসদের বিষয়। এখানে কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততার সুযোগ নেই। আমরা চাই কোনো সচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা এ প্রকল্পের জন্য আবেদন না করুক। প্রকৃত অসচ্ছলরাই যেন এ সুবিধা পান, সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।”

সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মৌসুমী নাসরিন বলেন, “নীতিমালার বাইরে কাজ করার কোনো সুযোগ নেই। সব আবেদন যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রস্তুত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।”

Zoom Bangla News

Zoom Bangla News

inews.zoombangla.com


Follow

Follow iNews Zoombangla On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from iNews Zoombangla in your Google news feed.


Follow iNews Zoombangla On Google

Explore More Districts