অধ্যাপনা ছেড়ে সহকারী কমিশনারে যোগদান: শিক্ষকতার গালে চপেটাঘাত নয়, নিগূঢ় বাস্তবতা

অধ্যাপনা ছেড়ে সহকারী কমিশনারে যোগদান: শিক্ষকতার গালে চপেটাঘাত নয়, নিগূঢ় বাস্তবতা

বক্ষ্যমাণ বাস্তবতা আজ এতটাই রূঢ় ও বৈসাদৃশ্যপূর্ণ যে ৩৭তম বা ৩৮তম বিসিএসের মাধ্যমে অন্য ক্যাডারে যোগদানকারী অনেক কর্মকর্তা ইতিমধ্যে ষষ্ঠ গ্রেডের স্বাদ গ্রহণ করেছেন। এমনকি ব্যাংকিং খাতের সমসাময়িক কর্মকর্তাদের পদোন্নতির ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফও পঞ্চম গ্রেড স্পর্শ করেছে। বিপরীতে শিক্ষা ক্যাডারের ৩৬তম বিসিএসের কর্মকর্তারা এখনো পদোন্নতির ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত, আর ৩৮তম বিসিএসের সদস্যদের পদোন্নতি তো সুদূরপরাহত।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান কিংবা আধুনিক জনপ্রশাসনের একটি অমোঘ সত্য হলো, মেধাবী মানবসম্পদ স্বভাবগতভাবেই সেই পেশার প্রতি আকৃষ্ট হয়, যেখানে সামাজিক মর্যাদা, আর্থিক প্রণোদনা এবং পেশাগত উল্লম্ফনের দিগন্ত উন্মুক্ত। একজন প্রখর মেধাবী তরুণ কেন এক স্থবির, নিশ্চল ও সম্ভাবনাহীন কাঠামোর ভেতর নিজের সম্ভাবনাকে অপচয় করবেন? একজন শিক্ষক যখন দেখেন তাঁরই সমকক্ষ সহপাঠী অন্য ক্যাডারে যোগ দিয়ে দ্রুততম সময়ে পদোন্নতি, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও বিপুল বৈষয়িক সুবিধা ভোগ করছেন, আর তিনি নিজে বছরের পর বছর একই তিমিরে স্থবির হয়ে আছেন, তখন তাঁর অবচেতন মনে বিকল্প মর্যাদাপূর্ণ জীবনের আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হওয়া কোনো অপরাধ নয়; বরং তা মানবীয় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের স্বাভাবিক প্রতিফলন।

অতএব কোনো তিলকধারী অধ্যাপক বিদ্যায়তনের চৌকাঠ ডিঙিয়ে সহকারী কমিশনার হিসেবে যোগ দিলে সেটিকে ‘শিক্ষকতা নামক মহান পেশার গালে চপেটাঘাত’ বলে যে সরল আবেগনির্ভর ও নীতিবাদী ব্যাখ্যা দাঁড় করানো হয়, তা পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। এর আগে প্রয়োজন পেশাগত গতিশীলতার সীমাবদ্ধতা এবং বিদ্যমান প্রশাসনিক বাস্তবতার গভীর পর্যালোচনা। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের নিজেদেরই প্রশ্ন করা উচিত, কেন একজন শিক্ষক তাঁর পরম ভালোবাসার শ্রেণিকক্ষ, ব্ল্যাকবোর্ড আর ডাস্টার ফেলে প্রশাসনের শীতল করিডরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

কারণ, কোনো শিক্ষকই আনন্দের আতিশয্যে বা স্বেচ্ছায় শ্রেণিকক্ষ বর্জন করেন না। তিনি যান এক চরম মনস্তাত্ত্বিক অবদমন, দীর্ঘ বঞ্চনা এবং সম্ভাবনাহীনতার দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি ও অস্তিত্বের হাহাকার থেকে মুক্তি পেতে।

Explore More Districts