তাকিয়া আফরোজ সাদিয়া
তেঁতুল তো তেঁতুলই। বাইরে সবুজ, পেকে গেলে বাদামি। খোসা ভাঙলে ভেতরে টক-মিষ্টি শাঁস—শৈশব থেকে পরিচিত এই ফলের চেহারা ও স্বাদ নিয়ে নতুন করে বিস্মিত হওয়ার কথা নয়। কিন্তু কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার হিজলাবট গ্রামের একটি তেঁতুলগাছের সামনে দাঁড়ালে সেই চেনা ধারণাটিই যেন বদলে যায়।
ডালে ঝুলছে আর দশটি তেঁতুলের মতোই দেখতে ফল। হাতে তুলে নিলে বাইরেও কোনো অস্বাভাবিকতা নেই। কিন্তু খোসা ভাঙতেই চোখ আটকে যায়। ভেতরে বাদামি নয়—লাল। কোনো ফলে হালকা লালচে, কোনোটি আবার প্রায় টকটকে লাল।
সবুজ খোসার ভেতর এমন লাল রং—প্রথম দেখায় যেন মনে হয়, তেঁতুলের ভেতরে অন্য কোনো ফল লুকিয়ে আছে।
এই অদ্ভুত তেঁতুলের সন্ধান মিলেছে হিজলাবট গ্রামের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো তিনটি তেঁতুলগাছের একটিতে। গাছগুলোর মধ্যে একটির ফলেই দেখা যায় এই ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য। আর এই একটি বৈশিষ্ট্যই গাছটিকে স্থানীয় মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে।
দূর-দূরান্ত থেকে কেউ আসছেন কৌতূহল মেটাতে, কেউ আসছেন নিজের চোখে দেখতে। গাছের নিচে দাঁড়িয়ে অনেকেই ডালের দিকে তাকিয়ে খুঁজছেন সেই বিশেষ ফল—যার খোসা সাধারণ, কিন্তু ভেতরটা অস্বাভাবিক লাল।
তেঁতুলের ভেতর অন্য এক রং/
সাধারণত কাঁচা তেঁতুলের খোসা সবুজ থাকে। পাকতে পাকতে এর রং বাদামি হয়ে আসে এবং ভেতরের শাঁসও পরিচিত বাদামি বা ধূসরাভ রং ধারণ করে। কিন্তু হিজলাবটের এই গাছটি যেন সেই পরিচিত নিয়মের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।
খোসা ছাড়ানোর পর লাল শাঁস দেখে অনেকেই বিস্মিত হন। স্থানীয়দের কাছে এটাই এখন গাছটির সবচেয়ে বড় পরিচয়—‘লাল তেঁতুলের গাছ’।
বছরের বিভিন্ন সময়ে গাছগুলোতে ফল আসে। তবে লাল শাঁসের তেঁতুলই মানুষের আগ্রহের কেন্দ্র। কেউ ফল হাতে নিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন, কেউ আবার অন্যদের দেখানোর জন্য সেটি নিয়ে যান।
এই কৌতূহলই ধীরে ধীরে গাছটিকে স্থানীয় একটি আকর্ষণের জায়গায় পরিণত করেছে।
শুধু গাছ নয়, স্মৃতিরও ধারক/
তেঁতুলগাছগুলোর বয়স নিয়েও রয়েছে নানা কথা। হিজলাবটের প্রবীণদের কেউ বলেন, গাছগুলো দেড়শ বছরেরও বেশি পুরোনো। আবার কারও ধারণা, বয়স দুই শতাব্দীও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
তবে গাছগুলোর সুনির্দিষ্ট বয়স বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে বয়সের এসব দাবি আপাতত স্থানীয় লোকস্মৃতির অংশ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
তবে গাছগুলো যে দীর্ঘদিনের, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে খুব একটা দ্বিমত নেই।
গাছগুলোকে ঘিরে শোনা যায় ব্রিটিশ আমল, নীলচাষ ও নীলকরদের সময়কার নানা গল্প। গড়াই নদীর কাছাকাছি এই জনপদের ইতিহাসের সঙ্গে নদীর গতিপথ, বসতি পরিবর্তন ও কৃষিনির্ভর জীবনের নানা অধ্যায়ও জড়িয়ে আছে।
সেই অর্থে পুরোনো তেঁতুলগাছগুলো শুধু ফলদায়ী বৃক্ষ নয়। এগুলো স্থানীয় মানুষের স্মৃতিরও অংশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষ এগুলোর ছায়া দেখেছে, ফল খেয়েছে, গল্প শুনেছে। আর এখন লাল শাঁসের তেঁতুল সেই পুরোনো স্মৃতির সঙ্গে যোগ করেছে নতুন বিস্ময়।
বিস্ময়ের পাশে বিষাদ/
তবে এই গাছের গল্পের একটি বিষণ্ন অধ্যায়ও আছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় আড়াই মাস আগে গাছ থেকে তেঁতুল পাড়তে গিয়ে এক ব্যক্তি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। গাছটির ডালপালা বৈদ্যুতিক তারের কাছাকাছি থাকায় তেঁতুল পাড়ার সময় ঘটে ওই দুর্ঘটনা।
এক মুহূর্তের অসতর্কতা কেড়ে নেয় একটি প্রাণ।
এরপর থেকে গাছটির প্রতি স্থানীয় মানুষের অনুভূতিও যেন কিছুটা বদলে গেছে। যে গাছের লাল তেঁতুল দেখতে মানুষ কৌতূহল নিয়ে আসে, সেই গাছটির সঙ্গেই এখন জড়িয়ে আছে একটি মৃত্যুর স্মৃতি।
ঘটনাটি গাছটির আশপাশের নিরাপত্তার বিষয়টিও সামনে এনেছে। বৈদ্যুতিক তারের কাছাকাছি থাকা গাছের ডালপালা নিয়মিত পরিদর্শন ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। বিশেষ করে দর্শনার্থী বা স্থানীয় কেউ যাতে ঝুঁকি নিয়ে গাছে উঠে ফল পাড়তে না যান, সে বিষয়ে সতর্কতা প্রয়োজন।
রহস্যের উত্তর বিজ্ঞানে/
লাল তেঁতুল দেখে স্থানীয়দের মনে নানা প্রশ্ন। কেন এই গাছের ফলের শাঁস লাল? অন্য তেঁতুলগাছের ফলের সঙ্গে এর পার্থক্য কোথায়? এটি কি কোনো বিশেষ জাত? নাকি গাছটির জিনগত বৈশিষ্ট্যের কারণে এমন হয়েছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে লোককথার বাইরে যেতে হবে বিজ্ঞানের কাছে।
২০২১ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে উদ্ভিদবিদদের বরাতে বলা হয়েছিল, তেঁতুলের এমন অস্বাভাবিক রঙের পেছনে ক্রোমোজোমের বিন্যাসে পরিবর্তন এবং বিভিন্ন রঞ্জক পদার্থের উপস্থিতি ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থাৎ লাল রঙটি কোনো অলৌকিক বিষয় নয়; উদ্ভিদের জিনগত বৈচিত্র্য কিংবা ফলের ভেতরে থাকা বিশেষ রঞ্জক পদার্থ এর কারণ হতে পারে।
তবে হিজলাবটের এই নির্দিষ্ট গাছের ক্ষেত্রে কারণটি এখনো বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত নয়।
এ জন্য প্রয়োজন গবেষণা। গাছটির জাত ও জিনগত বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে ফলের রাসায়নিক উপাদান বিশ্লেষণ করে দেখা যেতে পারে, কোন রঞ্জক পদার্থ এর শাঁসকে লাল করে তুলছে। গবেষণার মাধ্যমে আরও জানা সম্ভব হতে পারে, এই বৈশিষ্ট্যটি বংশগত কি না এবং একই বৈশিষ্ট্যের নতুন চারা উৎপাদন করা সম্ভব কি না।
কৃষি ও উদ্ভিদবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে এমন গবেষণা করা গেলে স্থানীয় মানুষের কৌতূহলেরও বৈজ্ঞানিক উত্তর মিলবে।
সংরক্ষণে উদ্যোগ প্রয়োজন/
হিজলাবটের পুরোনো তেঁতুলগাছগুলো এখন সংরক্ষণের দাবিও তৈরি করেছে।
স্থানীয়দের মতে, গাছগুলোর চারপাশ পরিষ্কার রাখা, অবাধে ডালপালা কাটার হাত থেকে রক্ষা করা এবং শিকড়ের ক্ষতি না করা প্রয়োজন। পাশাপাশি দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার।
গাছটির পাশে একটি তথ্যফলক স্থাপন করা যেতে পারে। সেখানে গাছটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য, স্থানীয় ইতিহাস, লোকস্মৃতি এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার তথ্য তুলে ধরা হলে দর্শনার্থীরা যেমন জানতে পারবেন, তেমনি গাছটির গুরুত্বও বাড়বে।
আর যদি বিশেষজ্ঞরা গবেষণা করে নিশ্চিত করতে পারেন যে এই লাল শাঁস কোনো বিরল জিনগত বৈশিষ্ট্যের ফল, তাহলে এর গুরুত্ব আরও বেড়ে যাবে।
তখন এটি শুধু একটি পুরোনো তেঁতুলগাছ থাকবে না; হয়ে উঠতে পারে কুষ্টিয়ার একটি স্বতন্ত্র প্রাকৃতিক সম্পদ ও স্থানীয় ঐতিহ্যের নিদর্শন।
হিজলাবটের গাছগুলো তাই এখন দাঁড়িয়ে আছে বিস্ময় ও স্মৃতির মাঝখানে। তাদের ডালে ঝুলে থাকা তেঁতুল বাইরে থেকে সবুজ, ভেতরে টকটকে লাল। সেই লাল রঙের রহস্য এখনো পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি।
হয়তো কোনো একদিন উদ্ভিদবিজ্ঞানের গবেষণাগারে এই রহস্যের উত্তর মিলবে। কিন্তু তার আগ পর্যন্ত হিজলাবটের মানুষের কাছে এই তেঁতুল প্রকৃতির এক আশ্চর্য উপহার—সবুজ খোসার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক টুকরো লাল বিস্ময়।
সবুজ খোসার আড়ালে টকটকে লাল. হিজলাবটে তেঁতুলের অদ্ভুত রহস্য
- Tags : অদভত, আড়ল, খসর, টকটক, ততলর, রহসয, লল, সবজ, হজলবট
Recent Posts
Explore More Districts
- Khulna District Newspapers
- Chattogram District Newspapers
- Dhaka District Newspapers
- Barisal District Newspapers
- Sylhet District Newspapers
- Rangpur District Newspapers
- Rajshahi District Newspapers
- Mymensingh District Newspapers
- Gazipur District Newspapers
- Cumilla district Newspapers
- Noakhali District Newspapers
- Faridpur District Newspapers
- Pabna District Newspapers
- Narayanganj District Newspapers
- Narsingdi District Newspapers
- Kushtia District Newspapers
- Dinajpur District Newspapers
- Bogura District Newspapers
- Jessore District Newspapers
- Bagerhat District Newspapers
- Barguna District Newspapers
- Bhola District Newspapers
- Brahmanbaria District Newspapers
- Chuadanga District Newspapers
- Chandpur District Newspapers
- Chapainawabganj District Newspapers
- Coxs Bazar District Newspapers
- Feni District Newspapers
- Gaibandha District Newspapers
- Gopalganj District Newspapers
- Habiganj District Newspapers
- Jamalpur District Newspapers
- Jhalokati District Newspapers
- Jhenaidah District Newspapers
- Joypurhat District Newspapers
- Kurigram District Newspapers
- Kishoreganj District Newspapers
- Khagrachhari District Newspapers
- Lakshmipur District Newspapers
- Lalmonirhat District Newspapers
- Madaripur District Newspapers
- Magura District Newspapers
- Manikganj District Newspapers
- Meherpur District Newspapers
- Naogaon District Newspapers
- Munshiganj District Newspapers
- Moulvibazar District Newspapers
- Narail District Newspapers
- Natore District Newspapers
- Netrokona District Newspapers
- Nilphamari District Newspapers
- Panchagarh District Newspapers
- Patuakhali District Newspapers
- Pirojpur District Newspapers
- Rajbari District Newspapers
- Rangamati District Newspapers
- Satkhira District Newspapers
- Shariatpur District Newspapers
- Sherpur District Newspapers
- Sirajganj District Newspapers
- Sunamganj District Newspapers
- Tangail District Newspapers
- Thakurgaon District Newspapers

